সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সিনিয়র সাব-এডিটর

ছবি: আজকের পত্রিকা

প্রচণ্ড এক বাজে সময় পার করছে পুরো দেশ। চারপাশে বিরাজ করছে অদ্ভুত এক অস্থিরতা। কোনো মানুষই বিশ্বাস করতে পারছে না তার পাশের মানুষকে। স্বার্থে টান পড়লেই বন্ধু খুন করছে বন্ধুকে; ভাই-ভাইকে, এমনকি স্ত্রী তার স্বামীকে বা স্বামী তার স্ত্রীকে। এরচেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেছে গণমানুষের বিবেক বিবর্জিত ক্ষোভ। অজ্ঞতা আর অতি উৎসাহী এইসব মানুষের ক্রোধে প্রাণ যাচ্ছে কত নিরীহর।

গতকাল থেকে একটি ঘটনা আমাকে অস্থির করে তুলছে ভীষণভাবে। আমার সমস্ত অস্তিত্বকে ক্রমাগত বিচলিত করছে এর ভয়াবহতা। আজকে সারাটা দিন প্রচণ্ড নার্ভাস ব্রেক ডাউন হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘তুবা’ নামের ছোট্ট এক শিশুর ছবিতে চোখ স্থির রাখতে পারছি না কোনোভাবেই। তবুও দেখতে হচ্ছে, সহ্য করতে হচ্ছে, দু’ কলম সেটা নিয়ে লিখতেও হচ্ছে। এটাকে কি নিজের দুর্ভাগ্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারবো? হয়তো, না। পেশাটাই এমন। এখানে প্রিয়জনের মৃত্যুর সংবাদও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে লিখে প্রকাশ করতে হয়। এই রকম ঘটনা প্রতিটি সংবাদকর্মীর সঙ্গেই কখনো না কখনো ঘটেছে নিশ্চিত।

সংবাদকর্মীদের ইদানীং অনেকেই গালিগালাজ করেন, এটা করার পেছনে তাদের যুক্তিযুক্ত কারণ থাকবে হয়তো। কিন্তু সংবাদকর্মীরাও মানুষ, তাদেরও আবেগ-অনুভূতি-ভীতি-ভালোবাসা কাজ করে। কারো মৃত্যুর সংবাদ শুনলে তাদের চোখেও ভেসে আসে প্রিয়জনের মুখ। সেইসব অন্য কোনো এক লেখায় কখনো লিখবো হয়তো। আজ আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না যেই শিশুটির কারণে, তার কথাই বরং লিখি। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের! এরমধ্যে রেণু নামের একজন মা আছেন, যিনি তাঁর ছয় বছরের ছোট্ট শিশু তুবাকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য উত্তর বাড্ডার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন। অথচ এই ডিজিটালাইজড দেশের ইউটিউব প্রেমী মানুষ তাকে ভেবে বসলো ছেলেধরা! নিজের পরিচয়টুকু দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, রেণুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এক ঝাঁক গুজব বিশ্বাসী হতাশাগ্রস্ত মানুষ।

এত ক্রোধ মানুষের মগজে বাসা বেঁধে আছে যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে সবাই। যাপনের নানা ধরনের ক্রাইসিসে মানুষ বোধহয় এখন স্বাভাবিকভাবে কোনোকিছু ভাবার মতো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কেন প্রাণ দিতে হলো একজন নিরীহ মায়ের? এই উত্তর কি তুবাকে দেওয়ার মতো সামর্থ্য আছে কারোর? যারা রেণুকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে চড়-কিল-লাথিতে মাটির সাথে পিষে ফেলছিলেন, তাদের ঘরেও তো সন্তান রয়েছে নিশ্চয়? নিজেদের সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার ভাবনায় যুক্তিহীনভাবে আরেকজন সন্তানকে মা হারা করার সময় তাদের কারোর বুকই একবারের জন্য কেঁপে ওঠেনি! না, কাঁপেনি! কারণ ক্রমাগত কিল-ঘুষিতে মৃতপ্রায় রেণুর মৃত্যু নিশ্চিত করতে উৎসাহী কেউ কেউ নাকি বলে উঠছিলেন, ‘ভালো করে মরে নাই’! ভাবতে পারেন এই নৃশংসতা!

