প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৭৯৭ মাইল পাড়ি দিয়ে গিনেস বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছে ডিউক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের তৈরি করা একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি। ছবি:সংগৃহীত

প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৭৯৭ মাইল পাড়ি দিয়ে গিনেস বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছে ডিউক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের তৈরি করা একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি। গেল জুলাইয়ের ৯ তারিখে গিনেস নতুন রেকর্ডটি নিশ্চিত করে।

গাড়ির এই সফল রান সম্পন্ন হয় বেনসন, এনসি’র গ্যালট মোটরস্পোর্টস-এ। টীম মিউনিখের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির টিইউ-ফাস্টকে পরাজিত করে জয়ী হয় ডিউকের টিম। এই টিমের সদস্য সংখ্যা মোট সতের জন। এর মধ্যে আছেন বাংলাদেশের ছেলে ও ডিউক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মোহাইমেনুল ইসলাম।

ডিউকের এই টিমে ছিলেন ইলেকট্রিক ভেহিকেলস প্রেসিডেন্ট গ্যারী চ্যান ও শমিক ভার্মা, পাশাপাশি সদ্য গ্রাজুয়েট প্যাট্রিক গ্রাডি ও অনিরুদ্ধ মারেল্লাপুডি এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র ইয়ুকাই কিয়ান ও ওলগা সুচানকোভার।

গাড়ি নৈপুণ্যের (ভেহিকেল ইফিশিয়েন্সি) জন্য এটা হচ্ছে দ্বিতীয় গিনেস বিশ্ব রেকর্ড। এই টিমটি এর আগেও একটি রেকর্ড ভেঙেছিল। গত জুলাইয়ে ম্যাক্সওয়েল নামে একটি হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল গাড়ি তৈরির মাধ্যমে ছাত্রদের পরিচালিত দল ‘ডিউক ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল ক্লাব’-ডিইভি ফুয়েল এফিসিয়েন্সির জন্য নতুন রেকর্ড অর্জন করে।
ওই বছর গাড়িটি সোনোমায় শেল ইকো-ম্যারাথন আমেরিকাস কমপিটিশন জিতে নেয় এবং পাশাপাশি এর অনন্য ফুয়েল সেল ডিজাইনের জন্য অর্জন করে টেকনিক্যাল ইন্নোভেশন পুরষ্কার।
ইলেকট্রিক্যাল এন্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র চেন উল্লেখ করেন, যখন হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল সিস্টেমগুলো খুঁতখুঁতে ভাব তৈরি করে তখন ইলেকট্রিক ব্যাটারি টেকনোলজি পরীক্ষিত, বিশ্বস্ত ও প্রত্যাশিত হয়। এ কারণেই দলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাড়িটির এরোডাইনামিক্স সমৃদ্ধ করার কাজে মনোযোগ দিতে বিশেষভাবে সক্ষম হয়েছিল। এরাডাইনামিক্স পারফরম্যান্সের ৩৯ শতাংশ উন্নতি সাধন করে দলটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়।
নতুন গাড়িটির ডিজাইন করতে আলটেয়ার নামে একটি গ্লোবাল আইটি ভিত্তিক কোম্পানির কম্পুটেশনাল ফ্লুইড ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কিয়ানের সাপ্তাহিক আলোচনাগুলো বেশ কাজে দিয়েছে।

এ বিষয়ে গ্রাডি বলেন, ইয়ুকাইয়ের এরোডাইনামিক্স ইমপ্রুভমেন্টগুলো ছাড়া এই রেকর্ড কোনভাবেই ভাঙা সম্ভব হতো না।
কিয়ান আরও বলেন, আমাদের ২০১৮ সালের রেকর্ড কার ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় নতুন কারটিতে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ফ্রন্ট হুইল ফেয়ারিংস ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে। ম্যাক্সওয়েলে হুইল ফেয়ারিংস খাঁড়াভাবে সাজানো পাখায় কাজ করতো এবং পাখার শীর্ষে ব্যাপক ঘূর্ণি তৈরি করতো। নতুন ফেয়ারিংস খুবই কম ঘূর্ণিবাতাস উৎপন্ন করে।
ডিউক স্টুডেন্ট ক্লাবের জন্য তৈরি করা দি ফাউন্ড্রি নামক স্থানে কাজ করার সময় দলটি ট্রেইলিং এজ (লেজ এবং সামনের ফেয়ারিংস থেকে সবচেয়ে দূরের অংশ) ধারালো করেছিল, যা কার্বন ফাইবার শেল উৎপাদনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। সেসময় দলটি আবারও বাইরের বিশেষজ্ঞ- ভিএক্স এরোস্পেস-এর সঙ্গে আলোচনা করে। তারা এসময় গাড়িটির সঠিক কাঠামো এবং মসৃণ উপরিভাগের জন্য রেজিন ইনফিউশন নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহারের উপদেশ দেয়।

