গাফ্ফার ভাইয়ের সঙ্গে লেখক বোরহান বিশ্বাস। ছবি : সংগৃহীত

লেখক-বোরহান বিশ্বাস

সেই ছোট্ট বেলায়, যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র তখন থেকেই গাফ্ফার ভাইয়ের লেখা সঙ্গে পরিচিত। বাসায় রাখা দৈনিক পত্রিকার কলামগুলো বাবা আমাকে দিয়ে পড়াতেন, আর চোখ বন্ধ করে শুনতেন। কোথাও বুঝতে সমস্যা হলে আবার পড়তে বলতেন। মাঝে মাঝে রাগ হতো। বন্ধুরা আমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে। খেলার সময় চলে যাচ্ছে, অথচ আমি কিনা ঘরে বসে বাবাকে কলাম পড়ে শোনাচ্ছি!

কিন্তু, কি আশ্চর্যের বিষয়! ক্রমেই যেন ভালো লাগতে থাকলো সেই বড় বড় লেখাগুলো। বিশেষ করে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলামগুলো। রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ ও আন্তর্জাতিক সব বিষয় নিয়েই তার বিশ্লেষণধর্মী লেখায় বিমোহিত হতাম। যেন পাশে বসিয়ে তিনি কথাগুলো বলছেন। তার লেখার নেশায় পড়ে গিয়েছিলাম। প্রতি সপ্তাহের ওই দিনটির জন্য (যে দিন তার লেখা প্রকাশিত হতো) অপেক্ষায় থাকতাম। পরে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, বাবা কোনো কারণে সময় করতে না পারলে আমি নিজেই কলাম পড়ে শোনানোর জন্য তাকে খুঁজতাম। দিনে দিনে গাফ্ফার ভাইয়ের লেখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকলো, হৃদ্যতা গড়ে উঠলো। ছোট্ট মনে সাংবাদিক হওয়ার বাসনা পেয়ে বসলো। শুরু হলো লেখালেখি চর্চা। পেছনে থাকলো বাবার আশীর্বাদ।

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ’ পত্রিকায় গাফ্ফার ভাই নিয়মিত কলাম লিখতেন। আমি মাঝে-মধ্যে অভিমত কলামে লিখতাম। গাফ্ফার ভাইয়ের মতো সাংবাদিকতার মহীরুহের পাশে আমার লেখাও যখন প্রকাশিত হতো সেই আনন্দ মুহূর্তটুকুর কথা বলে বোঝানো যাবে না।

গাফ্ফার ভাইকে কাছ থেকে দেখার একটা আকুতি সব সময়ই কাজ করতো। বছর কয়েক আগে, একবার জানতে পারলাম তিনি ঢাকায় কিছুদিন অবস্থান করবেন। খোঁজ নিয়ে সেই ঠিকানায় হাজির হয়ে গেলাম। দুর্ভাগ্য, অল্পের জন্য সেবার তার দেখা পেলাম না। মাঝে তার আসা-যাওয়ার কথা শুনেছি, কিন্তু নানা কারণে দেখা হচ্ছিল না। অবশেষে দিন কযেক আগে দেখা হলো আমার সাংবাদিকতার আদর্শিক মানুষটির সঙ্গে। ঢাকায় তার অবস্থানের কথা জানতে পেরে সংকল্প নিলাম দেখা করবোই।

তাপপ্রবাহ মাথায় নিয়েই রওনা হলাম। সঙ্গে নিলাম সদ্য প্রকাশিত আমার একটি কবিতার বই। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। হাঁটা শুরু করলাম। শরীর থেকে লবণ-পানি বেরিয়ে যাচ্ছে, তবুও তৃষ্ণা নেই। লক্ষ্য, গন্তব্যস্থল। এক সময় সেখানে পৌঁছলাম। বাড়ির নিচে নিরাপত্তা প্রহরী, সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য। পরিচয় দিয়ে দেখা করার কথা বললাম। ইন্টারকমে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এ বেলায় যদি দেখা না পাই, কখন সময় হবে সেটা জেনে নেব। হঠাৎ ডাক আসলো, উপরে যাওয়ার লিফট দেখিয়ে দেয়া হলো। খুশির অবস্থাটা সহজেই অনুমেয়।

দু’তলার একটি ড্রইং রুমে একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। তার পরেই ডাইনিং রুম। টেবিলের ওপর রাখা বেশ কয়েকটি পত্রিকার একটি পড়ছেন গাফ্ফার ভাই। কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করলাম। আবেগের আতিশয্যে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললাম, ভাই কদিন আছেন? বললেন, শনিবার চলে যাব। অল্প বিস্তর কথার ফাঁকে আমার বইটি তার হাতে তুলে দিলাম। বই হাতে নিয়ে তিনি পাতা উল্টাতে লাগলেন। একটি জায়গায় তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি কবিতা বেশ মনোযোগ দিয়ে তিনি পড়লেন। বুঝে নিলাম, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এখনো যে কোনো লেখা তাকে আপ্লুত করে তোলে। তাকে জানালাম, আমরা যারা বঙ্গবন্ধুকে দেখিনি, তার কথা শুনে বড় হয়েছি, সেই না দেখার আকুতি থেকে কবিতাটি লেখা। গাফ্ফার ভাই আমার দিকে চেয়ে কি যেন ভাবলেন। তার লেখা ‘স্মৃতির বন্দরে ফিরে আসা’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি করা কয়েকটি লাইন তাকে শোনালামÑ ‘কত সুখ ছিল হয়ে গেছে দুখ/কত বান্ধব হয়েছে বিমুখ/ ম্লান হয়ে গেছে কত উৎসুক উন্মুখ ভালবাসা।’ বললাম, যখন মনের ক্ষোভ ও ব্যথা সইতে পারেন না, তখন রবীন্দ্রনাথকেই আপনার একমাত্র বন্ধু, একমাত্র আত্মীয় মনে হয়। তিনি স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন। আরো কিছুক্ষণ কথা হলো। বিদায় নেয়ার সময় ক্ষীণ স্বরে বললেন, দেখা হবে।

হ্যাঁ, আবারো দেখা হবে গাফ্ফার ভাইয়ের সঙ্গে। আরো অনেক অনেক কথা হবে।

বোরহান বিশ্বাস
সাংবাদিক, ঢাকা।