জব্বারের বলি খেলা শুরু। ছবি : ফেসবুক।

আজ ২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দানে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের ১১০তম বলী খেলার আসর শুরু হয়েছে। সিরাজগঞ্জের মো. শফিকুল ইসলাম ও মহেশখালীর সিরাজুল মোস্তফার মধ্যে লড়াইয়ের মাধ্যমে শুরু হলো ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বারের বলী খেলার ১১০তম আসর।

প্রথম রাউন্ড শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় রাউন্ডে ১৬ জনের মধ্যে থেকে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে।

খেলা পরিচালনা করছেন রেফারি সাবেক কাউন্সিলর আবদুল মালেক। তাকে সহযোগিতা করছেন মোহাম্মদ লেদু ও জাহাঙ্গীর আলম।

এর আগে বিকেল সোয়া চারটায় বেলুন উড়িয়ে বলী খেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান।

তিনি বলেন, আজকে চট্টগ্রামবাসীর জন্য আনন্দের দিন। যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য যে জব্বারের বলী খেলা শুরু হয়েছিল তা ১১০তম আসরে পা দিয়েছে। বর্তমান সরকারকে অনুরোধ জানাবো, এ খেলা যেন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার জন্য সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য । এ খেলার মাধ্যমে সকল প্রকার অপসংস্কৃতি বিলুপ্ত হবে। বাঙালির প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

জব্বারের বলী খেলা শুরু। ছবি : ফেসবুক।

তিনি বলেন, জব্বারের বলী খেলা উপলক্ষে নিরাপত্তা কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।

প্রধান অতিথি হিসেবে পুরস্কার বিতরণ করবেন মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিশেষ অতিথি থাকবেন গ্রামীণফোনের চিফ মার্কেটিং অফিসার অ্যান্ড ডেপুটি সিইও ইয়াসির আজমান।

১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে এ প্রতিযোগিতার সূচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এ প্রতিযোগিতা জব্বারের বলী খেলা নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। প্রতি বছর ১২ বৈশাখ নগরের লালদীঘি মাঠে এ বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় ‘বলী’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘কুস্তি’ বলী খেলা নামে পরিচিতি।

এবার বলী খেলায় চ্যাম্পিয়নকে নগদ ২০ হাজার টাকা ও ট্রফি এবং রানারআপকে নগদ ১৫ হাজার টাকা ও ট্রফি দেওয়া হবে। অন্য বলীদের নগদ ১ হাজার টাকা ও একটি করে ট্রফি দেওয়া হয়।

 

সরেজমিন দেখা গেছে, ভুভুজেলাসহ নানা বাদ্য বাজনার আনন্দ উল্লাস মেলায় জানান দিচ্ছে বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাশাপাশি শিশু কিশোরদের উপস্থিতি। নানা পণ্যের ক্রেতা-বিক্রেতারদের দরকষাকষিতেও উৎসবের উম্মাদনা। নাগরিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষ শীতল পাটিসহ গৃহস্থলী জিনিশপত্র কিনতে মরিয়া।

তিন দিনব্যাপী মেলার প্রধান আকর্ষণ জব্বারের বলী খেলা এই আয়োজন। বলী খেলাকে কেন্দ্র করে মেলাজুড়ে দেখা দেয় মানুষে আরেক উৎসাহ উদ্দিপনা। বিভিন্ন বলীর শরীর কসরত দেখেও দর্শকরা উদ্বেলিত হয়ে উঠে।

গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ। বাতাসের সাথে আগুনের হুলকির মতো গায়ে এসে লাগছে। সবকিছু উপেক্ষা করে বুধবার থেকে নগরীর লালদিঘি ময়দানে জমে ওঠে তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক বৈশাখী মেলা। লালদীঘির মাঠসহ প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে দোকানিরা রয়েছে রকমারি পণ্যের পসরা সাজিয়ে।

হাতপাখা, শীতল পাটি, মাটির কলস থেকে শুরু করে চুড়ি ফিতা, রঙিন সুতা, হাতের কাঁকন, নাকের নোলক, মাটির ব্যাংক, ঝাড়ু, খেলনা, ঢোল, বাঁশি, বাঁশ বেতের নানা তৈজসপত্র, কাঠের পুতুল, নকশী কাঁথা, মাছ ধরার চাঁই, বেতের তৈরি চালুনি, তৈজসপত্র, মাটির তৈরি পুতুল, মাটির তৈরি খেলনা, ফুলদানি, তালপাখা, টব, হাঁড়ি-পাতিল, কুলা, গাছের চারা, দা-বটি, বৈশাখী ফল, খাঁচার পাখি, সবকিছুই পাওয়া যাবে মেলায়।

বলি খেলায় আগত দর্শনার্থী ও আয়োজনকবৃন্দ।

এখানে থাকবে ঘর সাজাবার উপকরণ, তেমনি থাকবে নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী। এছাড়া থাকবে মুড়ি মুড়কি, লাড্ডুর মতো রসনা তৃপ্তির নানা উপকর।

আবদুল জব্বারের বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অহংকারে পরিণত হয়েছে বহু আগ থেকেই। বর্তমানে দশের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসব হিসেবে পরিণত হয়েছে এই মেলা ও বলী খেলা।

সেই ১৯০৯ সাল থেকে এর সূচনা। বৈশাখী মেলাকে ঘিরে লালদীঘি ময়দানে নাগরদোলা, সার্কাস ও বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

লালদীঘি ময়দান থেকে আন্দরকিলা, সিনেমা প্যালেস, কোতোয়ালী মোড় পর্যন্ত দোকানিরা বসে গেছেন পসরা নিয়ে। বিক্রি হচ্ছে হাতপাখা, শীতল পাটি, মাটির কলস,চুড়ি, ফিতা, রঙ্গিন সুতা, হাতের কাঁকন, নাকের নোলক, মাটির ব্যাংক, ঝাড়ু, খেলনা, ঢোল, বাঁশি, বাঁশ ও বেতের নানা তৈজসপত্র, কাঠের পুতুল, নকশী কাঁথা, প্লাস্টিক সামগ্রী।

এছাড়াও বিক্রি হচ্ছে মুড়ি মুড়কি, লাড্ডুসহ হরেক রকম উপাদেয় খাবার দাবার।

সারা বছর চট্টগ্রামের মানুষ অপেক্ষা করে থাকেন এই মেলার জন্য। কারণ এতে পাওয়া যায় নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী আর ঘর সাজাবার উপকরণ।

জানা যায়, ১১০ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরীর বদরপাতি এলাকার আবদুল জব্বার সওদাগর আয়োজন করেছিলেন প্রীতি কুস্তি নামক এ বলী খেলার।

মূলত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ ও শারীরিকভাবে সক্ষম করে তুলতে ১৯০৯ সালে তিনি এ বলী খেলার আয়োজন করেছিলেন। তারপর থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে জব্বার মিয়ার বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা।

উপমহাদেশের বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ধারক বাহকে পরিণত হয়েছে। দেশের আরো কিছু স্থানে বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসলেও কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেসব আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে। তবে কোনো কোনো এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু জব্বার মিয়ার বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা এখনো ধরে আছে তার কীর্তিময় ইতিহাস।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি