নারী আন্দোলনের সংগঠক ও নারী গ্রন্থ প্রবর্তনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার। ছবি : আজকের পত্রিকা

চৈত্র সংক্রান্তি পালনের বিষয়টি বছর শেষ ঘোষণার জন্য নয়, কিম্বা পরদিন নতুন বছর শুরু হচ্ছে বলে ‘নববর্ষের’ প্রস্তুতিও নয়। দিনটি পালিত হয় মানুষের শরীর ও প্রকৃতির মধ্যে সম্বন্ধ রচনার যে চর্চা এই নদীমাতৃক সবুজ বদ্বীপে বহু দীর্ঘকাল ব্যাপি জারি আছে তাকে চিনবার ও জানবার জন্য। এ নিয়ে লিখেছেন নারী আন্দোলনের সংগঠক ও নারী গ্রন্থ প্রবর্তনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার।

চৈত্র মাস শেষ হচ্ছে, আসছে বৈশাখ। এর মধ্য দিয়ে আসছে বাংলা সনের আর একটি বছর, ১৪২৬। নতুনভাবে আসা বাংলা বছরকে আগাম শুভেচ্ছা জানাই। একবছর শেষ হয়ে আর একবছর আসছে তবে ১৪২৫ থেকে ১৪২৬, ইংরেজি ধারণা থেকে গুণতে যাওয়া ঠিক নয়। বাংলার ভাবে বছর আর ঋতুর প্রবল পার্থক্য রয়েছে যা আমরা এখন আর ধরতে পারি না। বাংলার ঋতু ফিরে ফিরে আসে, চক্রাকারে প্রত্যাবর্তন করে, একই ঋতুর বারবার আবির্ভাব হয়। ঋতু যে সময়কে জানান দেয় সেটা সরল রেখায় চলে না, তার চলন বৃত্তে। সংক্রান্তি সেই বৃত্তের অন্তর্গত। বৃত্তের যে কোনো বিন্দুর মতো যেখানে শেষ সেখানেই সেই একই বৃত্তেরই আরম্ভ। যা শেষ, তা একই সঙ্গে শুরুও বটে।

‘সংক্রান্তি’ তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। সংক্রান্তির ধারণায় পুরনো বৎসরের ‘আবর্জনা’ নেই, পুরনো মানেই সব খারাপ, জীর্ণ, গ্লানিকর বা আবর্জনা না। সংক্রান্তি তা দাবি করে না। তাই বাংলার সংস্কৃতিতে যা আমার পছন্দ নয় তাকে ‘দূর হয়ে যাক’ বলার প্রয়োজন নাই।

তবে প্রকৃতির নিজস্ব হিসাব-নিকাশ আছে। পুরাতনকে নতুন করে তোলার মধ্য দিয়ে সনাতনকে জারি রাখা। সনাতন মানে তাই যা সবসময়ই হাজির। যিনি হাজির তিনি প্রকৃতি স্বয়ং। তিনি কখনই ‘পুরাতন’ হন না। তাই সংক্রান্তিতে প্রকৃতি রক্ষার জ্ঞান চর্চা হয়, সেটাই মুখ্য। প্রকৃতিতে সদা সর্বদা নতুন রাখাই প্রকৃতির অন্তর্গত বলে মানুষেরও কর্তব্য। চৈত্রের শেষ দিনে (৩০ চৈত্র) চৈত্র সংক্রান্তি পালন এই ভাবকেই ধারণ করে। এর পরের দিন বিদেশি ধারণাজাত পয়লা বৈশাখ পালন এক কথা নয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে কোনো বছর বিদায় হয় না। সূর্য নতুন রাশিতে প্রবেশ করেন মাত্র।

গ্রামের কৃষক এবং বিশেষ করে নারীদের কাছে পয়লা বৈশাখ নয়, চৈত্র সংক্রান্তিটাই বেশি গুরুত্ব পায়। এই দিনে তারা নিজ নিজ পরিবেশে প্রাণ ও পরিবেশের খোঁজ খবর নেন। চৈত্র সংক্রান্তি বছরের অন্যান্য সংক্রান্তির মতো নয়। যেমন পৌষসংক্রান্তিতে কৃষক নতুন ধান আসার উৎসব পালন করে, পিঠা-পায়েশ তৈরি হয়, আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী নিয়ে সবাই মিলে আনন্দ করে খায়। মেয়ের জামাইকে দাওয়াত করে খাইয়ে মেয়ের সংসার সুখের করে তোলে। ধানের বিভিন্ন জাতের উৎপাদন হয়; পিঠার জন্যে কয়েক ধরনের ধান (হিজল দিঘা, চামারা দিঘা, ঢেপর), আর পায়েশের জন্যে অন্য ধান (কার্তিক ঝুল, চিনিগুড়ি) ব্যবহার করে তারা ধানের বৈচিত্র্য রক্ষা করেন। তেমনি মাসে মাসে আরো সংক্রান্তি আছে। আরও নানান উৎসব ও পার্বন আছে।

কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তি একেবারে অন্য ব্যাপার। এখানে আবাদী ফসলের কোনো কারবার নেই। নেই কোনো পিঠা পায়েসের আয়োজন। এই দিনে বাড়িতে চৌদ্দ রকমের শাক রান্না হয়, যার মধ্যে অন্তত পক্ষে একটি শাক খুবই তিতা হতে হবে। বেশ বেরসিক ব্যাপার। তিতা শাক হিসেবে চৈত্র মাসে গিমা শাক খেতেই হবে। গিমা শাকের পরিবর্তে যদি তিতা করলা খেতে হয়, যা একটি আবাদী ফসল, তাহলে বুঝতে হবে এখানে প্রকৃতি থেকে জরুরি কিছু হারিয়ে গেছে। ভালো লক্ষণ নয় মোটেও।
গিমা শাক বাড়ির আশে পাশে, পুকুর পাড়ে, জমিতে কিংবা রাস্তার ধারেও পাওয়া যায়। এটা লতা জাতীয়, পাতা ছিঁড়ে আনাও কঠিন তাই লতার অংশ নিয়ে এসে বাড়িতে পাতা বেছে নিয়ে রান্না করা হয়। গিমার তিতা খেতে কষ্ট হবে বলে কেউ তার সাথে বেগুন কিংবা আলু মিশিয়ে রান্না করে। আর যারা অবস্থাপন্ন তারা ঘি দিয়ে গিমা রান্না করে। গিমা তিতা হলে কী হবে, একবার খেতে পারলে পরে মুখটা মিষ্টি হয়ে থাকে। অপ্রিয় সত্যি কথার মতো।

চৈত্রসংক্রান্তি পালন কৃষক নারীর একটি পরিবেশ সংরক্ষণমূলক কাজ। তার জ্ঞান দিয়ে সে খবর নিতে চায় প্রকৃতির যে অংশ অনাবাদী- যে অংশ কৃষি সংস্কৃতির সংরক্ষণ করে রাখার কথা, সেই অনাবাদী প্রকৃতি ঠিক আছে কিনা। যেসব গাছপালা, প্রাণ ও প্রাণী আবাদ করতে গিয়ে আবাদী জায়গায় ‘প্রকৃতি’-কে ‘পুরুষ’ কৃষক দমন করেছে, উঠতে দেয়নি, থাকতে দেয়নি, তার বিচারের দিন চৈত্রসংক্রান্তি।

কৃষক নারী এই দিনে খবর নেয় ‘প্রকৃতি’-র সব কি ঠিকঠাক আছে তো? নাকি নাই? আবাদী ফসলের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে নির্দিষ্ট ফসলের বাইরে জমিতে অন্য কোনো গাছ-গাছালি, লতা-পাতা রাখা হয় না। নিড়ানি করে ফেলে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, বিশেষ ধরনের আগাছানাশক বা হার্বিসাইড (বিষ) ব্যবহার করা হয়। তার মানে অনাবাদী যেসব শাক ফসলের জমিতে বা আইলে আপনা থেকে গজিয়ে উঠেছিল তা সবই মেরে ফেলা হয়, কোনোমতে বেঁচে গেলেও বিষাক্ত হয়ে যাবে। খাওয়ার উপযোগী থাকবে না। আধুনিক আবাদী ফসলের এলাকায় চৈত্রসংক্রান্তি করা যাবে কিনা তাই সন্দেহ জাগে।

গ্রামের কৃষক নারী চৈত্রসংক্রান্তিতে শাক কুড়াতে বেরোয়। নিয়ম আছে তাকে চৌদ্দ রকম শাক কুড়াতে হবে। আবাদী নয়, অনাবাদী, অর্থাৎ রাস্তার ধারে, ক্ষেতের আইলে, চকে আপনজালা শাক তুলতে হবে। গ্রামে নারীর এই শাক তোলার অধিকার সামাজিকভাবে স্বীকৃত। নারীর দেখার বিষয় হচ্ছে যেই শাক তারা খুঁজছেন সেই শাক আছে কিনা। ধনী পরিবারের নারীরাও এতে সম্পৃক্ত থাকেন। তিনি নিজে শাক তুলতে বের না হলেও তার আশে পাশে যারা গরিব নারী আছেন তাদের মাধ্যমে শাক তুলিয়ে আনেন। মনে রাখতে হবে বলা হয় ‘শাকতোলা’; শাক ‘কাটা’ নয়। কখনোই তারা পুরো গাছটি উপড়ে ফেলে শাক আনবেন না। অতি যত্ম করে পাতাটি তুলে আনবেন। গাছ যেমন আছে তেমনই থাকবে।

