ধ্যান মগ্ন মডেল। ছবি : সংগৃহীত

মানুষ ধ্যান করে কেন জানেন? জ্ঞান, বিশ্বাস, ভক্তি ও ক্ষমতা লাভের আশায় প্রাচীন কাল থেকে মানুষ ধ্যানে বসেন। এছাড়া মানসিক চাপ, ক্ষুধামান্দ্য, বদহজম, মাদকাসক্তি, দুরারোগ্য চর্মরোগ সোরিয়াসিস, ডিপ্রেশন এবং ক্রনিক ব্যথা সারাতে মুনিঋষিরা ধ্যানে বসতেন। এমন কৌতুহল সবার মধ্যে। চলুন তাঁর ধ্যানে বসার ব্যাপারটি নিয়ে কিছুটা কৌতুহল ঘুচানো যাক…

আধুনিক যুগেও মানুষ ধ্যান করছেন; ব্যাপারটা দেখলেই নাক ছিটকাতে ইচ্ছে করে তাই না? ব্যাপারটি আসলে তা নয়। আধুনিক বিশ্বে ধ্যান করছে এমন অনেকেই রয়েছেন যাদের মধ্যে আছে সিলিকন ভ্যালির বড় বড় বিনিয়োগকারিদের থেকে শুরু করে তিব্বতীয় ধর্মগুরু দালাইলামা পর্যন্ত।

মেডিটেশন ফরমূলা থেকেই তৈরি হচ্ছে বড় বড় গেরিলা বাহিনীর বিধ্বংসী মটিভেশনাল স্পিচ, তৈরি হচ্ছে পৃথিবী বিখ্যাত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো চালানোর পেছনে উচ্চমাত্রার ম্যানটাল ট্রেন-আপ ট্রেনিং। এই ধ্যান থেকেই আবিষ্কার হয়েছে জিমনেসিয়াম পদ্ধতির মতো ধারণার উদ্ভব। এই ধ্যানের ফলেই মানুষের মধ্যে বাড়ে সহমর্মিতার অনুভূতি এবং বাড়ে পেশির কার্যকারিতা।

কয়েক দিন ধরে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে দেখা যাচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ধ্যানে বসেছেন। তাহলে কী সত্যিই ধ্যানে জ্ঞান, ক্ষমতা আর সম্পদের অধিকারী হওয়া যায়? এমন প্রশ্নে কৌতুহলি হয়ে উঠেছেন অনেকেই। চলুন তাহলে যেনে নেয়া যাক ধ্যান আসলে কোথায় থেকে এসেছে। পৃথিবীতে কারা ধ্যান শুরু করে এবং আদৌকি ধ্যানের মাধ্যমে এই বিজ্ঞানের যুগে কোনো ধরনের উপকার মানুষ পায় কিনা।

ধ্যান নিয়ে পৃথিবীতে মানুষের কৌতুহল শুরু হয়ে ৫ হাজার বছর আগে। প্রথম ধ্যানের ব্যাপারে মানুষ ধারনা পায় সনাতন ধর্মের গ্রন্থ ‘বেদ’ থেকে।  তারপর ‘ভগবদগীতা’ গ্রন্থে ‘যোগ’, ‘ধ্যান’ ও ‘আধ্যাত্মিক জীবন’ যাপনের কথা বলা হয়। তবে হিন্দুদের চেয়ে জাপানের বৌদ্ধ ধর্মের মানুষরা ধ্যান চর্চা শুরু করেন ৬৫৩ সালে এবং এই ধ্যানকে পাশ্চাত্য কালচারে রূপ দেন তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা।

১৯৭০ দশকে ধ্যান চর্চায় শুরু হয় নতুন দিগন্ত। বৈজ্ঞানিক কলা-কৌশল এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের সমন্বয়ে ধ্যানকে একটি শিল্পে পরিণত করা হয়। ধ্যানের পদ্ধতিগুলোকে দেওয়া হয় রকমারি নামে নামকরন। ‘ট্রান্সেনডেন্টাল মেডিটেশন’, ‘ন্যাচারাল স্ট্রেস রিলিফ’, ‘ফাইভ রিদম’, ‘থিটা হিলিং’, ‘সিলভা মেথড’, ‘রিলাক্সেশন রেসপন্স’ এর মতো আরো অনেক সুন্দর সুন্দর নাম। আর এর পেছনে শ্রম দেন মার্কিন চিকিৎসক ডা. হার্বার্ট বেনসন ও ডা. কাবাত জিন।

