মাহমুদ উল্লাহ্‌
বিজনেস করেসপন্ডেন্ট

সংবাদ সম্মেলনে তিন প্রতিষ্ঠানের প্রধান। ছবি: বিজিএমইএ

২০ মার্চ বুধবার অ্যাপারেল ক্লাব, বিজিএমইএ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ। সম্মেলনে দেশের গার্মেন্ট শিল্পের শক্তিশালী এই তিন প্রতিষ্ঠান আগামী বাজেটে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। নিচে বিজিএমইএ এর সভাপতির বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

এলএনজি আমদানিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে বিতরন কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়ায় সম্প্রতি বিইআরসি এর উদ্যোগে গনশুনানী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গনশুনানীতে শিল্পে গ্যাসের মূল্য বর্তমানে প্রতি ঘনফুট ৭.৭৬ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১৮.০৪ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তাবনা অনুযায়ী শিল্পখাতে গ্যাসের মূল্য ১৩২% বৃদ্ধি পাবে। এতে করে পোশাক শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে প্রায় ৫%। কারন, প্রতিটি পোশাক কারখানা ওয়াশিং ও ফিনিশিং এর সাথে সম্পৃক্ত। আর ওয়াশিং কারখানাগুলোতে বয়লারের ব্যবহার হয়। আমরা মনে করি, এই প্রস্তাবনা শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও বিকাশের সাথে সম্পূর্নরূপে সাংঘর্ষিক। এই মূল্যবৃদ্ধি বস্ত্র ও পোশাকখাতের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কেননা, বস্ত্র ও তৈরি পোশাকখাতের সমান্তরাল প্রবৃদ্ধির সাথে এ দু’টি খাতেরই সমৃদ্ধি ও বিকাশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আমরা বস্ত্র ও পোশাকখাতের শীর্ষ ৩ সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ একই পরিবারের সদস্য হিসেবে উপলব্ধি করেছি শিল্পে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির এই নেতিবাচক প্রভাব বিষয়ে আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে অবহিত করা প্রয়োজন। আর এ লক্ষ্যেই আজকে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছি।

গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যূতের দাম বাড়বে, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক সকলখাতে ব্যয় বাড়বে সকল শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৈরি পোশাক শিল্প ও বস্ত্রখাত। আপনারা সকলেই জানেন, তৈরি পোশাক শিল্প স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারনে বর্তমানে কঠিন চাপের মধ্যে রয়েছে।

# বিশ্ব বাজারে পোশাকের দাম না বাড়লেও প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮% হারে শিল্পের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সময়ে মোট উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০%।

# প্রতি বছর ৫% শতাংশ হারে এখাতে মজুরি বাড়ছে। ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে নূন্যতম মজুরী ৫১% বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে আমাদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫% – ৩০%।

# ২০১৪-২০১৮ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পোশাকের দরপতন হয়েছে -৭.০৪% এবং ইউরোপে দরপতন হয়েছে -৩.৬৪%।

# ২০১২-২০১৮ ডলারের বিপরীতে প্রতিযোগী দেশগুলোর মুদ্রা অবমূল্যায়ন হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশী টাকা স্থিতিশীল রয়েছেঃ-
২০১২ ২০১৮ মুদ্রাস্ফীতি

বাংলাদেশী টাকা ৮৩.০৪ ৮৩.০১ -০.০৪%
পাকিস্তানী রূপী ৯০.০২ ১২৩.৩০ ৩৬.৯৭%
ভারতীয় রূপী ৪৮.৪৫ ৭১.২৯ ৪৭.১৬%
তুরষ্ক লিরা ১.৭৫ ৬.৫৫ ২৭৪.০২%
ভিয়েতনামিজ ডং ২০,৮৯০.৯০ ২৩২৪০.৩০ ১১.২৫%
চাইনিজ ইয়ান ৬.২৭ ৬.৮৩ ৯.০১%
শ্রীলঙ্কান রুপি ১১৩.৮২ ১৬১.৩৭ ৪১.৭৮%

# ঋণের সুদের হার ঃ ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে আমানতের সর্বোচ্চ সুদের হার ৬% আর ঋণের সুদের হার ৯% হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত উদ্যোক্তারা বাস্তবে তার সুফল পাচ্ছেন না।
#স আগে অফসোর লোন নেয়া যেতো। এখন সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
# বিগত ৫ বছরে প্রায় ১২০০ ছোট-মাঝারী কারখানা বন্ধ হয়েছে।
# ইতিমধ্যে সরকার শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন। অনেক কারখানা ইতিমধ্যে নতুন গ্যাস লাইনের অনুমোদন পেলেও এখনও গ্যাস পেতে শুরু করেন নি।২০১৮ সালে যখন পোশাকখাতে নূন্যতম মজুরি বাড়ানো হয়, তখন আমাদের একান্ত অনুরোধ ছিলো, ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনয়ন। সরকারের পক্ষ থেকে তখন এ ব্যাপারে আমাদেরকে সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাসও দেয়া হয়েছিলো।

এমতাবস্থায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মোটেও কাঙ্খিত নয়। এতে করে পোশাক শিল্পের সার্বিক ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে যা এ খাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষে মোকাবেলা করা কোনমতেই সম্ভবপর নয়। একইভাবে বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তারাও গভীর সংকটে পতিত হবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বস্ত্রখাতে কাঁচামালের পরই গ্যাস গুরুত্বপূর্ন উপাদান। বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তাগন এক সময় সরকারের পরামর্শেই বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলায় ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনে গিয়েছেন। সেসময় কিন্তু তারা উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে জেনারেটর আমদানিসহ বিপূল বিনিয়োগ করেছেন। এখন নতুন করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলে দেশের বস্ত্র মিলগুলোর পক্ষেও টিকে থাকা কঠিন হবে।

