প্রত্যেকের জীবনেই জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবনের একটি সময়ে প্রতিটি মানুষকেই কারো না কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়, বিয়ের মাধ্যমে দুইজন মানুষ সারাজীবন একসাথে চলার প্রতিশ্রুতি নেয়। উপযুক্ত এবং সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া বিবাহিত জীবন সুখময় হওয়ার পূর্বশর্ত।

এই সময়ে করা যে কোনো ভুলের মাশুল আপনাকে সারাজীবন ভোগ করে যেতে হবে। সুতরাং, যে কাউকে অবশ্যই এটি মাথায় রাখতে হবে যে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তটি অনেক ভেবে-চিন্তে নেওয়া উচিত। এক সময় আমাদের দেশে বেশিরভাগ বিয়ে পরিবারের ইচ্ছাতেই হতো, যদিও এখন যুগ পাল্টিয়েছে। যোগ্য পাত্র-পাত্রী হলে পছন্দের বিয়েতে আজকাল পরিবারগুলো খুব একটা আপত্তি করে না।

একদিকে ব্যক্তিগত পছন্দের ক্ষেত্রে যেমন সৌন্দর্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব রাখে, অপরদিকে পারিবারিক পছন্দের ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়গুলি ছাড়াও ক্যারিয়ার, পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব লাভ করে। তবে নিজের ইচ্ছাতে হোক আর পারিবারিক পছন্দেই হোক উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। জেনে নিন এ বিষয়গুলো সম্পর্কে-

সততা
যাকে আপনি সারাজীবনের সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তার মাঝে কতটুকু সততা রয়েছে তা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। সঙ্গে যদি সৎ না হয়, জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসততা ঢুকে পড়বে। আর জীবনকে ভীষণভাবে বিষময় করে তুলবে। সততার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হচ্ছে সত্য বলার মানসিকতা। সুতরাং, আপনার ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য সঙ্গীর মধ্যে সত্য বলার প্রবণতা কিংবা মিথ্যা বলার অভ্যাস রয়েছে কিনা, তা অন্তত যাচাই করে দেখার চেষ্টা করুন।

নির্লোভ
সঙ্গীর মাঝে মোহ বা লোভ রয়েছে কিনা, সেটাও অনেক গুরুত্ব বহন করে। যেমন- আপনার সঙ্গীটি যদি নির্লোভ হয়, তবে আপনি একটি সহজ ও সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা পাবেন। কিন্তু সঙ্গীটি যদি অতি মাত্রায় লোভী হয়, তবে আপনাকে নানা রকম ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। লোভ প্রায়ই পারিবারিক অশান্তি তৈরিতে অনেক ভূমিকা রাখে। লোভী সঙ্গী সব সময় আপনার পরিবারের সম্পত্তির দিকে চেয়ে থাকবে। কে বাঁচলো, কে মরলো, কে কতটুকু ভাগে পাবে ইত্যাদি হিসেব নিকাশের মধ্যে পড়ে থাকবে। তাই, এমন একজন জীবনসঙ্গী নির্বাচন করুন, যার মাঝে লোভ-লালসা নেই।

মিশুক
যার সাথে আপনি জীবনের বাকিটা সময় কাটিয়ে দেবার স্বপ্ন দেখছেন, সেই মানুষটি যদি মিশুক না হয়, তাহলে এটি আপনার জন্য অনেক বড় দুঃসংবাদ। আপনার জীবন সঙ্গীকে অবশ্যই সবার সাথে সহজভাবে মেলামেশা করার মতো মন মানসিকতার অধিকারী হতে হবে। বিষয়টির গুরুত্ব দুইভাবে বিবেচনা করা যায়। প্রথমত, আপনার জীবনসঙ্গী যদি এমন না হয়, তবে কখনোই সে আপনার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজনকে আপন করে নিতে পারবে না। আর দ্বিতীয়ত, আপনি বা সে কোনো কাজে একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা করতে বা আলাপ আলোচনা করতে পারবেন না। উভয় ক্ষেত্রেই সম্পর্কে দুরত্বের সৃষ্টি হবে।

