হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরী বাজারে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পণ্য কুলা তৈরি করছেন এক কারিগর। ছবি : ফয়ছল ইসলাম

বৈশাখী মেলার প্রচলন মূলত গ্রাম থেকে শুরু হলেও এর আয়োজন আর ব্যাপ্তি এখন ছুঁয়ে গেছে আধুনিক নাগরিক জীবনকেও। লোকজ এই উৎসব শুধু বাংলার ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকেই তুলে ধরে না, এর পাশাপাশি এ মেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পীদের এনে দেয় তাদের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রির সুযোগও। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পীদের চরম দুর্দিন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন হবিগঞ্জ প্রতিনিধি ফয়ছল ইসলাম।

প্রতি বছর নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে বসে বৈশাখী মেলা। গ্রামীণ এ মেলায় মানুষের হাতে তৈরি মানসম্পন্ন বুটিক শিল্পের পোশাকের পাশাপাশি, প্রাণবন্ত টেরাকোটা, সৌখিন ল্যাম্প, খেলনা-তৈজসপত্রের এবং কুটির শিল্পের চাহিদাও বেড়ে যায়। কিন্তু এক সময়ে জনপ্রিয় এবং বৈশাখী মেলার অন্যতম আর্কষণ ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প দেশে হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ হিসেবে কুটির শিল্পীরা বলছেন, ‘বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির প্লাস্টিকের কদর বেড়ে যাওয়ায় এবং পুঁজির অভাবে বাঁশ ও বেতের তৈরি শিল্পের চাহিদা নেই আগের মতো।’

সময়ের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যাচ্ছে ব্যবহারিক জীবনের অতি প্রয়োজনীয় বাঁশ ও বেতের তৈরি কুটির শিল্প। কুটির শিল্প এবং এ শিল্পের চাহিদা নিয়ে কথা হয় হবিগঞ্জের কয়েকজন কারিগরদের সাথে। তারা আজকের পত্রিকাকে জানান, ‘বাঁশ ও বেতের দাম বেড়ে যাওয়া, ঋণের ভার আর দাদনের বোঝা বইতে না পেরে অনেকেই এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। জানা যায়, হবিগঞ্জে বাঁশ ও বেত শিল্পের সঙ্গে জড়িত শত শত পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তিরা বর্তমানে বেকার হয়ে চরম দুর্দিনের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে। এখনো যারা এ শিল্পে টিকে আছেন তারা বংশানুক্রমে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাদের কেউ কেউ দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এ শিল্পের সাথে জড়িত।

কুটির শিল্পের গ্রাম হিসেবে খ্যাত এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার কাটাখাল গ্রাম। এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এ কুটির শিল্পের পেশায় জড়িত। বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ। কাটাখাল গ্রামের অনেকেই মূলত বংশ পরম্পরায় এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।

কাটখাল গ্রামবাসীদের তৈরি কুটির শিল্প কুলো। ছবি : ফয়ছল ইসলাম

বিভিন্ন উৎসব পার্বণ ছাড়াও প্রতিদিন এ গ্রামের নারী-পুরুষ তাদের নিপুণ হাতে তৈরি করে থাকেন কুলা, ঢাকনা, টুকরি, চাঙ্গা, মাছধরা ও রাখার সরঞ্জামসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কাটাখাল গ্রামের বাড়ির উঠানে উঠানে চলছে কুটির শিল্প তৈরির কাজ। কেউ কাটছেন বাঁশ। কেউবা তুলছেন ফালি। পরিবারের অন্যরা দল বেঁধে বসে তৈরি করছেন কুটির শিল্প সামগ্রী। বসে নেই নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশুরাও। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। লেখা-পড়ার পাশাপাশি স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এ কাজে ব্যস্ত সময় কাটায় বলে জানা যায়।

গ্রামের নারী-পুরুষ তাদের নিপুণ হাতে তৈরি কুলা, চাটাই, হাঁস-মুরগির খাঁচা, সাজি, ঢাকনা, চালনি, পালা, খাঁচা, মোড়া বেতের ধামা, পাতিল, চেয়ার, টেবিল, দোলনা, খারাই, পাখা, বই রাখার তাক, ঘুনি, ডালা, ঝুড়ি ইত্যাদি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় শিল্পসামগ্রী তৈরি করেন।

সপ্তাহব্যাপী শিল্প সামগ্রী তৈরির পর ঘরে বসেই পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে সেগুলো বিক্রি করা হয়। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে সিলেটের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয় কাটাখাল গ্রামের কুটির শিল্প সামগ্রী। কাঠখাল গ্রামের ব্যবসায়ী আতাউর রহমান (৬৫) আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ছোটবেলা পিতার কাছ থেকেই কাজ শিখি। এই কাজ করেই আমাদের সংসার চলতো। আমাদের পূর্ব পুরুষরাও এ কাজ করতেন।’

বসায়ী আতাউর রহমান এ ব্যবসার সাথে প্রায় ২৫ বছর ধরে জড়িয়ে আছেন উল্লেখ করে আজকের পত্রিকাকে বলেন, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম হলো আশিকুর রহমান কুটির শিল্প। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, চৈত্র ও বৈশাখ মাস হলো এ ব্যবসার সবচেয়ে ভালো সময়। এ সময় তাদের ব্যবসা ভালো হয়। প্রতিটি কুলা কেনা হয় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা করে, আর বিক্রি করা হয় ৫০ টাকা করে। তিনি আরো বলেন, কুটির শিল্পে খরচ বৃদ্ধির তুলনায় জিনিসের মূল্য সে অনুপাতে পাওয়া যায় না। এখন জীবিকার তাগিদে কুটির শিল্পের পাশাপাশি অন্যকাজও করতে হয় আমাদের। কেবল পারিবারিক পেশা হিসেবে কুটির শিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছি।

অতীতে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি কুলা, চালুন, মাছ ধরার চাঁই, ঝুঁড়ি, আরাম কেদারা, সোফাসেট, বইপত্র রাখার তাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা ও প্রচলন থাকলেও বর্তমানে এর কদর প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বাঁশ ও বেত শিল্পীদের জীবনে বর্তমানে নেমে এসেছে দুর্যোগের কালো মেঘের ঘনঘটা।

কুটির শিল্পের তৈরি কলই। ছবি : ফয়ছল ইসলাম।

স্থানীয় নিতাই দাশসহ একাধিক কুটির শিল্প কারিগর আজকের পত্রিকাকে জানান, আগে এক একটি বাঁশ কিনতে হতো ৫০ থেকে ১২০ টাকা দরে। আর এখন প্রতিটি বাঁশ কিনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। একসময় গ্রামীণ বাজারে বাঁশের তৈরি পণ্যের বেশ চাহিদা থাকলেও বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের কারণে এ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। সেইসাথে বাঁশের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় তারা সমস্যায় ভুগছেন, ছেলে-মেয়ে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাতসহ তাদের চরম দুর্দিন যাচ্ছে এখন। একপ্রকার বাধ্য হয়ে তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে বাংলার প্রাচী এই ‘কুটির শিল্প’। আধুনিক যুগে তৈরিকৃত বিভিন্ন ধরনের ধাতব শিল্পের আগ্রাসনের কবলে পড়ে বাঁশ ও বেতের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম শিল্পটি ক্রমশ মুখ থুবড়ে পড়ছে।

সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন কাটখাল গ্রামের কুটির শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পীরা। তারা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজশর্তে ঋণের সুবিধা পেলে পুনরায় উজ্জীবিত হবে এ শিল্প। তাই ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এ অঞ্চলের কারিগররা।

আজকের পত্রিকা/এমএআরএস/জেবি/আ.স্ব/