সতিহাট বাজারের কলা

সারি সারি কলার কাঁদি (ছড়া)। হাটজুড়ে কলা আর কলা। এ যেনো কলার রাজ্য। বিকিকিনিও চলে সমান তালে। জমজমাট এ কলার হাটের দৃশ্য নওগাঁর মান্দা উপজেলার সতিহাট বাজারের।

নওগাঁর মান্দা ও মহাদেবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রতিদিন এ হাটে কলা নিয়ে আসেন চাষিরা। প্রতিদিন পাকা কলা বিকিকিনি চললেও সাপ্তাহিক কাঁচা কলার হাট বসে মঙ্গলবার।

এ দিন প্রচুর পরিমাণে কলা ওঠে। কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে মঙ্গলবারে হাটের দিনে বাজার রোডে যানজটের কারণে আগের দিন অর্থাৎ সোমবার সকাল থেকেই কলা চাষীরা হাটে কলা নিয়ে আসেন এবং আগের দিন থেকেই বেচাকেনা হয়ে থাকে। আর বেচাকেনা অন্তে যে কলাগুলো অবশিষ্ট থাকে সেগুলো কলার পাতা দিয়ে ঢেকে রেখে যান কলা চাষীরা।

আর এর বিনিময়ে রাতে কাঁচা কলার ক্যান বা কাঁদিগুলো পাহারা দেওয়ার জন্য বাজারে নিয়োজিত নাইট গার্ডদের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হয়। পরেরদিন মঙ্গলবার সকালে বাড়ি থেকে স্থানীয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে আগত কলাচাষীরা তাদের রেখে যাওয়া কলাগুলো বিক্রয় করে থাকেন।

গনেশপুর ইউপি’র ঐতিহ্যবাহী সতিহাটে প্রতিদিন পাকা কলা কেনা-বেচা চললেও হাটের দিন মঙ্গলবার এখানে বিভিন্ন প্রকারের প্রচুর কাঁচা কলা ওঠে।

জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কলা চাষি ও ব্যবসায়ীরা এ হাটে আসেন। এখান থেকে কলা কিনে বড় ব্যবসায়ী ও পাইকারেরা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে নিয়ে যান। গত প্রায় ৫০ বছর যাবৎ সতিহাটে কলার হাট বসছে বলে জানা গেছে।

সতিহাট বাজার বণিক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা দেওয়ান ময়েন উদ্দীনসহ স্থানীয় আফাজ উদ্দীন মুন্সী, সেকেন্দার আলী জানায়, এই কলার হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে ৪০-৫০ ট্রাক কলা ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে চাষিরা প্রতিদিন ভোরে চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভ্যান, নসিমন, ভটভটিসহ বিভিন্ন বাহনে করে কলা নিয়ে বিক্রির জন্য হাটে আসে। বড় ব্যবসায়ীরা এখান থেকে কলা কিনে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যান।

প্রতিদিন কলার বাজার বসলেও মঙ্গলবার সাপ্তাহিক হাটবার উপলক্ষে আগের দিন সোমবার সকাল থেকে চাষিরা হাটে কলা নিয়ে আসেন।

সতিহাট বাজার গরুহাট মাঠের খোলা জায়গায় বসে এ হাট। মাঠে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় পাশের রাস্তার দুই পাশ ঘেঁষেও কলা কেনা-বেচা চলে।

ক্রেতা-বিক্রেতা ও কলার বাজারের খাজনা আদায়কারী লালবরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মঙ্গলবার এ হাটে সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত কলা বিক্রি হয়। এখানে চিনি চম্পা, মানিক ও আনাজি কলা বা তরকারি কলা বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। প্রতি কাঁদি চিনি চম্পা কলার দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।

মানিক প্রতি কাঁদির দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং আনাজি কলার দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। তবে এ হাটে কলার খাজনা নির্দিষ্ট পরিমানে নেওয়া হয় বলেও জানান খাজনা আদায়কারী।

তিনি আরো জানান যে, বর্তমানে সতীহাটে কলার চাহিদা একটু কম। আগে বেশ ভালোই কেনাবেচা হতো। কিন্তু ইদানিং একটু সমস্যা হচ্চে যে পাশর্^বর্তী মহাদেবপুর উপজেলার মহিষবাতান এলাকায় একটি বৃহৎ কলার হাট বসায়, এখানে ক্রেতারা একটু কম আসছে। এর কারণ হচ্ছে যে, আমাদের সতীহাটের চেয়ে হয়তবা মহিষবাতান কলাহাটের যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। আর সেকারণেই তাদের অনাগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। তার মধ্যে মহাদেবপুর উপজেলার পাঠাকাটায়ও একটি পুরাতন ঐতিহ্যবাহী হাটে ব্যাপক পরিমান কলা আমদানী- রফতানী হয়ে থাকে। আমাদের সতীহাটের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হাটের একটা নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। কেননা, এ হাট থেকে সরকার প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে।

সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় এনে প্রয়োজনীয় বাবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

ক্রেতারা জানায়, গত এক মাসে কলার দাম কম যাওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়েছে। এক মাস আগে প্রতি কাঁদি চিনি চম্পা কলা বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। অথচ এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়।

অন্যান্য জাতের কলার দামও অর্ধেক কমে গেছে। মহাদেবপুর উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের কচুকুড়ি গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম চিনি চম্পা কলার কাঁদি নিয়ে এসেছিলেন ২০ টি। গড়ে ১৩০ টাকা দরে ২০ কাঁদি তিনি বিক্রি করেন ২ হাজার ৬০০ টাকায়।

মান্দা উপজেলার মৈনম ইউপি’র মংলাপাড়ার আদর্শ কলাচাষী প্রভাষক আবুবকর সিদ্দিক বলেন, কলার যে দাম তাতে কলা বিক্রি করে উৎপাদন খরচ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে কোনো লাভই থাকছে না। সামনে শীতের মৌসুম।

শীতকালে খেতের কলা আকারে ছোট হয়। মানুষও কলা কম খায়। এখনই যে অবস্থা আগামীতে কলার দাম আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

একাধিক কলা ব্যাবসায়ী জানান, সতিহাট থেকে কলা কিনে নিয়ে নওগাঁ ও রাজশাহী শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন তারা। গাইবান্ধা ও বগুড়ার তুলনায় এ অঞ্চলের কলার চাহিদা বেশি।

ব্যবসায় লাভও হয় ভালো। এদিকে সতিহাট বাজারে জায়গা সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের। গরুর হাটের জায়গায় কলার বাজার বসলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। মঙ্গলবার দুপুর থেকে গরুর হাট বসায় সকাল থেকে শুরু হওয়া কলার বাজারের বেচা-কেনা বেলা ১১টার মধ্যেই শেষ করতে হয়।

কলা বাজারের স্থায়ী জায়গার জন্য স্থায়ী কোন জায়গা না থাকায় কলা চাষি ও ব্যবসায়ীদের হাটের দিনে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়া গরুহাটিতে রাস্তা সংলগ্ন কলার হাট বসায় যাতায়াতাকারী ও ব্যবসায়ীদেরও কষ্ট হয়।

৫নং গণেশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হানিফ উদ্দীন বলেন, সতিহাটে কলার বাজারের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণের প্রক্রিয় চলছে। খুব শীঘ্রই ক্রেতা- বিক্রেতাদের সুবিধার্থে নতুন জায়গাটি হাটের ইজারাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

-মাহবুবুজ্জামান সেতু