আসাদুজ্জামান স্বপ্ন
সিনিয়র রিপোর্টার

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ছবি : সংগৃহীত

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরে চলতে থাকা বহুল আলোচিত জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা হয় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার। সেদিন থেকেই রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডের পুরানো কারাগারে বন্দি তিনি। আজ পূর্ণ হলো বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর। জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ১৭ বছরের সাজা নিয়ে কারাগারে আছেন তিনি। ৮ ফেব্রুয়ারি বকশীবাজারে কারা অধিদফতরের প্যারেড গ্রাউন্ডে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

৩০ অক্টোবর অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্ট খালেদা জিয়ার নিম্ন আদালতের দেয়া ৫ বছরের সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন। সম্প্রতি এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। আর ২৯ অক্টোবর চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এ মামলায় খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল আবেদন করেন আইনজীবীরা। আপিলটি এখনও হাইকোর্টের কোনো বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়নি।

বেগম জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, সরকার বিচারবিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার কারণেই তার কারাবাস দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে সরকারপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, যথাসময়ে আইনি পদক্ষেপ না নেয়ায় বেগম জিয়ার এই পরিণতি।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলার মধ্যে দুর্নীতির মামলা ৫টি। এগুলো হল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা। পাঁচটি মামলাই এক-এগারোর সময়ে করা। বাকি ৩১টি ২০১৪ সালের পর করা। মূলত রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা, ইতিহাস বিকৃতি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি, ভুয়া জন্মদিন পালন ও ঋণখেলাপির অভিযোগে এসব মামলা হয়।

৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার রয়েছে হৃদযন্ত্র, চোখ ও হাঁটুতে সমস্যা। তার বিরুদ্ধে করা ৩৬টি মামলার মধ্যে এখনও বাকি চারটির জামিন। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, কারাগারে খালেদা জিয়া সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা পড়েন, ইবাদত-বন্দেগি ও বই পড়ে দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান।

বিএনপি’র আইনজীবীরা শুরু থেকেই বেগম জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত করার জন্য সরকারকে দুষছেন। তাদের দাবি, রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছে সরকার। যদিও সরকার সমর্থিত আইনজীবীরা এ অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলছেন, যথাসময়ে আইনি পদক্ষেপ না নেয়ায় বেগম জিয়ার এই পরিণতি। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এখন খালেদা জিয়াকে মুক্তি পেতে হলে কুমিল্লায় হত্যা, জিয়া অরফানেজ, জিয়া চ্যারিটেবল ও ঢাকার মানহানির মামলায় জামিন পেতে হবে। খালেদা জিয়ার সাজার বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে যেন ‘লুকোচুরি’ খেলা হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, একের পর এক মামলায় জড়ানো হচ্ছে খালেদা জিয়াকে। সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে কোনোভাবেই তাকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তবে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।

বেগম জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদিন বলেন, আমরা তো জেলের তালা ভেঙে বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্ধার করতে পারবো না। এতে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। রাজনৈতিক মামলাগুলোতে সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া আজ পর্যন্ত কেউ বের হতে পারেননি।

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম বলেন, এই মামলার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া দুদকের করা। কাজেই এই ধরণের মন্তব্য হাস্যকর। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৬টি মামলা রয়েছে। মুক্তির জন্য এ মুহূর্তে শুধুমাত্র চারটি মামলায় তার জামিন পেতে হবে।

দুর্নীতির পৃথক দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত এক বছর ধরে নাজিমউদ্দীন রোডের পুরনো কারাগারে বন্দী বেগম খালেদা জিয়া। আইনি প্রক্রিয়া ও তার মুক্তি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানা তর্ক। তাই আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনেই বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ খুঁজছেন তার আইনজীবীরা।