ঢেঁকি দিয়ে চালের গুড়া তৈরি করছেন এক নারী। ছবি : শাকিল মোল্লা।

গ্রামাঞ্চলে চাল ও গমের আটা তৈরিতে কাঠের তৈরি বিশেষ একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। যার নাম ছিলো ঢেঁকি। আর এ ঢেঁকি ছিলো দেশের ক্ষুদ্র ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি অংশ বিশেষ। একটা সময় নানা কারণে ঢেঁকির ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় চাল কল গড়ে ওঠায় ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে ঢেঁকির ব্যবহার। বিলুপ্তি পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন কুমিল্লার প্রতিনিধি শাকিল মোল্লা। 

প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় হারিয়ে যেতে বসেছে দেশীয় ক্ষুদ্র ও গ্রামীণ ঐতিহ্য ঢেঁকি। আধুনিক সভ্যতার যুগে রাইচ অ্যান্ড ফ্লাওয়ার মিলের কারণে ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কুমিল্লায় প্রায় বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি।

প্রযুক্তির দাপটে বিভিন্ন আচার-আচরণের যেমন পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি দেশীয় ঐতিহ্যগুলোও হারাতে বসেছে সময়ের বির্বতনে। এক সময় চাউল ভাঙানো আর পিঠার গুড়া কুটার জন্য দেশজুড়ে ব্যবহৃত হতো ঢেঁকি। প্রত্যেক গৃহস্থ বাড়িতে যে ঢেঁকি শোভা পেতো স্বগৌরবে সেই ঢেঁকি আজ গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়ালেও পাওয়াও দুষ্কর!

অথচ এককালে গ্রামের প্রত্যেক গৃহস্থ বাড়িতে শোনা যেত কৃষাণীদের নবান্নের চিড়া-কুটা আর পিঠা তৈরির চালের গুড়া করার ঢেঁকির ধুপ-ধাপ শব্দ।

শোনা যেত গ্রামের বউ, দিদিদের গলায় ‘বৌ ধান ভানেরে ঢেঁকিতে পার দিয়া, ঢেঁকি নাচে, বৌ নাচে হেলিয়া দুলিয়া, ও বৌ ধান ভানেরে’। কিন্তু এখন আর গৃহস্থ বাড়ির বৌ-দিদিদের এক সঙ্গে ধান বানার সেই ঐতিহাসিক গীত খুব একটা শোনা যায় না। এখন আর ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভাঙে না গাঁয়ের মানুষের। এক সময় কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগঞ্জের গৃহস্থ বাড়িতে ধান বানার জন্য ঢেঁকি ছিল গৃহস্থালী কাজে নিত্য প্রয়োজনীয় দরকারি বস্তু।

অথচ এখন আর সে সকল বাড়িতে ঢেঁকি নেই, নেই ঢেঁকির ধুপধাপ মাটি কাঁপানো শব্দের মুর্ছনা। গৃহস্থদের কেউ কেউ পুরনো ঢেঁকি জঞ্জাল মনে করে তা চিড়ে-কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, আবার কেউ নিদর্শন হিসেবে ঘরের মাঁচায় উঠিয়ে রেখেছেন।

সময়ের আবর্তে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এবং ঢেঁকিশিল্প। গ্রাম-গঞ্জে এখন শত শত মিনি রাইস মিল গড়ে উঠেছে। মানুষও শিক্ষিত হয়েছে। রুচিরও বদল হয়েছে। ফলে ঢেঁকি তার অস্বিত্ব¡ হারিয়েছে।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দক্ষিণ শাকতলী গ্রামের কৃষক রবিউল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঢেঁকি হচ্ছে কাঠের তৈরি কলবিশেষ একটি যন্ত্র। প্রায় ৬ ফুট লম্বা ও ৯ ইঞ্চি ব্যাস বিশিষ্ট একটি ধড় থাকে ঢেঁকিতে। মেঝে থেকে ১৮ ইঞ্চি উচ্চতায় ধড়ের একেবারে সামনে ২ ফুট লম্বা একটি গোল কাঠ সংযুক্ত থাকে। এটাকে মৌনা বলা হয়। এ ছাড়া মাটিতে পোঁতা ২টি বড় কাঠের গুড়ি দিয়ে তৈরি দণ্ডের ভেতর দিয়ে একটি ছোট হুড়কা হিসেবে শক্ত কাঠের গোলাকার খিল দিয়ে ঢেঁকি আটকানো থাকে।

মৌনার নিচ প্রান্তে চারপাশে মাটির ভেতর গোলাকার কাঠের গোড়ালি দিয়ে তৈরি করা গর্ত বা সিমেন্টের কংক্রিট দিয়ে তৈরি গর্তে ধান দিয়ে পার দিতে হয়। এ মৌনার মাধ্যমে পার দিয়ে ধান থেকে চাল তৈরি করা হতো। জানা যায়, এক যুগ আগেও কুমিল্লা অঞ্চলের ভূমিহীন, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত অভাবী অসহায় মহিলাদের আয়-উপার্জনের প্রধান উৎস ছিলো ঢেঁকি দিয়ে ধান বানা অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষায় তারা ছিল, বাড়কি বা বাড়ানী/তাড়ানী। এদের অনেকেই ঢেঁকিতে ধান ভাঙিয়ে হাট-বাজারে চাল বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করতো।

