মো: রফিক এর ছেলে রহিম উল্যাহ শাহী রিনকের হাতে মো: রফিক।

মো. রফিক। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। তিনি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারল্যান্স (পিআইএ) করাচি এয়ারপোর্টে স্টোর কিপার পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আটকা পড়েন পাকিস্তানের করাচিতে।

পরে আসার কথা থাকলেও রাষ্ট্রীয় ছুটি না পাওয়ার কারণে তিনি দেশে ফিরে আসতে পারেননি। একইভাবে আরো অনেক বাঙালি পাকিস্তানে আটকা পড়েন। ফিরে আসার অপেক্ষায় বিগত ৪৮ বছর পার করেন তার পরিবার ও একমাত্র ছেলে রহিম উল্যাহ শাহী রিনক। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি।

রফিক ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের ধুনসাহাদ্দা গ্রামের হাজী আবদুল করিম ভূঁইয়া বাড়ির মো: আপেক মিয়ার ছেলে। মো: রফিক ১৯৬৮ সালে একই ইউনিয়নের মধুয়াই গ্রামের আলী আরশাদের একমাত্র মেয়ে রহিমা আক্তার রুমার সাথে বিবাহ বন্ধনে অবদ্ধ হন। বিয়ের এক বছর পর স্ত্রী রহিমা আক্তার রুমাকে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যান। তারা স্বামী-স্ত্রী সেখানে মালি ক্যান্টমেন্টে বসবাস করতেন।

১৯৭১ সালের শুরুর দিকে রফিকের শ্বশুর আলী আরশাদ নিরাপত্তার স্বার্থে করাচি গিয়ে তার মেয়ে রহিমা আক্তার রুমাকে নিয়ে আসলেও ফিরে আসেননি মো: রফিক। তখন রফিকের স্ত্রী রহিমা আক্তার রুমা ৬-৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ১৯৭১ সালের শেষে দিকে মো: রফিকের একটি ছেলে জম্ম নেয়। তার একমাত্র ছেলে রহিম উল্যাহ শাহী রিনক বাবার অপেক্ষায় এখনো প্রহর গুণছে।

আমির হোসেন জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দিলে পাকিস্তানে রফিক স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। পরিবারের ধারণা বাঙালি পরিচয় জেনে পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করে লাশ গুম করে।

রফিকের ফুফাতো ভাই আমির হোসেন আরো জানান, মো: রফিক আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। সে পাকিস্তানে সরকারি চাকরি করতো। সে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারল্যান্স (পিআইএ) করাচি এয়ারপোর্টে স্টোর কিপার পদে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবঙ্গু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা যুদ্ধের ডাক দেয়ার পর থেকে দেশে ফিরে আসার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন জটিলতায় সে দেশে ফিরে আসতে পারেননি। এলাকার অংসখ্য ব্যক্তিকে দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি সহযোগিতা করেন। সে একজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একনিষ্ঠ সৈনিক ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিচিত অনেক মানুষকে দেশে পাঠালেও মো: রফিক ফিরে আসতে পারেননি। তিনি করাচিতে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন।

আমির হোসেন আরো বলেন, জীবিকার তাগিতে স্বাধীনতার যুদ্ধের পর আবারও পাকিস্তান যান। আমির হোসেন পাকিস্তানে চাকরি করতেন। তিনি ২০০৫ সালে দেশে চলে আসেন। আমির হোসেন সেখানে দীর্ঘ সময় থাকাকালীন সময়ে মো: রফিক যে সব এলাকায় যেতেন বা যাদের সাথে চলাফেরা ও উঠা-বসা ছিল সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। কিন্তু তার কোনো হদিস মিলেনি। মালি ক্যান্টনমেন্ট এলাকার দোকানি ও আশপাশের লোকজন বলেন, রফিক ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। এরপর তাকে আর দেখাও যায়নি।