এটি স্বীকৃত যে, বর্তমান সরকার গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। বিগত ১০ বছরে আমাদের গ্যাস সরবরাহের পরিমান প্রায় ৬৫৪ বিলিয়ন ঘনফুট থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৭৫ বিলিয়ন ঘনফুট এ পৌঁছুছে। ২০১৮ সালের আগষ্ট মাস থেকে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড এ আমদানীকৃত এলএনজি গ্যাস যুক্ত হয়েছে। মহেশখালি টার্মিনালের মাধ্যমে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

তারপরও বাস্তবতা হলো, আমরা শিল্পে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের চাপ পাচ্ছি না। গ্যাস পেলেও আবার অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত সরবরাহ পাচ্ছি। আবার যতটুকু গ্যাস ব্যবহার করছি, তার চেয়েও বেশি বিল পরিশোধ করছি। অর্থাৎ গ্যাস ব্যবহার না করেও তিতাস গ্যাস কোম্পানি’কে বাতাসের মূল্য দিচ্ছি। আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ ইভিসি মিটার চেয়ে আসছি, যাতে করে প্রেসার অনুযায়ী গ্যাসের দাম দিতে পারি। গত ২/৩ বছরেও গ্যাস বিতরন কোম্পানি আমাদেরকে ইভিসি মিটার দিতে পারেনি। উপরন্তু, গ্যাস বিলের উপর আমাদেরকে ভ্যাট দিতে হচ্ছে, যেখান থেকে আমরা শতভাগ অব্যাহতি চেয়ে আসছি। ২০১২ সালে আমরা যে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছিলাম, তার সংযোগ কেবল পেতে শুরু করেছি। এমতাবস্থায় বিতরন কোম্পানিগুলো কর্তৃক দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়নো কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা আপনারাই বলুন, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ক্রমেই কমছে। সারা বিশ্বে কোথাও এভাবে জ্বালানির দাম বাড়ানোর নজির নেই।

আমাদের জানামতে, তিতাস গ্যাস কোম্পানি তার শেয়ারহোল্ডারদেরকে ৩৫ শতাংশ মুনাফা দিচ্ছে, অথচ আমরাতো ২ শতাংশও ব্যবসা করতে পারছি না। তিতাসের কাছে আমার প্রশ্ন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও তারা কিভাবে এতো মুনাফা দিতে পারে, যেখানে বলা হয় যে, ভর্তূকি নিয়ে তিতাস চলছে। আমরা মনে করি, বিইআরসি নির্ধারিত ভর্তূকি সরকার না দিলে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে অলস পড়ে থাকা অর্থ থেকে ঋণ নিয়ে বিতরন কোম্পানি’কে চালানো যেতে পারে। কিন্তু শিল্পকে ধ্বংস করে নয়। শিল্প থাকলে কর্মসংস্থান হবে, দেশের অর্থনীতি বেগবান হবে।

শিল্প প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য গ্যাসের কোন বিকল্প নেই। কিছুদিন পর পর গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে। সরকারের কাছে আমাদের একান্ত অনুরোধ, শিল্পকে সহায়তা করার জন্য অনতিবিলম্বে একটি জ্বালানি নীতি প্রনয়ন করুন এবং এই নীতির মাধ্যমে রপ্তানিমূখী শিল্পকে অগ্রাধিকার দিন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মোট উৎপাদিত গ্যাসের মাত্র ১৬.৬৯% সরবরাহ হয় শিল্পখাতে। বাংলাদেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৭%-৮% (আনুমানিক) সরবরাহ হয় পোশাকখাতে, অর্থনৈতিক অবদানের বিচারে যা অত্যন্ত নগন্য।

এ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে আমাদের ৩ সংগঠনের একান্ত অনুরোধ, এমন কোন পদক্ষেপ নিবেন না, যাতে করে শিল্পের বিকাশ রূদ্ধ হয়, শ্রমিক কর্মসংস্থান হারায়, সর্বোপরি অর্থনীতি গতিহীন হয়ে পড়ে।

গত অর্থবছরে ৭.৮৬% প্রবৃদ্ধির মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি ছিলো ১৩.৪০%। অর্থাৎ আগামী দিনগুলোতে ম্যানুফ্যাকচারিং তথা শিল্প নির্ভর অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের উপর। ২০২৩ সালের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া রূপকল্প অনযায়ী ১০% প্রবৃদ্ধি অর্জন মোটেও দুঃসাধ্য বিষয় নয়। তবে এই মুহুর্তে দেশে শিল্পায়নের যে গতি সঞ্চার হয়েছে তা বাধাগ্রস্ত হলে আমাদের এই অগ্রযাত্রা হুমকির মধ্যে পড়বে। তাই, সরকারের কাছে আমাদের সনির্বদ্ধ অনুরোধ, শুধুমাত্র একটি সেক্টরের অধিক মুনাফার কথা বিবেচনা না করে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীল খাতগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় নিন। পোশাক ও বস্ত্রখাত’কে টিকিয়ে রাখার জন্য এ খাত’কে গ্যাসের বর্ধিত মূল্য থেকে অব্যাহতি দিন।

আজকের পত্রিকা/এমইউ/এমএইচএস