সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সিনিয়র সাব-এডিটর

বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিলে বা শেয়ার করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

দেশে ভয়াবহ আকারে বেড়েছে গণপিটুনির ঘটনা। গত ৪৮ ঘণ্টায় সারা দেশে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে ৮জন নিহত হয়েছে। ভাইরাসের মতো ‘ছেলেধরা’র গুজব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। এতে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কও। ঘটনাগুলোর দিকে একটু লক্ষ্য করা যাক-

২০ জুলাই শনিবার সকালে নিজের চার বছর বয়সী সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর খবর জানতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তাসলিমা বেগম রেনু। একটি গুজবেই শেষ হয়ে গেল রেনুর সব স্বপ্ন। স্বামীর সঙ্গে দুই বছর আগে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম একাই করছিলেন তিনি। খুব শিগগিরই ছোট ভাইয়ের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই গুছিয়ে নিয়েছিলেন রেনু। কিন্তু একটি অহেতুক সন্দেহে থেমে গেল সব! এতে অনিশ্চিত হয়ে গেল ছোট্ট দুই মা হারা শিশু তাসফিক আল মাহি এবং তাসলিমা তুবার ভবিষ্যত।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে একই দিন ২০ জুলাই শনিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের দেউরাছড়ায় এক যুবককে আটক করে উত্তেজিত জনগণ মারধর করে। পরে সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে।একই সন্দেহে আরেকটি হত্যার ঘটনার খবর মেলে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। সেখানেও এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে জানা যায়, ওই যুবক ছিলেন বাক-প্রতিবন্ধী। নিজের সন্তানকে দেখতে যেয়ে জনগনের রোষানলে পড়ে মৃত্যুকে বরণ করতে হলো তার।

এছাড়া সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগার গুজব ছড়িয়ে পড়ায় একই দিন সাভারের ফল ব্যবসায়ী রাসেল মিয়াকে, পাবনায় এক যুবককে, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এদিন সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকায় এক শিশুকে বিস্কুট খাওয়ানোর সময় এক নারীকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।

গত ১৮ই জুলাই, নেত্রকোনায় এক যুবকের ব্যাগ থেকে এক শিশুর কাটা মাথা উদ্ধারের ঘটনা এসব গুজবে ঘি ঢালে। তবে নেত্রকোনার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সে সময়ই জানিয়ে দিয়েছিলেন, গুজবের সাথে ওই ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র নেত্রকোণার ঘটনা ছাড়া আর সব ঘটনায় গুজবের কারণে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

কিন্তু কেন একবিংশ শতাব্দিতে এসে ‘পদ্মাসেতুতে মানুষের কল্লা লাগবে’- এমন কুসংস্কারে ভাসছে দেশ? আর কেনই বা এই গুজবে কান দিয়ে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে মানুষ? এ বিষয়ে কথা বলতে আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরীর সঙ্গে। গণপিটুনির এই ঘটনাকে তিনি ‘মব সাইকোলজি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।এইসব ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি মনে করছেন আইনের প্রতি জন মানুষের শ্রদ্ধা কমে যাওয়া। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়া ও অনেকক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যাদের দায়িত্ব, তারা নিজেরাও এইসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন এবং সেইসব হত্যাকাণ্ডের বিচার সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হওয়াকেও গণপিটুনির পেছনে দায়ী বলে মনে করছেন তিনি।

সারা দেশে খুন, গুম, ধর্ষণ বেড়ে যাওয়া এবং সামাজিক অবক্ষয়তা বৃদ্ধিকে কারণ জানিয়ে ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার সঠিকভাবে না হওয়াতে মানুষ মনে করছে, সে যা ইচ্ছা করে পার পেয়ে যাবে। একই সঙ্গে যে গুজব ছড়িয়েছে চারপাশে, তাদেরও তো খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। পদ্মা সেতুর জন্য কল্লা লাগবে- এটা যে কত বড় একটা কুসংস্কার! একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে এটা প্রচার হচ্ছে, এটাই তো দুঃখজনক! ‘

এ ধরনের গুজব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে ইশফাক ইলাহী চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও দুর্বলতা রয়ে গেছে। সত্যিকার অর্থে মানুষকে যেভাবে আলোকিত করা উচিত, আমরা সেটা করতে পারছি না।’ এছাড়া শক্ত হাতে এসব ব্যাপারকে দমনের ব্যাপারে শুধু রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রাম এবং ইউনিয়ন পর্যায়েও সচেতনা তৈরি করতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন অনেক এগিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করার বা সাহায্য চাওয়ার জন্য হটলাইন নম্বর দেওয়া আছে। এ রকম গণপিটুনির ঘটনা দেখলে ভিডিও না করে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলেই কিন্তু অনেককিছুর সমাধান সম্ভব, কিন্তু মানুষ তা না করে ভিডিও করতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এটা চরম সামাজিক অবক্ষয়তার পরিচয়।’

একই রকম মন্তব্য করেছেন এনাম মেডিকেল হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এবং সাইকিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান ডা: মো: ফারুক হোসেনও। আজকের পত্রিকার সাথে আলাপকালে তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এ সকল ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং পারিবারিকভাবে বর্তমান যুগে মানুষ চরমভাবে হতাশাগ্রস্ত। যখন এই ক্ষোভগুলো ঝাড়ার সুযোগ তারা কোনোভাবে পেয়ে যায়, তখন আর কোনোকিছুতেই যৌক্তিকতা খোঁজার চেষ্টা তারা করে না।

গণপিটুনির এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের নীতিনির্ধারকরা। ছবি: সংগৃহীত

এদিকে গণপিটুনির এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের নীতিনির্ধারকরা। ইতোমধ্যেই সরকারের উপর মহল থেকে ছেলেধরার গুজব বন্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এবং ব্লগগুলো নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ছেলেধরা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিলে বা শেয়ার করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২২ জুলাই সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক সাঈদ তারিকুল হাসান সারাদেশের পুলিশের ইউনিটকে এই বার্তা পাঠান। বার্তায় উল্লেখ করা হয়- ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ব্লগ এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছেলেধরা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তিমূলক পোস্টে মন্তব্য বা গুজব ছড়ানোর পোস্টে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

বার্তায় মোট চারটি উপায়ে ছেলেধরার গুজব ও গণপিটুনি প্রতিরোধে পুলিশের ইউনিটগুলোকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, স্কুলে অভিভাবক ও গভর্নিং বডির সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়, ছুটির পর অভিভাবকরা যাতে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যায়- সে বিষয়ে নিশ্চিত করার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা, প্রতিটি স্কুলের ক্যাম্পাসের সামনে ও বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, মেট্রোপলিটন ও জেলা শহরের বস্তিতে নজরদারি বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আজকের পত্রিকা/সিফাত