বিভিন্ন ধর্মে ধ্যানকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে পৃথিবী বদলে দিয়েছেন কিছু মুনিঋষিরা। চলুন জেনে নেওয়া যাক ধ্যান নিয়ে তাদের ইতিকথা।

ধ্যান মগ্ন মডেল। ছবি : সংগৃহীত

সনাতন ধর্মে ধ্যানের ব্যবহার
হিন্দু ধর্মে ‘গায়ত্রী মন্তর’ নামে একটি মন্ত্র আছে। এই মন্ত্রকে সকল মন্ত্রের জননী বলা হয়। মন্ত্রটি সত্যকাম বিদ্যালংকারের ‘The Holy Vedas’ গ্রন্থে রয়েছে। মহাভারত, বেদ, উপনিষদ ও ভগবতগীতা গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘ধ্যানে মগ্ন হলে একজন মানুষ আত্মার সন্ধান পেতে পারে নিজের মাঝেই।’ এই ধর্মের মুনিঋষিদেরই সবচে’ বেশি পদ্মাসন ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করে বসে ধ্যান করতে দেখা যায়।

বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যান
সৎদৃষ্টি, সৎসংকল্প, সৎবাক্য, সৎকর্ম, সৎজীবিকা, সৎপ্রচেষ্টা, সৎস্মৃতি এবং সৎসমাধি এই আটটি কি-ওয়ার্ড বৌদ্ধ ধর্মের  নির্বাণপ্রাপ্তির উপায়। যার শেষটিতে ধর্মচক্রের গোপন কি-ওয়ার্ড হিসেবে ধ্যানকে উল্লেখ করা হয়েছে। বুদ্ধের বাণীতে একজন মানুষ তার স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করে ত্রিকাল দর্শনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন শুধু ধ্যান করার মাধ্যমে।

খ্রিষ্ট ধর্মে ধ্যান
যিশু ধ্যান এবং প্রার্থনাকে এক শব্দ মনে করতেন। যিশুর শক্তির উৎস ছিল তাঁর ধ্যান। সারাদিন ভক্ত-শিষ্য একসাথে সময় কাটানোর পর সন্ধ্যাবেলা নির্জনে প্রার্থনায় নিমগ্ন হতেন, ভুলে যেতেন সমস্ত ক্ষুধা-ক্লান্তি-অবসাদ। ধ্যানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে পর্যালোচনা করতেন। ভুলগুলো খুঁজে বের করে মনের পর্দায় নিজেকে দাঁড় করাতেন। যিশু স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বাইবেল পড়ে একজন মানুষ স্রষ্টাকে খোঁজে, আর মেডিটেশনের মধ্য দিয়ে সে স্রষ্টাকে পায়।’

ইসলাম ধর্মে ধ্যান
ইসলাম ধর্মে ধ্যানের গুরুত্ব সম্পর্কে কয়েকধাপ বাড়িয়ে বলা হয়েছে। কোরআনে সুরা আল ইমরানের ১৯০ আয়াতে জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে গভীর ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয়’। সূরা আনআমে বলা হয়েছে, ‘হে নবী! ওদের জিজ্ঞেস করো, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি কখনো সমান হতে পারে? তোমরা কি এরপরও গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হবে না?’

এছাড়া রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘এক ঘণ্টার ধ্যান সারা বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম।’ এছাড়া বলেছেন, ‘সৃষ্টি সম্পর্কে এক ঘণ্টার ধ্যান ৭০ বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম (মেশকাত)।’ এছাড়াও আমরা জানি হযরত মোহাম্মদ (স) হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান করতেন এবং ধ্যান করার সময়ই তাঁর উপর কোরআন নাজিল হতো।

এছাড়াও আধুনিক যুগে ধ্যান নিয়ে চলছে প্রচুর গবেষণা। বেদান্ত সোসাইটি, কোয়ান্টাম মেথড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা করছে। ‘এভরিবডি সে ওম’ শিরোনামে এমনই একটি গবেষণা প্রকাশ পায় ৮ জানুয়ারি ২০১১ সালে। গবেষণাটি প্রকাশ করে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি। রিপোর্টে বলা হয়, মেডিটেশন শুধু সাধকদের জন্যে নয় বা এ থেকে উপকার লাভের জন্যে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে কেউ মাত্র ৩০ মিনিট মেডিটেশন করে উপকৃত হতে পারে। মেডিটেশনে ব্যয় করা সময় হচ্ছে ফলপ্রসূ সময় ব্যয়।

আজকের পত্রিকা/এসএ