রফিকের ছোট ভাই আলা উদ্দিন জানান, কবির আহমদ, মনির আহম্মদ মেম্বারসহ ৪ ভাইয়ের মধ্যে তিনি জৈষ্ঠ ছিলেন। অন্য ভাইয়েরা সবাই জীবিত রয়েছেন। মো: রফিক মিয়া তৎকালীন সময়ে পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ছিলেন। পরিবারের বাবা-মাসহ ৬ জনের উপার্জন সক্ষম ছিলেন বড় ভাইয়া। বাবা-মা বলতেন পরিবারকে স্বাবলম্বী  করার জন্য তিনি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনা এয়ারলাইন্সে চাকরি করার সুবাদে সেখানেই থাকতেন। ১৯৬৮ সালে বিয়ে করার পর ভাবিকেও সেখানে নিয়ে যান। তৎকালীন সময়ে বিয়ের পর স্ত্রী সাথে থাকলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যায়। সে সুবাদে ভাবিকে সেখানে নিয়ে যান। অর্থাৎ পরিবারকে সমাজে উঁচু করে দাঁড় করাতে তিনি ছিলেন একমাত্র অবলম্বন।

বালিগাঁও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক আলা উদ্দিন আরো জানান, বড় ভাই দেশে ফিরে না আসায় এবং কোনো হদিস না মিলায় পিতা আপাদ মিয়া ও মা পাঞ্জব বিয়া যতদিন বেঁচে ছিলেন সব সময় কান্নাকাটি করতেন। বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন বড় ভাই ফিরে আসবে বলে অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ভাইতো আর ফিরে আসেননি।

মুছা আহমেদ জানান, তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা মকবুল আহমেদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাবিলদার ছিলেন। সরকারি চাকরি করার সুবাদে মো: রফিকের সাথে পরিচয় ছিল। প্রায় সময় তার সাথে কথা ও দেখা হতো। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়ার পর তার সাথে আর দেখা হয়নি।

মো: রফিকের একমাত্র ছেলে রহিম উল্যাহ শাহী রিনক বলেন, জীবনে কখনো বাবার মুখ চোখে দেখিনি। শুধু মুখে শুনেছি। জীবনের ৪৮ বছর পরও বাবাকে দেখার ইচ্ছে ফুরায়নি। তিনি আবেগ জনিত কণ্ঠে বলেন, সন্তান বুড়া হলেও পিতা আর সন্তানের সর্ম্পক শিশুর মতোই থাকে।

রিনক আরো বলেন, আমি যখন পিতা হয়েছি তখন আরো বেশি উপলব্ধি করতে পারি যে সন্তান আর পিতার সম্পর্ক কত বেশি দুর্লভ। আমার ছেলে রিজন যখন আমাকে বাবা শব্দ বলে ডাক দেয় তখন আমার বুক ফেটে কান্না আসে। অনেক সময় চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। ছেলে বলে বাবা তোমার চোখে পানি কেন? জীবনে কখনো বাবা ডাকার মধুর শব্দটি নিজ মুখে উচ্চারণ করতে পারিনি। বরং ছেলেকে বাবা ডেকে নিজের আবেগ-অনুভূতি বিসর্জন দিচ্ছি। বাবা ফিরে আসবে বলে এতটি বছর অপেক্ষার পর আর কিছুতেই মনকে বুঝাতে পারছি না। নিজের অনুভূতির কথা গণমাধ্যমের ভাইদের সাথে ব্যক্ত করার পর উৎসাহ পাই যে, বাবাকে নিয়ে পত্রিকায় যদি একটা লেখা আসে তাহলে অন্তত সান্ত্বনা পাবো। নিজের দায়িত্বটুকু কিছু হলেও পালন হবে বলে উপলব্ধি আসে।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আকুল আবেদন তৎকালীন সময়ের পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারল্যান্স (পিআইএ) করাচি এয়ারপোর্টের স্টোর কিপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন মো: রফিক। বিষয়টি রাষ্ট্রীভাবে দায়িত্ব নিয়ে অনুসন্ধানমূলক কাজ করা হলে আশা করি খবর পাওয়া যেতে পারে। রিনক সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

আলী হায়দার মানিক, ফেনী/জেবি