একদিকে যেমন অনাবাদী হতে হবে, অন্যদিকে চৌদ্দ রকমের শাকের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে ‘চৌদ্দ’ সংখ্যাটা প্রতীকী। বেশি পাওয়া গেলে আরও ভালো। এই চৌদ্দ রকম শাক পাওয়াই এখন কঠিন হয়ে গেছে। চৈত্র মাসে পাওয়া যায় এমন শাক হচ্ছে নেটাপেটা, কলমি, হেলেঞ্চা, গিমা, দণ্ডকলস, কচু শাক, তেলাকুচা, ঢেঁকি শাক, হেঞ্চি, বতুয়া, খারকুন, খুইরাকাটা, পিপুল শাক, কস্তুরি, থানকুনি, খেতাফাটা, পাট শাক, শুশ্নি, নুনিয়া, হাগড়া ইত্যাদি। এর মধ্যেই কম পক্ষে চৌদ্দ রকম খুঁজে বের করতে হবে। অনাবাদী শাকের আরেক নাম হচ্ছে ‘কুড়িয়ে পাওয়া শাক’, কারণ এগুলো কুড়িয়ে আনতে হয়। এক এক এলাকায় ভিন্ন শাক, ভিন্ন নামে পাওয়া যেতে পারে। বাজারেও দুএকটি শাকের দেখা মেলে। এই শাকগুলো একই রকম পরিবেশে হয় না, কাজেই এই শাক পাওয়া না পাওয়া দিয়ে প্রকৃতির অবস্থা নির্ণয় করা যায়।

সেদিক থেকে চৈত্রসংক্রান্তিতে ‘চৌদ্দ’ রকম শাক খাওয়া আসলে সব রকম গাছপালা প্রাণ ও প্রাণীর হালহকিকতের খোঁজ নেওয়া। এটা নারীর সু² জ্ঞান, যা মা থেকে মেয়ে,পাড়া প্রতিবেশীরা ভাগাভাগি করে শেখে। আসলে আমরা খেয়াল করি না যে কৃষি বলতে আবাদী ও অনাবাদী দুটোই বোঝায় এবং আবাদী ফসলের সাথেই এবং প্রাণ বৈচিত্র্য নির্ভর কৃষি হলেই অনাবাদী ফসলও আপনা থেকেই রক্ষা পাবে। আর রাসায়নিক কৃষিতে ধ্বংস হবে। গরিব মানুষের সব খাদ্য আবাদী ফসল থেকে আসে না, তাদের বেঁচে থাকতে হয় অনাবাদী খাদ্যের যোগানের ওপর। শাকের মতোই অনাবাদী মাছ এবং নানা ধরনের ফলমূলও রয়েছে। চৈত্রসংক্রান্তি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ ‘দারিদ্রবিমোচন’ করতে হলে গরিব মানুষদের বেঁচে থাকার পরিবেশও রক্ষা করতে হবে।

চৈত্রসংক্রান্তি গ্রামের গৃহস্থ ঘরেরও বিশেষ দিন। সামর্থ্য থাকলেও মাছ-মাংস রান্না হবে না। আবাদী ফসল ভাত, ডাল ও কিছু সবজি থাকতে পারে। আর থাকবে নানাভাবে রান্না করা চৌদ্দ রকমের শাক। তাছাড়া চৈত্রসংক্রান্তিতে সকাল থেকে ছাতু, চিড়া, দই, মুড়ি, খই, তিল ও নারিকেলের নাড়– বেশ আনন্দের সাথেই খাওয়া হয়।

স্বাস্থ্য সচেতন মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষ আজকাল আমিষ কম খাচ্ছেন, তারা নিজেদের ভেজেটারিয়ান বা নিরামিষাশি বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু কেবল আবাদী সবজি খেলে শরীর রক্ষা হবে না। খেতে হবে বৈচিত্র্যপূর্ণ নানান রকম শাক, সবজি, ফল, মূল, ইত্যাদি। চৈত্রসংক্রান্তির চৌদ্দ রকমের শাক খাওয়া মানে এই নয় যে বছরে একটি দিনেই খেতে হবে। বরং এই বৈচিত্র্যপূর্ণ শাকের ধারণাই অনাবাদী প্রকৃতির গুরুত্ব আমাদের উপলব্ধি করাতে পারে। বোঝাতে পারে। সারা বছরেই বিভিন্ন ধরনের অনাবাদী শাক শরীরের প্রয়োজন মেটাতে পারে।

কারণ গাছই প্রকৃতির একমাত্র ‘উৎপাদক’ – সূর্যের আলো দিয়ে সবুজ গাছপালাই রান্না করতে জানে। মানুষসহ সকল জীব ও প্রাণী সেই সবুজ পাতাখেয়ে কিম্বা যেসব প্রাণী সবুজ খেয়ে বেঁচে থাকে, তাদের আহার করে খেয়ে জীবনধারণ করে। ধন্য সবুজ। প্রকৃতি সবুজ এবং চক্রের অধীন, সরল রেখার না। চৈত্রসংক্রান্তি সেটা শিক্ষা দেয়।

আজকের পত্রিকা/আ.স্ব/