সদ্য মা হারানো ছোট্ট তুবা। ছবি: সংগৃহীত

কী বিচিত্র সমাজে বাস করছি আমরা! প্রত্যেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। নিজেদের অজান্তেই ভয়ঙ্কর রকম ক্ষোভ-ক্রোধ ভেতরে ভেতরে বাড়িয়ে একেকজন হয়ে ওঠছি মানসিক রোগী। এই মানসিক বিকারগ্রস্ততার শুশ্রুষা কে করবে? রাষ্ট্র? সমাজ? না পরিবার? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণেই যে, মানুষ কেন আসলে নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে, এটা কি আমরা ভেবে দেখছি? যে কোনো ঘটনা এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়াতে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি যেন আড়াল হয়ে না যায়।

একবার ভেবে দেখুন তো, গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারী মানুষগুলো আসলে কীসের ক্ষোভ মেটাচ্ছেন? এটা কি তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন নয়? এটা কি দেশের শাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার নিদর্শন নয়? দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি যখন মানুষের আস্থা উঠে যায়, একমাত্র তখনই এ ধরনের ঘটনা সমাজে প্রকট আকার ধারণ করে। এতে দুটি বিষয় তো পরিষ্কার; প্রথমত দেশের শাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নেই বলেই রেণু কিংবা এই রকম আরও ৪ জন গত ২৪ ঘণ্টায় নিজেদের প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ২৭ জন। দ্বিতীয়ত, গণপিটুনিতে যারা অংশ নিয়েছেন; তারা হয়তো ভেবেছেন, তাদের এই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডটিও রাষ্ট্রযন্ত্র আমলে নেবে না, অন্যান্য আর ৫-১০টি হত্যাকাণ্ডের মতোই। দুটো ভাবনাতেই কিন্তু বিচার ব্যবস্থার প্রতি চরম আস্থাহীনতাই প্রকাশ পেয়েছে।

আমার নিজের তুবার বয়সী একটি ছেলে সন্তান আছে। তাকে সকালে স্কুলে দিয়ে আসা এবং নিয়ে আসার কাজটি আমিই করে থাকি। আমার অবর্তমানে কখনো আমার বাবা অথবা মা স্কুলে যান। পেশাগত ব্যস্ততা বা নানা কারণেই ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসার পর অথবা আনতে যাওয়ার সময় অন্যান্য অভিভাবকদের মতো স্কুলের ভেতর অথবা বাইরে বসে আমি কখনোই কোনো অভিভাবকের সঙ্গে গল্প-গুজব করে সময় কাটাই না। আমি নিশ্চিত, আমার ছেলের ক্লাসের অধিকাংশ অভিভাবকই হয়তো আমাকে চেনেন না। এখন হতে পারে, আমি হয়তো কোনোদিন ক্লাস শুরুর বা শেষের একটু বেশি আগেই স্কুলে পৌঁছে গিয়ে ভেতরে না ঢুকে, বাইরে হাঁটাহাঁটি করলাম। সময় এখন যা যাচ্ছে, তাতে অন্যান্য অভিভাবকদের মনে আমাকে নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হতেই পারে। এখন বলা নেই, কওয়া নেই, তারা যদি আমার উপর হামলে পড়তে যান, সে দায় আমার সন্তান কাকে দেবে? তুবাই বা কাকে দিতে পারছে?

তুবা একদিন বড় হবে; জানতে পারবে এবং বুঝতে শিখবে যে এই রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতা এবং ভঙ্গুর বিচার ব্যবস্থার কারণে প্রাণ দিতে হয়েছিল তার নিরীহ মা’কে। যে বয়সে মায়ের আঙুল ধরে স্কুলে যাবার কথা ছিল তার, সে বয়সে স্কুলের খোঁজ নিতে গিয়েই চিরদিনের জন্য তার মা’কে চলে যেতে হয়েছিল তাকে ছেড়ে। এত নির্মম আর অসহনীয় সত্যের ভার কি সে বহন করতে পারবে?

তুবার জীবনের এই অনিশ্চিয়তার দায় রাষ্ট্র যেমন এড়াতে পারে না, রাষ্ট্রের একজন অযোগ্য নাগরিক হিসেবে আমিও পারি না। কোন শব্দে তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে যাবো? নিজের অক্ষমতা ঢাকতে আমার আজ শুধু কবীর সুমনের ‘দু চোখ বুজে যাও কিছু চেয়ে দেখো না’ গানটার কয়েকটা লাইন থেকে থেকে মনে পড়ছে-

‘দু চোখ বুজে যাও কিছু চেয়ে দেখো না
দু কান বুজে যাও কিছু শুনে দেখো না
কত কী করছে লোকে, কত কী বলছে লোকে-
যাও ভুলে যাও কিছু মনে রেখো না…’