সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সিনিয়র সাব-এডিটর

মা হারা তুবার দায়িত্বই বা কে নেবে এখন? ছবি: সংগৃহীত

অস্থির এই সামাজিক ব্যবস্থায় সকলেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কোনো নির্দিষ্ট আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা থেকে তৈরি হওয়া মানসিক অবসাদে ভুগছেন সমাজের অধিকাংশ মানুষ। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা এই আতঙ্ককে মব সাইকোলজি বলে আখ্যায়িত করছেন। যার কারণে সারা দেশে গত কয়েকদিন যাবত দেখা দিয়েছে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনা। মব সাইকোলজির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী- যারা গণপিটুনি দেয়, তাদের উচিত অনুচিত বোঝার মতো বিবেক কাজ করে না। কেউ এর সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে না।

এরই অংশ হিসেবে গত ৪৮ ঘণ্টায় সারা দেশে গণপিটুনিতে ঝরে গেছে ৮টি তাজা প্রাণ। এরমধ্যে একজন তাসলিমা বেগম রেনু। ২০ জুলাই শনিবার রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ দিয়েছেন তিনি। নিজের চার বছর বয়সী সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর খবর জানতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান তিনি। মৃত্যুর পর রেনুর মৃতদেহ শনাক্ত করেন তাঁর ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু। এরপর একে একে জানা যায় রেনুর সংগ্রামী জীবনের গল্প।

ত্রিশোর্ধ তাসলিমা বেগম রেনু তাঁর ছোট সন্তান তুবাকে স্কুলে ভর্তি করাবেন বলে গিয়েছিলেন উত্তর বাড্ডার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুলের বাইরে তাকে ঘুরাঘুরি করতে দেখে অন্যান্য অভিভাবক এবং অতি উৎসাহী একদল জনতার রেনুকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তারা ঝাপিয়ে পড়ে রেনুর উপর। এক পর্যায়ে তাকে গণপিটুনি দেওয়া হলে প্রাণ হারান তিনি। এ ঘটনার ফলে যে মা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, সেই সন্তানের ভবিষ্যতটা আরও বেশি অন্ধকারে পতিত হলো।

তাসলিমা বেগম রেনুর পরিবার থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, মাস্টার্স পাশ করা রেনু বিয়ের আগে থেকেই বাড্ডা এলাকায় বসবাস করতেন। চাকরি করেছেন ব্র্যাকসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে, একটি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন কিছুদিন। পারিবারিক কলহে স্বামী তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে বছর দুয়েক আগে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তাঁর। কিন্তু সে ঘটনা দমাতে পারেনি তাকে। দুই সন্তান তাহসিন আল মাহির এবং তাসনিম তুবাকে নিয়ে ঠিকই বেঁচে থাকার লড়াই লড়ে যাচ্ছিলেন একাই। বছর খানিক আগে ছেলে মাহিরকে বাবা নিয়ে গেলেও মেয়ে তুবাকে কাছ ছাড়া করেননি মা। মহাখালীর ওয়্যারলেস এলাকায় ছোট্ট একটি বাসা ভাড়া করে মেয়েকে নিয়ে থাকছিলেন তিনি। উদ্বিগ্ন ছিলেন মেয়ের ভবিষ্যত নিয়েও।

ছেলে মাহির বাবার সঙ্গে বাড্ডা এলাকাতেই বসবাস করতো বলে মেয়ে তুবার জন্য একই এলাকায় একটি ভালো স্কুলের খোঁজে ছিলেন রেনু, পাশাপাশি চাইছিলেন ওই এলাকাতেই বাসা নিয়ে থাকবেন। কিন্তু কতিপয় নির্বোধের পাশবিকতায় থমকে গেল রেনুর সমস্ত স্বপ্ন। একই সঙ্গে থমকে গিয়েছে তুবার স্বাভাবিক ভবিষ্যত। শত শত লোক একটি নিরাপরাধ মানুষকে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে মেরে ফেললেন, আর কেউ একটা প্রতিবাদ করলো না, বরং ব্যস্ত হয়ে পড়লো ভিডিও ধারণে? এটা সত্যিই সমাজের একটি চরম অবক্ষয়তার পরিচয়। রেনুর এই ঘটনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী ওই স্কুল কর্তৃপক্ষকেও দায়ী মনে করেন, যেখানে সন্তানকে ভর্তি করানোর বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন রেনু।

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী এ প্রসঙ্গে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একজন মানুষকে একটা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে এভাবে টেনে-হেচড়ে বের করে মেরে ফেললো আর কেউ একটা শব্দ করলো না! স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল সেখানে, এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার দরকার। অন্য সবার কথা বাদ দিলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দেওয়া। এই দায় তারা এড়াতে পারে না।’

রেনুর এই মৃত্যুর দায় কার উপর বর্তাবে? চরম হতাশাগ্রস্ত, অবদমনে ভুগতে থাকা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত সমাজের উপর? নাকি জনগণের ভেতরে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করা রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর? এছাড়া মা হারা তুবার দায়িত্বই বা কে নেবে এখন? রেনু বেঁচে থাকতে সন্তানের দায়িত্ব যে বাবা ঠিকমতো পালন করেনি, সে? নাকি তুবার মা’কে যে সমাজের মানুষ খুন করেছে তারা? কিংবা এই ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে যে রাষ্ট্র তার জনগণকে এমন খুনে উদ্বুদ্ধ করেছে, তার নীতি নির্ধারকরা?

জানা গেছে, তুবার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। লক্ষ্মীপুরেই তুবার নিহত মা রেনুর পৈতৃক নিবাস। তবে সেটা কতদিন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, সন্দেহ থেকে যায়। আর তাছাড়া এই দায়িত্ব নেওয়াতে কি মোচন হবে একজন মা’কে হত্যা করার দায়? তুবা বড় হয়ে জানবে এমন একটি সমাজে সে বেড়ে ওঠেছে- যার বাসিন্দারা নিছকই একটি গুজবে বিশ্বাস করে ছেলে খেলার মতো মেরে ফেলেছিলো তার নিরীহ মাকে। এমন একটি রাষ্ট্রে সে জন্মেছে- যেখানে অধিকাংশ বিচার বহির্ভূত হত্যাযজ্ঞ চলে, যেখানে বিনা অপরাধে কাউকে হত্যা করলেও সহসাই বিচার মিলে না কোনো।

আজকের পত্রিকা/সিফাত