গৃহস্থের বাড়িতে যখন নতুন ধান উঠতো তখন সে সকল অভাবী বাড়ানী মহিলারা ঢেঁকিতে ধান ছেটে চাল বানিয়ে দিত। এতে বাড়ানী হিসেবে যা পেত তা দিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চলতো তাদের। আবার কেউ ধান কিনে ঢেঁকিতে চাল করে বাজারে বিক্রি করে সেই আয় দিয়ে সংসার চালাতো। এ সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা একত্রে ঢেঁকিতে ধান বানতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের হাসির কিচ্ছা কাহিনী, গ্রামীণ গীত, ছিলক বলতো। এতে তাদের শ্রমের কষ্ট কমে যাওয়াসহ সময় কেটে যেত আনন্দে এবং ধান বানার কাজও শেষ হয়ে যেত।

ঢেঁকি। ছবি : শাকিল মোল্লা।

শুধুই কি তাই। বাড়িতে মেহমান এলে বৌ-দিদিরা পিঠা বানানোর জন্য ঢেঁকিতে চালের গুড়া করে রাতভর পিঠা বানিয়ে রাখতেন। পরদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে সবাই একসাথে বসে পিঠা ভোজনের আয়োজন হতো। এক্ষেত্রে ঢেঁকির ছাটা চাল পাওয়া দূরে থাক পিঠা তৈরির জন্য চালের গুড়া করতে দু‘এক গ্রাম খুঁজলেও এখন আর ঢেঁকির সন্ধান মেলে না। বড় গৃহস্থের বাড়িতে কয়েক বছর আগেও একাধিক ঢেঁকি দেখা যেত। যদিও কুমিল্লার কোনো কোনো গ্রামে এখনো কালে-ভদ্রে কিছু-কিছু বাড়িতে জরাজীর্ণ অবস্থায় ঢেঁকি পাওয়া যায়। তবে তা একেবারেই নগণ্য।

এখন ঢেঁকির পরির্বতে বিদ্যুতচালিত মেশিন, ধানের চাতালে, ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনে ধান ভাঙানো ও পিঠা, সেমাই বানানোর চালের গুড়াও প্রস্তুত হয়। এসব ইঞ্জিনচালিত যন্ত্র এখন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হাট বাজার, পাড়া-মহল্লায় বসানো হয়েছে। এখন বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দুই চাকার ঠেলাগাড়ি, তিন চাকার ভ্যানগাড়িতে করে শ্যালো মেশিন দিয়ে ধান ভাঙানোর কল নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ধান ভাঙানো হয়।

কথা হয়, জগতপুর গ্রামে ভ্রাম্যমাণ মেশিনে ধান ভাঙানোতে ব্যস্ত আ. রহিমের সাথে। তিনি আজকের পত্রিকাকে জানান, প্রতিমণ ধান ৪০ টাকায় ভাঙানো হয় এবং প্রতি লিটার কেরোসিনে ৪ মণ ধান ভাঙানো যায়। আমন মৌসুমে তার অর্ধলাখ টাকার মতো ইনকাম হয়।

প্রযুক্তির পরিবর্তনে কতিপয় ব্যক্তির পোয়াবার হলেও গরিব অসহায় বাড়ানী নারীরা অর্থাৎ যারা ঢেঁকিতে ধান ভেঙে জীবিকা নির্বাহ করতেন এখন তারা অনেকেই অসহায় অবস্থায় জীবনের ঘানি টানছেন। আবার কেউ ভিক্ষা করে দিন অতিবাহিত করছেন। এ পেশার জড়িত রোকন উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঢেঁকির ছাটা ধানের চালের ভাত খেতে সুস্বাদু এবং ঢেঁকির চালের গুড়া দিয়ে পিঠা বানালে এর স্বাদ অনেক বেশি। তাদের কথা আবেগ তাড়িত হলেও বহুলাংশে সত্য বলে মনে করেন, আবুল কালাম নামে এক গৃহস্থ।

ঢেঁকি বানার শব্দে যে কৃষকের ঘুম ভাঙতো সেই কৃষক যন্ত্রচালিত মেশিনের বিকট শব্দে বেহাল অবস্থায়ও জেলার কিছু-কিছু এলাকায় এখনো প্রায় বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি অস্বিত্ব ধরে রাখতে টিকে আছে। সারাদেশের মতোই কুমল্লার কৃষি নির্ভর অঞ্চলেও আজ যান্ত্রিকতার চাপে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি শিল্প ক্রমান্বয়ে হারাতে বসেছে তার আপন ঐতিহ্য।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি/আ.স্ব/