জাহেদুল ইসলাম মিরাজ, বাঁশখালী: বিয়ে পারিবারিক জীবনের প্রথম শর্ত। একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে সহজীবন-যাপনের যে বন্ধন স্থাপিত হয় তারই নাম বিবাহ। বাংলাদেশে শহুরে বিয়ের অনুষ্ঠান যেন মানুষের মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

বিয়েতে কে কত বেশি জমকালো আয়োজন করতে পারে, অর্থ ব্যয় করতে পারে, তার যেন প্রতিযোগিতা চলে আজকাল৷ চট্টগ্রামের বিয়ে বাড়ী হলে তো কথাই নেই, তথাকথিত সংস্কৃতির নামে বিয়ে বাড়িতে থাকতে হবে হাজার হাজার লোকের খাওয়া-দাওয়া সহ নানা রকম আয়োজন।

মেয়ে পক্ষের লক্ষ লক্ষ টাকার কাবিনের চাপ। সংস্কৃতির নামে বিয়েকে দিন দিন কঠিন করে ফেলেছি আমারা। সারা বিশ্বের ন‌্যায় বাংলাদেশেও গত চার মাস ধরে রয়েছে ‘করোনা’ ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব। বন্ধ রয়েছে, বিয়ে, জন্মদিন, মেজবান আকিকা, বৌ-ভাত সহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। কমিউনিটি সেন্টার গুলোতে ঝুলছে তালা। বেকার সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি সেন্টারে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

কারণ করোনা প্রদুর্ভাব এর কারণে হাজার হাজার লোকের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছাড়াই এখন বিয়ে সহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এর মধ্যে অনেকেই আবার ঘরোয়াভাবে বিয়ে সম্পন্ন করছেন।

কোন প্রকারের অনুষ্ঠান ছাড়াই সীমিত পরিসরে। কোনরকম ছেলেমেয়েদের এসব বিয়ের আয়োজন করছেন ফলে বিয়ের খরচও কমে এসেছে ৮০-৯০ শতাংশের মধ্যে। যেখানে আগে একটা বিয়েতে ন্যূনতম উভয়পক্ষের মিলে ৮ থেকে ১০লাখের বেশি টাকা খরচ হতো এখন সেখানে মাত্র ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা দিয়েই বিয়ে সম্পন্ন করছেন তারা। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিয়ের পর অনেকেই পোস্ট দিতে।

কিন্তু বাস্তবে কোন ধরনের আয়োজন ছাড়াই ঘরোয়াভাবেই বিয়ে সম্পন্ন করছেন তারা। অনেকের বন্ধুই জানেনা কখন যে তাদের বন্ধু-বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেল। সম্প্রতি গত শুক্রবার তেমনই এক বিবাহে দেখা যায় বাঁশখালীতে। সম্প্রতি বিয়ে সম্পন্ন করেছেন বেলাল উদ্দিন ও শাহিদা ইয়াসমিন দম্পতি। সদ্য বিবাহিত বেলাল উদ্দিন ও শাহিদা দম্পতির পরিকল্পনা ছিল অনেক হৈ-হুল্লোড় করে তাদের বিয়ে হবে।

লাখ লাখ টাকা খরচ করে পাড়া-পড়শী, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবদের কে নিয়ে বিয়ের আমেজ মেখে ফুর্তি করবেন। লাখ লাখ টাকা খরচ করে মেহেদি রাতের অনুষ্ঠানে নানা আয়োজনের কমতি রাখবেন না। সম্প্রতি গত শুক্রবার তার বিয়ে হয়ে গেল জানতে পারল না কেউ। জানালেই বা কি হবে করোনার কারণে সমস্ত বড়োসড়ো আয়োজন তো বন্ধ করতে বলেছে সরকার। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বল্প কয়েকজন মানুষ নিয়ে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

দেখা যাচ্ছে সব জায়গায় খুব স্বল্প পরিসরে এসব বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে । সেখানে অনেকেই মন্তব্য করেন কম খরচে বিয়ের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে স্বল্পআয়ের যুবক।

বেলাল উদ্দিন রানা একটা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করেন। প্রায় কয়েক বছর প্রেমের সম্পর্ক তাদের। কথা হলে বেলাল উদ্দিন আরও জানান, কমবেশি আমরা সবাই জানি করোনা দ্রুত যাচ্ছে না। তাই করোনার মধ্যে গত ৩ জুলাই‌ আমার বিয়ে সম্পন্ন করি। যেখানে অন্য সময়ে স্বাভাবিক বিয়েতে ৫-৬ লক্ষ টাকা খরচ করতে হতো এখন সেখানে মাত্র ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। তিনি যুব সমাজকে তার মত করে সহজ ভাবে বিয়ে করার জন্য পরামর্শ দেন। যাতে বিয়েটা সহজ হয়। তিনি বলেন, ঠিক একইভাবে তার পার্শ্ববর্তী ভাই আবুল কাসেম বিন আলীর বিয়েও সম্পন্ন হয়।

