এক বিঘা জমি
বছরে ধান চল্লিশ-পঞ্চাশ মণ!
আর দুই আবাদের ধানের ফাঁকে
খেটে একটু গায়ে গতরে
আরও পাই সরিষা বটে
সেতো হবেই চার-পাঁচ মণ।
তা ঘরে তুলতে আবার কত বাহানা
জমির জাত গুন ঠিক থাকেনা।
রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে পুড়ে
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে
হেতা বেচে, খ্যাতা বেচে
আবার সার ঐষুধ দেই ইচ্ছে মতন।
বেচা-কেনা করে যা পায়
তা হিসেব করে দেখি
লাভের পাল্লা একেবারেই শূন্য।
লাভ যা হয় সেটা আমার মজুরির দাম
আর আমার রোদ, বৃষ্টিতে ভেজার কথা?
সেটা কি আর দামে মেটে!
চাষের টাকায় চাষই হয়
হয় কি রে বেঁচে থাকা!
বউ ছেলে মেয়ের কাপড় লাগে
আরও থাকে আত্মীয় স্বজনের সমাগম।
বারো মাসের, বারো পালায়
জামাই আর নাতি আসে হরদম।

আর আমার কাপড়ের কথা না হয় বাদই দিলাম।
একটা ছেঁড়া গেঞ্জি আর সাথে লুঙ্গিটাও ছেঁড়া।
একবার এপাড় ফাঁসে তো পরের বার ওপাড়।
আর মাঝখানে কত যে ফুটা!
সেই কথা না হয় নাই-ই বললাম।
আর আমার ভালো কাপড় কখনোই বা লাগে?
সারাদিন মাঠে খেটে, কখনও উদম গায়ে
আবার কখনও ছেঁড়া জামা আর গেঞ্জিতে
আর সারারাত চৌকিতে এপাশ-ওপাশ করে
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বেশ দিব্যি কাটে।
কাছের হাটে চলা
সেতা ছেঁড়া জামাটাতেই চলে।

আর শহরে?
সে তো বছরে একবার দুইবার যায়।
এই যে! গতমাসে গিয়েছিলাম।
একবার বেশ ভালো ধান হয়েছিলো
পরিবারের চাহিদা থেকে শ’দুই টাকা উপরি ছিলো।
কিনেছিলাম জামা একটা আর সাথে একটা লুঙ্গিও
এই সেটা দিয়েই চলছে।
জামাটাতে অবশ্য একটু দাগ লেগেছে
ঐটা! কি আর এমন ব্যাপার!
আমি তো চাষা
তেল চিটচিটে চুল আর আশা-নিরাশার
মুখের চোপা দেখে
ও মানুষে এমনিতেই চিনে ফেলে।
পোশাকে চেনে, কথাতে চেনে
আরও কত কিছুতে চেনে!

এইবার আসি আমার সব্জি চাষের কথায়।
উচু জমি আছে এক খন্ড বটে
বাপের নামে ছিলো।
বাপ মরার পরে আমিই পায়
ষোলয়ানার মধ্যে বারোয়ানায়
এখন যে আমার মালিকানায়।
এইতো বছর দু’য়েক আগে
আমার বোনদের থেকে বাকী চার আনা নিয়েছি কিনে
এখন ষোলো আনায় আমার,
আর কোনো দাবিদার নাই।

পরিমাণে আর কতই বা হবে!
এই শতক বিশেক।
রাত দিনের অনেক সময়
পার হয়ে যায় এখানে খেটে।
লাভ-ক্ষতির হিসেব মিলিয়ে টাকা নেই
গতরে খেটে ভালো থাকি এটাই তো বেশ!

এখন না হয় চাষ করে লাভ নাই
আগেও কি ছিলাম ভালো?
চাষের টাকায় চাষ সামলিয়ে
সংসার চলে মিটমিটিয়ে।

শুনেছি দেশে নাকি একটা মন্ত্রণালয় আছে
কৃষি মন্ত্রণালয় নাকি নাম তার।
এই বছরে দেখি কয়েকবার
কিছু অফিসার আসা-যাওয়া করে।
চাষের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতিও আনে
আবার সেগুলো আমাদের উপর চেপে আসে
কখনো ভাদ্দর আবার কখনো আশ্বিনে
এইভাবে প্রায়ই বারো মাসে।

সেকালের আর একালের চাষের
মেলায় হিসেব কত!
চাষের ফসল ঘরে তুলে
লাভ যে মেলেনা তো।
আগে ছিলো ফসল কম
খরচও ছিল কম।
এখন যে ভাই ফসল বেশি
খরচও বেশ রাশি রাশি।

বাপ দাদায় শিখিয়েছে চাষ
আমিও করি তাই।
আমার ছেলে কপালে যেন
চাষের হাল আর না বয়।
চাষের টাকায় চাষই হয়
সংসার কি আর চলে!
চাষ করে ভাই দিন কাটে আজ
বড় অভাব আর অনাদরে।

আসিফ ইকবাল আরিফ
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

  • 45
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    45
    Shares