প্যাকেটজাত দুধ। ছবি: সংগৃহীত

গাভির দুধে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক ও নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে বিভিন্ন অণুজীবও। একই সঙ্গে প্যাকেটজাত গাভির দুধেও অ্যান্টিবায়োটিক ও সিসা পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত। বাদ পড়েনি দইও। দুগ্ধজাত এই পণ্যেও মিলেছে সিসা।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) গবেষণায় এসব ফলাফল উঠে এসেছে। সংস্থাটি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গাভির খাবার, দুধ, দই ও প্যাকেটজাত দুধ নিয়ে এই জরিপের কাজ করেছে।

এনএফএসএল সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাভির দুধের ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। গাভির দুধ ও গোখাদ্য সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। দই ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ড দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেট দুধ। এগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে ল্যাবরেটরিতে পৌঁছানোর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, গোখাদ্যের ৩০টি নমুনা গবেষণা শেষে দেখা গেছে, এর মধ্যে কীটনাশক (২ নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (৪টি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রা পাওয়া যায়। গাভির দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়। ৯৬ শতাংশ দুধে মেলে বিভিন্ন অণুজীব। প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনায় ৩০ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে আছে টেট্রাসাইক্লিন। একটি নমুনায় সিসা মিলেছে। একই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন অণুজীব পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী লুৎফুল কবির বলেন, গরুর দুধে এবং প্যাকেটজাত দুধে সিসা ও ক্রোমিয়াম পাওয়াটা ভয়ংকর সংবাদ। এসব দ্রব্য মানবশরীরে প্রবেশের চূড়ান্ত পরিণতি ক্যানসার। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কিডনির কাজ হলো শরীরের নানা দ্রব্য ছেঁকে ফেলে দেওয়া। কিন্তু এসব দ্রব্য ছেঁকে ফেলতে পারে না। শরীরে জমা হয়। তখন মারাত্মক পরিণতি হয়।’ লুৎফুল কবির বলেন, দুধ ফুটানোর পর কিছু কিছু অণুজীবও নষ্ট হতে পারে, কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক, কীটনাশক বা সিসা নষ্ট হয় না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ওবায়দুর রব বলেছেন, ‘যেসব অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে সেগুলো গোখাদ্যের মাধ্যমেও আসতে পারে। আবার গরু মোটাতাজা করার জন্য যেসব ওষুধ দেওয়া হয় সেগুলোর মাধ্যমেও আসা সম্ভব।’

আন্তর্জাতিক সংগঠন পপুলেশন কাউন্সিলের কান্ট্রি ডিরেক্টর ওবায়দুর রব বলেন, আমাদের মাঠ পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য দেখভাল যে মোটেও ভালোভাবে হচ্ছে না, এটা তারই প্রমাণ। আগে স্যানেটারি পরিদর্শকেরা গরুর দুধে পানি মেশানো হয়েছে কি না তা দেখতেন। এখন তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে এসব ভয়াবহ উপাদান শনাক্তের কাজে।

গবেষণাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হলে খাদ্য অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। আজ সরকারি ছুটি। কাল আমি দেশের বরে যাবো। ১৭ তারিখ দেশে ফিরে গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে বসবো।’