বিবাহের বিষয়ে কথা বললেই ওসমান কমিউনিটি সেন্টারের মালিক শওকত ওসমান বলেন, কমিউনিটি সেন্টারে এখন কোন ধরনের বিবাহ, মেজবান, জন্মদিনের অনুষ্ঠান, বৌ-ভাত কিছুই করতেছে না। সমস্ত কমিউনিটি সেন্টারগুলো এখন প্রায় বন্ধের পথে। শোনা যাচ্ছে কেউ কেউ কমিউনিটি সেন্টারে দোকান খোলার পরিকল্পনা করছেন। করোনার কারণে খুব খারাপ সময় পার করতে হচ্ছে। কমিউনিটি সেন্টারে কর্মরত কর্মচারীরা অভাবের দিন কাটাচ্ছে।

বর্তমান বিবাহের বিষয়ে সরল ইউনিয়নের কাজী মাওলানা মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, এখন প্রতিটি বিয়ে বর-কনের স্থানীয় মসজিদেই বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজী অফিসে এসে বিয়ে করতেছে অনেকেই । আগের মত জমকালো বিয়ে নয়, ছোট্ট পরিসরে খোরমা খেজুর দিয়েই বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। যার কারণে দুই পক্ষেরই সুবিধা হচ্ছে।

জানতে চাইলে আনোয়ারা আমির বিবি শাহী জামে মসজিদের খতিব‌ হাফেজ ক্বারী নুরুল ইসলাম নূরী বলেন, ইসলামে বিয়ে কে খুব সহজ করে দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবন মানবজীবনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর সূচনাপর্ব হলো বিবাহ। বিবাহ হলো ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক ইবাদত। কোরআন মজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা বিবাহযোগ্যদের বিবাহ সম্পন্ন করো, তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছলতা দান করবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্ব জ্ঞানী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, হে যুবক সম্প্রদায় তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জা স্থান হেফাজত করে। সুন্নত তরিকায় বিবাহ সম্পাদন বরকতময় হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: নিশ্চয় সে বিয়ে বেশি বরকতপূর্ণ হয়, যে বিয়েতে খরচ কম হয়। এ ছাড়া বিয়ের সংশ্লিষ্ট আরও কিছু সুন্নত রয়েছে। যেমন: বিবাহ সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর হওয়া; অপচয়, অপব্যয় ও অপসংস্কৃতিমুক্ত হওয়া, যৌতুকের শর্ত না থাকা এবং সামর্থ্যের অধিক দেনমোহর ধার্য বা শর্ত না করা। এ ছাড়াও অপব্যয় ও অপচয় নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কোরআনে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না।

জেনে রেখো, যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই।’ কিন্তু আমরা তথাকথিত সংস্কৃতি নাম এই বিয়েকে দিন দিন কঠিন করে ফেলেছি। বিয়ের আগেই ছেলেপক্ষ ঠিক করে দিচ্ছে মেয়ে পক্ষকে ৫০০/১০০০ মানুষকে খাওয়াতে হবে। আবার মেয়েপক্ষের কাবিনের একটা চাপ থাকে। যার কারণে সবকিছুই উভয় পক্ষের উপর এক ধরণের বোঝা। তিনি আরো বলেন তথাকথিত আনুষ্ঠানিকতার কারণে বিয়েকে দিন দিন কঠিন করে ফেলা হচ্ছে। ফলে এর কারণে সত্যি ও যুবক-যুবতীরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছে না। এর কারণে অনেকেই আবার বিভিন্নভাবে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে আমাদের এখন কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে এর মধ্যে এখন দেখা যাচ্ছে ছোট্ট পরিসরে বিয়ের আয়োজন করে আকদ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না কিছুদিনের মধ্যে আমি নিজেও মসজিদে অনেক বিবাহের আকদ পড়িয়েছি এসময় একজন বর কে জিজ্ঞেস করেছিলাম মেয়ে কখন উঠে আনবে?

তখন বর উত্তর দিল, আজ আকদ শেষ করে তার বাবা-মা ও বড় ভাই গিয়ে মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে আসবে। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে হাজার হাজার লোকের খাবারের আয়োজন না করে বিয়ে সম্পন্ন হয়। শিখিয়েছে লাখ লাখ টাকা খরচ করা ছাড়াও বিয়ে করা সম্ভব। করোনা পরবর্তী সময়ে আমাদের সংস্কৃতি অনুসরণ করা উচিত।করোনা শেষ হলেও এই রীতি যেন প্রচলন থাকে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে যারা বিয়ে করতে যাচ্ছেন তাদেরকে অবশ্যই সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্য নীতি মেনেই বিয়ে করা জরুরি। কেননা সুস্থ ও নিরাপদ জীবন লাভে স্বাস্থ্য নীতি মেনে চলার বিকল্প নেই।

  • 213
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    213
    Shares