মানসিক স্থিরতা
জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানসিক স্থিরতা দেখা অনেক জরুরি। ধরুন, বিয়ের আগে আপনারা দুজন কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন। হতে পারে, অটোরিকশা কিংবা প্রাইভেট কারে। মাঝ পথে গিয়ে গাড়িটির চাকা পাংচার হয়ে গেল কিংবা অন্য কোনো যান্ত্রিক ক্রুটির ফলে গাড়িটি আর চলছে না। ড্রাইভার বেচারা এটা সেটা নেড়ে চেড়ে গাড়িটিকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। ভয়ে আপনাদের দিকে ঠিকমতো তাকাতে পারছে না। তার অবস্থা দেখে আপনার মায়া লাগছে, অথচ আপনার সঙ্গীটি ড্রাইভারটিকে নানা রকম বকাঝকা শুরু করেছে। এ ধরনের অস্থিরতা ক্রমাগত দেখাতে থাকলে, তা আপনাদের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলবে।

পছন্দ ও মতের মিল
আপনি যদি জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন কাউকে বেছে নেন যার পছন্দ এবং অপছন্দ অনেকটাই আপনার সাথে মিলে যায়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই আপনাদের সুন্দর ভবিষ্যতের পক্ষে কাজ করবে। তার মানে এই নয় যে, আপনাদের দুজনের সব পছন্দ অপছন্দই মিলতে হবে। বেশিরভাগ মিলে যাওয়াটাই ভালো।

ব্যক্তিত্ব
ব্যক্তিত্ব এমন একটা বিষয় যা কোনো কিছু দিয়ে মাপা যায় না, কিন্তু সহজেই বোঝা যায়। সঙ্গীর সঙ্গে কিছুদিন মেশার সুযোগ পেলেই আপনি নিজে নিজেই বুঝে ফেলবেন, সে কতটা ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একটা মানুষের চিন্তার ভাবপ্রকাশ, অনুভূতির সীমানা আর অন্যদের সঙ্গে আচরণের ধরন দেখে তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

যোগ্যতা
যোগ্যতার মাপকাঠিতে প্রথমেই আসে শিক্ষা। সুতরাং, শিক্ষাগত যোগ্যতাকে গুরত্ব দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই বাঞ্চনীয়। তবে, এটা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, দেখতে হবে পারিবারিক, সামাজিক এবং মানসিক শিক্ষাও। আজকালকার সময়ে বেশিরভাগ মেয়ের বাবারাই সফল থেকে সফলতর ব্যক্তির সাথে তার মেয়ের বিয়ে দিতে আগ্রহী হয়ে থাকেন। কিন্তু দেখা যায় যে, অধিক যোগ্যতা সম্পন্ন বা সফল ছেলে বা মেয়ের সাথে বিয়ে হলে তাদের মধ্যে নিজেদের যোগ্যতা বা সফলতা নিয়ে এক ধরনের অহংকারের সৃষ্টি হয়। একে অপরের মতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে এবং যতটা সম্ভব উভয় একে অপরের উপর নিজেদের সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাই অধিক যোগ্য বা সফল ব্যক্তির সন্ধান না করে নিজের যোগ্যতার সাথ সামঞ্জস্যপূর্ণ কাউকে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা অধিকতর সঠিক সিদ্ধান্ত।

সম্মান দেওয়ার মানসিকতা
যে ব্যক্তি আপনাকে সম্মান করে না, সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসতে পারবে না। একে অপরের মূল্যায়নের মাধ্যমেই সংসার সুখের হয়ে ওঠে। তাই বিয়ের আগেই আপনি যাকে জীবনসঙ্গী করতে চলেছেন সে কেমন মন মানসিকতার অধিকারী এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তার মনোভাব কেমন, তা অবশ্যই বিচার করে দেখুন।

মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা
জীবন চলার পথে, বিশেষ করে দুজন মানুষের এক সাথে চলার ক্ষেত্রে, কারো না কারো কোনো না কোনো কাজে ভুল হতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী কখনোই আপনার দোষ বা ভুলের জন্য আপনাকে দোষারোপ করবে না, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সে আপনার পাশে এসে দাড়াবে। আপনাকে সহজভাবে ভুল আর সঠিকের পার্থক্য বুঝানোর চেষ্টা করবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে আমরা তিরস্কার করতে বেশি পছন্দ করে থাকি, কিন্তু একটি সম্পর্কের মধুরতা এ ধরনের কার্যকলাপে সারাজীবনের মতো শেষ হয়ে যেতে পারে।

আজকের পত্রিকা/সিফাত