গদখালীতে ১৫ কোটি টাকার গোলাপ বিক্রি : রেকর্ড ভেঙেছে দাম

ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালীতে গোলাপের দাম রেকর্ড ভেঙেছে। প্রতি পিস ১৮-২০ টাকায় পাইকারি বিক্রি করেছেন চাষীরা।

যা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি দাম বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত এক সপ্তাহে গদখালীতে ১৫ কোটি টাকার উপরে গোলাপ বিক্রি হয়েছে। এ ফুল খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকার নিচে না।

গোলাপের রেকর্ড পরিমাণ দাম পেলেও খুশি নন চাষিরা। কুঁড়ি পচা রোগ ও ˆবরী আবহাওয়ায় গোলাপ উৎপাদনে ধস নেমেছে বলে দাবি গদখালী এলাকার ফুলচাষীদের। এজন্যই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।

গদখালী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বাহারী ফুলের মেলায় কৃষকের মুখে স্বপ্নের ঝিলিক। বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরাও ভিড় জমিয়েছেন।

ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের মোকলেসুর রহমান জানান, আমি দুই বিঘা জমিতে পলি হাউজে গোলাপ আবাদ করেছি। এতে ফুলের রঙ ও আবাদ ভালো হয়।

নীলকণ্ঠনগর গ্রামের চাষী কামারুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে জানান, তিনি ৫০ শতক জমিতে পলিহাউজের মাধ্যমে গোলাপের আবাদ করছেন। এতে ফুলের রঙ ও উচ্চতা সঠিক মাপে হচ্ছে।

পটুয়াপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে গোলাপের আবাদ করছেন।

হাড়িয়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ সলেমান আজকের পত্রিকাকে জানান, চার বিঘা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করেছেন তিনি।

ইতিমধ্যে ৭ হাজার পিস গোলাপ ফুল বিক্রি করেছেন তিনি। প্রতি পিস ফুলের দাম পেয়েছেন ১৫-২০ টাকা। তিনি আরও বলেন, গোলাপের কুঁড়িপচা রোগ চাষীদের শেষ করে দিয়েছে। গতবছরের তুলনায় এবার ফলন তিনভাগের দুইভাগ কমেছে।

ভালোবাসা দিবস আর বসন্তবরণ অনুষ্ঠান ঘিরে গোলাপের চাহিদা বেশি থাকে।

আর এক চাষী হোসেন আজকের পত্রিকাকে জানান, সাত বিঘা জমিতে ফুল চাষ করেছেন তিনি। এরমধ্যে গোলাপ ফুল রয়েছে ৩ বিঘা জমিতে। এবার গোলাপের উৎপাদনে ধস নেমেছে। কাঁচাপাতা ঝরা ও কুঁড়িপচা রোগে উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমেছে। এজন্য গোলাপের দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ১৮ বছর ধরে ফুলচাষ করছি, কখনো ১৮টাকা পিস গোলাপ বিক্রি করতে পারিনি।

কুলিয়া গ্রামের চাষী আনিসুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসে হলুদ ফুল ও গোলাপের চাহিদা বেশি থাকে। এজন্য দামও বেশি হয়।

ফুলচাষী ও ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, এবার আমি ১৫ বিঘা জমিতে রজনীগন্ধা, ডাবল রজনীগন্ধা (ভুট্টা) ও হাইব্রিড রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা এবং গ্লাডিওলাস চাষ করেছি। ইংরেজি নববর্ষে ব্যবসা হয়নি। কিন্তু বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস এবং মহান শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রির আশা করছি।

এদিকে সপ্তাহজুড়ে ফুলের রাজধানী গদখালীতে জমজমাট ছিল ফুল বাণিজ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা কিনেছেন নানা প্রজাতির ফুল। বাজারে সব রকমের ফুলের দাম বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ছিল গোলাপের দাম।

আড়ৎদাররা জানালেন, প্রতি পিস গোলাপ ১৫-২০টাকা, রজনীগন্ধা ২-৩ টাকা, গ্লাডিওলাস তিন থেকে আট টাকা, জারবেরা পাঁচ থেকে ১০টাকা, চন্দ্রমল্লিকা ২ থেকে ৩ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

এছাড়াও গাঁদা ফুল প্রতি হাজার একশ’ থেকে দেড়শ’ টাকা, জিপসি ও রথস্টিক ফুল ১৮ থেকে ২০টাকা আঁটি (মানভেদে) বিক্রি হয়েছে।

গদখালীর পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসে গোলাপের আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে গাঁদা ফুলের চাহিদা বেশি থাকে। চাষীদের কাছ থেকে কিনে সাতক্ষীরা ও ফরিদপুরে সরবরাহ করি।

আরেক পাইকারী ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন বলেন, এবার গোলাপ ফুল উৎপাদন কম হচ্ছে। বাজারে চাহিদা বেশি। এজন্য দামও চড়া। ফুলের ব্যবসা করছি পনের বছর। এত বেশি দামে কখনো গোলাপ কিনি নাই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি ও গদখালি ফুল চাষি কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাব, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বৃষ্টিপাতের কারণে ফুলের উৎপাদন ব্যহত হয়েছে।

এছাড়াও গোলাপ ক্ষেতে ভাইরাস লেগে উৎপাদনে ধস নেমেছে। ভাইরাসের আক্রমণে গোলাপের কুঁড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এজন্য চাহিদার তুলনায় গোলাপ মিলছে না। সরবরাহ কম থাকায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সারাদেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এই ফুলকে কন্দ্র করে। প্রায় ২০ হাজার কৃষক ফুলচাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এরমধ্যে কেবল যশোরেই প্রায় ৫-৬ হাজার ফুলচাষি রয়েছেন।

সারাবছর টুকটাক ফুল বিক্রি হলেও মূলত ফেরুয়ারি মাসের তিনটি দিবসকে সামনে রেখেই জোরেশোরে এখানকার চাষিরা ফুল চাষ করে থাকেন। এবার ফুলের দাম বাড়ার কারণে ৪০ কোটি টাকা বিক্রি ছাড়িয়ে যাবে।

ইতিমধ্যে ২৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি টাকার গোলাপ ফুল বিক্রি হয়েছে।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যশোরে ফুলের আবাদ হয়েছিল ৬৩২ হেক্টর, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৩৩ হেক্টর এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদ হয়েছিল ৬৩৬ হেক্টর জমিতে।

চলতি বছরেও প্রায় একই পরিমাণ জমিতে ফুলের আবাদ হয়েছে। ফুল উৎপাদন হয়ে থাকে প্রায় ৬০ লাখ পিস।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক এমদাদ হোসেন জানান, যশোর জেলায় ৬৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ করা হয়েছে। দেশে ফুলের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ ভাগই যশোরের গদখালী থেকে সরবরাহ করা হয়।

গদখালীর চাষিরা পলিহাউজে ফুলের আবাদ বাড়াচ্ছে। এতে সঠিক মাত্রায় গোলাপ উৎপাদন হচ্ছে।

-এইচ আর তুহিন