এভাবেই পাচার হয় গরু।

সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলা দিয়ে অবাদে নামছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ভারতীয় গরু। আর নিরাপদ রোড হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মেঠোপথ।

উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সারী নদীর ওপার পার্শ্ববর্তী উপজেলা জৈন্তাপুরের বিড়াখাই গ্রাম দিয়ে সারী নদী পার হয়ে গোয়াইনঘাটের মনঞ্জিলতলা, কাকুনাখাই, বারহাল খাসঁমৌজা, হাজরাই, ফুলের গ্রাম এবং লাফনাউট গ্রামের আংশিক অংশ দিয়ে প্রতিনিয়ত রাতের আঁধারে কিংবা ভোর সকালে এসব গরু আনা হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। এরপর চোরাকারবারীরা ঐসব গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে নিতে নিরাপদ রোড হিসেবে বেছে নিয়েছে এসব গ্রামগুলিকে ।

অপর দিকে রাতের আঁধার ঘনিয়ে এলে ঐ সকল গরুগুলিকে জড়ো করে রাখে বিভিন্ন হাওরে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর সময়ক্ষণ বুঝে দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে সরবরাহ করে স্থানীয় চোরাকারবারীরা। প্রতিনিয়ত সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে ভারতীয় গরু পাচারে সহজ হওয়ায় দিনে দিনে বিষয়টি ওপেন সেক্রেট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে ঐ এলাকাগুলি।

বাংলা নববর্ষের সূচনালগ্নে সারী-গোয়াইনঘাট সড়ক দিয়ে উপজেলা সদরে আসার পথে আলীরগাঁও ইউনিয়নের আটলিহাই গ্রামে পৌঁছালে এমন চিত্র দেখা যায়। উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার মোস্তফা মিয়ার বাড়ির পাশে প্রায় আড়াই শতাধিক ভারতীয় গরু খণ্ড খণ্ডভাবে রাস্তা পার করছেন স্থানীয় চোরাকারবারীরা। চোখের সামনে এতসব গরুর বহর দেখে তড়িগড়ি করে ছবি তুলতে গেলে ধমক দিয়ে গরুর রাখাল বলেন, ছবি তুলে কোনো লাভ নেই ভাই।

গরুগুলির করিডোর করিয়েছেন কিনা জবাবে গরুর রাখাল জানান, ভারতীয় গরু আমদানি করতে বাংলাদেশ সরকারের বাধা নিষেধ রয়েছে। তাই ঐভাবে নিয়ে আসি।

এর পর নামপ্রকাশে অনিচ্চুক একজন জানান, আলীরগাঁও ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড সদস্য জালাল উদ্দিন, জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর গ্রামের লোদাই হাজ্বী, বিলাল উদ্দিন এবং জৈন্তাপুর উপজেলার ৫নং ফতেহপুর ইউনিয়নের সদ্য বহিষ্কৃত চেয়রম্যান (চোরা কারবারের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আদালত ৬মাসের কারাদণ্ড প্রদানের কারণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ইউনিয়ন পরিষদ বিভাগ কর্তৃক স্থায়ীভাবে বহিষ্কৃত) আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এসব গরু প্রতিনিয়ত ভারত থেকে এনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে থাকেন।

এ ব্যপারে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে ওয়ার্ড সদস্য জালাল উদ্দিন প্রতিবেদককে জানান, আড়াই শতাধিক গরুর মধ্যে তার নিজ মালিকানাধীন ১২টি গরু রয়েছে। অপর গরুগুলির মালিক জৈন্তাপুর উপজেলার মোশাহীদ চেয়ারম্যান ও অন্যান্যে মালিকদের রয়েছে।

এ দিকে বৈধভাবে এসব গরু বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত থেকে আমদানি করলে গরু প্রতি ৭০০/৮০০টাকা বাংলাদেশ সরকার রাজস্ব পেত। কিন্ত চোরাকারবারীদের কারণে সরকার প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হরালেও এ বিষয়টি নিয়ে কখনও মাথা ঘামায়নি স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা চোরাচালান প্রতিরোধ কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার গোয়াইনঘাট প্রেস ক্লাব সভাপতি এম.এ মতিন আলোচনা করা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন করেই যাচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক বিশ্বস্থ সূত্রমতে বিজিবি ও পুলিশ বিভাগকে যে কোনোভাবে নিজেদের অনুকূলে চোরাকারবারীরা নিয়ে যাওয়ার কারণেই একাধিক ভারতীয় গরুর বহর দেশে প্রতিনিয়ত প্রবেশ করে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা গুলির হাটবাজারে সরবরাহ করা হয়। যার কারণে চোরাকারবারীদের এখনও পর্যন্ত আইনের আওতাধীন আনতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মানুষের মাঝে দীর্ঘ দিন থেকে গুঞ্জন চলছে।

স্থানীয়রা মনে করেন জরুরি ভিত্তিতে চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। এছাড়াও ভারতীয় গরুর চালানের সাথে আসছে মাদক কিংবা দেশ ধ্বংস করার কোনো অস্ত্র।

এ ব্যাপারে বিজিবি সংগ্রাম ক্যাম্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন, নববর্ষের দিন ভোরে ভারতীয় ৪টি গরু আটক করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু আলীরগাঁও ইউনিয়নের হাজরাই হাওরে দুই-আড়াই শতাধিক ভারতীয় গরুর বহর কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

আলী হোসেন, গোয়াইনঘাট/জেবি