কিয়ান বলেন, শেষ তবে সর্বশেষ নয়, খাড়া অবস্থার পরিবর্তে গাড়ির সামনের প্রান্তকে ঢালু করে এর নিচ দিয়ে বাতাস প্রবাহ চালনা করার মাধ্যমে আমরা চাপ পরিবর্তন কমাতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং সামনের দুইটি ফেয়ারিংস এর মধ্যে জায়গা বাড়াতে পেরেছিলাম।

এক্ষেত্রে জাপানি গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মিতসুবা’র বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি মোটর ব্যবহার করে দলটি হাই-ইফিশিয়েন্সি প্রোটোটাইপ ভেহিক্যালস এর জন্য। এতে রয়েছে সরাসরি ড্রাইভিং সিস্টেম সমৃদ্ধ জেনারেটিভ ব্রেকিং, যা ২৫ শতাংশের বেশি কর্নারিং লস কমিয়ে দেয়।
গাড়িটির ডিজাইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে এর টায়ার। চেন-এর মতে ভেহিক্যাল ইফিশিয়েন্সি ধারণার এই যুগে এই বিষয়টি স্বীকৃত যে কেবলমাত্র একধরনের টায়ারই প্রয়োজনীয় পারফরম্যান্স দিতে পারে যা ম্যাচেলিনের তৈরি এবং ব্লাক ম্যাচেলিন নামে পরিচিত।

যেহেতু একের পর এক টায়ার ট্র্যাকে ফেটে যায়, তাই টিমের কাছে থাকা ব্লাক ম্যাচেলিনের মজুদ অনেকটাই কমে আসে। প্রতিযোগিতার জন্য কিছু দামি ওই টায়ার রেখে দিতে টিমটি একটি ইনফরমাল পরীক্ষা চালায় এটি দেখার জন্য যে ক্ষয় হয়ে যাওয়ার আগে ব্লাক ম্যাচেলিন কতটুকু অপব্যবহার সইতে পারে। এরপর তারা সস্তা টায়ার কিনে সেগুলো বেশি করে ফুলিয়ে দেয় এবং চাকার পরিধির সাথে জুড়ে দেয়। কাজটি করা হয় এটা বুঝে নিতে যে কেন তাদের এতো টায়ার নষ্ট হচ্ছে- তবে নতুন জুড়ে দেয়া টায়ারগুলো আর ক্ষয় হলো না।
দলটি সন্দেহ করলো পুরনো ও টায়ারের পেট্রোলিয়াম ভিত্তিক রাবারগুলো কেবলমাত্র নিঃশেষ হতে শুরু করেছে, আর চেন দ্রুতই এটা বুঝতে পারলো যে সারা বিশ্বে বিভিন্ন টিমের মজুদ করে রাখা অনেক টায়ার আর হয়তো ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠবে না।
চেন বলেন, এটাই ছিল আমাদের জানালা। যেকোনও টিমের জন্য যারা আমাদের ইফিশিয়েন্সি রেকর্ডকে পেছনে ফেলার চেষ্টা করতে চান, তাদের উচিত আরও দ্রুত কাজ করা কেননা ওই জানালাটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ডিউক ইউনিভার্সিটির মেকানিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড মেটেরিয়ালস সায়েন্স ফ্যাকাল্টি মেম্বার নিকো হল্ট্জ, যিনি একজন জ্বালানি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং ২০১৮ সাল থেকে ডিউক ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ডিইভি) প্রকল্পে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তিনি এ ব্যাপারে বলেন, রেকর্ড করার চাইতেও এ দলটির অনেক কিছু করার আছে। কিভাবে ডিউক ও প্রাট স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং সফলভাবে একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা জ্বালানি সমস্যার সমাধানে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী সমাধান দিতে পারে, সাফল্য লাভ করতে পারে ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে- তার একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে ডিইভি টিম। এই পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ডিউকের ‘এনার্জি ইনিসিয়েটিভ’- যা ছাত্র-ছাত্রী, ফ্যাকাল্টি মেম্বার, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও তহবিলের উৎসগুলোকে একে অন্যের সাথে যুক্ত হতে ও সমর্থন দিতে সাহায্য করে- যার মাধ্যমে ডিইভি’র মতো ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন টিম সফল হয় এমনকি বিশ্বরেকর্ডও করে ফেলতে পারে।

আজকের পত্রিকা/এসএমএস