আজকাল একটা শব্দের সাথে প্রায়ই পরিচয় হচ্ছে, সেটি হল, আপনি কি করছেন?

যদি বলা হয় ‘সাংবাদিক’। তখন অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মাঝে কমন হল, টাকা-পয়সা কেমন? কেমন আয় কর? এ প্রশ্নেও নিরব থাকতে হয়। জবাব সহজে দেয়া যায় না।

অথবা দিলেও বলতে হয় অনেক কথা। তখন আবার পাল্টা প্রশ্ন করা হয় ছেলেটা বেশি কথা বলে!

সাংবাদিকতা এমন একটা আজব পেশা বলা যায় না বেতনের অঙ্কটা।

যোগ্যতা ও দক্ষতার গুণে এ পেশায় যে কিছু হয় না দেরিতে হলেও বুঝা যাচ্ছে।
আরো বিস্ময়কর হল, এ পেশাটা আজ কতভাগে যে বিভক্ত একমাত্র বিধাতাই জানেন।

পক্ষে থাকলেও বিপদ, বিপক্ষে থাকলেও। মাঝামাঝি থাকারতো চান্সই নেই। এ পেশায় কে কার মাধ্যমে এসে কে কাকে ছাড়িয়ে গেছে দালালি, বাটপারি, চাঁদাবাজি, প্রতারণা আর ধান্ধাবাজিতে সেটাই যেন মূখ্য।

আর বাজার দরে সাংবাদিকদের মূল্য হিসেব করলে ফল জিরো। এ পেশায় ন্যায্য মজুরি আশা করাটা বোকামি।

যে সাংবাদিক, অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করে যায়, সেই সাংবাদিক, তার নিজের কোনো অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবে না।

ঢাকায় অনেকে যা বেতন পান তা’ দিয়ে সংসার চলে না! আর মফস্বল এখানে বেতন পাওয়া আর আসমানের চাঁদ হাতে পাওয়া সমান কথা।

বিনা বেতনে, অনিয়মিত বেতনে মাসের পর মাস, বছরের পর কাজ করে যাওয়াই যেন নিয়তি। ঢাকায় একই অবস্থা, কয়েকটি ছাড়া। এখানে অবশ্য বিনা বেতনে কাজ করতে হয় না। আছে অনিয়মিত বেতনের খড়্গ। অথবা পাওনা বুঝিয়ে না দিয়ে হঠাৎ চাকরিচ্যুত করার মত অত্যাচার।

প্রাণান্ত পরিশ্রম করে, পেশার জন্য জীবন বাজি রেখেও অনেক সংবাদকর্মীর যে দেশে আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং জীবনের নিরাপত্তা মেলে না; সেই দেশে তথাকথিত কিছু সাংবাদিকের জীবন কাটে মহাসুখে৷

তিন বছর আগে আনিসুর রহমান এরশাদ নামে এক লেখকের একটা লেখা পড়েছিলাম।

লেখক লিখেছেন, এই দেশে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা পেশায় থেকে বেতন না পেতে-পেতে এক পর্যায়ে দেশান্তরী হবার ঘটনাও ঘটেছে, আনমনা চলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় কিংবা রোগে অকালমৃত্যুও ঘটেছে। কাউকে ভাবের ওপরে আর কাউকে হাওয়ার ওপরেও চলতে হয়। অনেক মিডিয়া হাউজের ভেতরের অবস্থা বাস্তবে এমন যে ওপর দিয়ে ফিটফাট ভেতর দিয়ে সদরঘাট। এমনও হাউজ আছে যেখানে কিছু সাংবাদিককে বেতন দেয়া হয়, বাকিরা বেতন ম্যানেজ করে চলেন! নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় মানসিক যন্ত্রণায় অনেকে অসুস্থ হয়। অনেক সাংবাদিক বেতন না পাওয়ায়, ন্যায্য বেতন না পাওয়ায় অথবা নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অপরাধে জড়ান! অনেক সাংবাদিকের চাকরি বড় অদ্ভুত। ‘এ যুগের দাস’-এর চাকরিতে উপস্থিতিতে বিলম্ব হলে বেতন কর্তন হয়, বছরের পর বছর গেলেও চাকরি কনফার্ম করে না, কোন ছুটি-ছাটা থাকে না। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, মায়ের অসুস্থতায় গ্রামের বাড়ি যাওয়া এমনকি বিয়ে করতে গিয়েও ছুটি মিলে না।

অনেক সাংবাদিকদের বিনা বেতনে কাজ করাতে পারলে এই বসুন্ধরায় জন্ম নেয়া স্বার্থক হয়েছে বলে মনে করেন। যারা ওপরে থেকে বেশ ফুরফুরে আমেজে থাকেন তাদের পর্যন্ত পৌঁছে না অধঃস্তন সাংবাদিকদের সংসারের কান্না! এমনও পত্রিকা আছে যারা বিস্তর সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার পরও সেখানকার সাংবাদিক কর্মচারীদের নিয়মিত বেতনভাতা দেয় না!

বাস্তবতা হচ্ছে অধিকাংশ পত্রিকাই সাংবাদিকদের উপযুক্ত বেতন দেয় না অথবা নিয়মিত দেয় না! অথচ এদেশে ধান্ধাবাজ ও ধূর্ত প্রকৃতির অনেকে অপরাধ ও অন্যায়কে ধামাচাপা দিতে মিডিয়া চালু করেন। আশা দিয়ে এসবে জড়িত করেন হাজার হাজার সাংবাদিককে। ঢাকার লোকজন অফিস থেকে বেতনসহ কিছু পায় ঢাকার বাইরের ৯৯ ভাগ অথবা এরচেয়ে বেশি সাংবাদিক তা পায় না!

ওই লেখক বলেন, এমন একটি পন্থা বের করা দরকার যাতে দেশে একজন সাংবাদিকও বাজারমূল্য অনুসারে ন্যায্য মজুরি ছাড়া কাজ করতে না হয়। বাজার চাহিদা অনুসারে দেশে কতটি সংবাদপত্র, টিভি, অনলাইন চলা সম্ভব সেটিও ঠিক করে এমন একটি অবস্থা নিশ্চিত করা দরকার, যেন নির্ধারিত বেতনভাতা দিতে না পারলে, কেউ কোনও মিডিয়া দোকান খুলতে ও চালাতে না পারে। অপ্রয়োজনীয় ধান্ধাবাজ মিডিয়া প্রতিষ্ঠান কাম্য হতে পারে না।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিবাহিত সাংবাদিক বন্ধু জানালেন: ছয় মাসের বেতন বকেয়া, বউ চাকরি না করলে উপোসে মরতাম৷ আর এক অবিবাহিত সাংবাদিক বন্ধুর কথা, আমার পত্রিকায় তিন মাস ধরে বেতন বন্ধ। সংসার করলে এখন কাপড় খুলে রাস্তায় হাঁটতে হতো৷ এসব সঙ্কটের সাথে ভুয়া সাংবাদিকতার বিশাল নেটওয়ার্ক যোগ হয়ে অবস্থা আরও খারাপ করেছে৷ পেশাদার সাংবাদিকের জীবন যেখানে শঙ্কিত সেখানে ভুয়া সাংবাদিকরা চাঁদাবাজি, নারী কেলেঙ্কারি, জমি দখল থেকে শুরু করে হেন অপরাধ নেই যা করে না৷ আর নামকাওয়াস্তে মিডিয়া খুলে বসা মালিকরাও ওয়েজ বোর্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নিজস্ব নিয়মে নিয়োগপত্র প্রদানসহ দাসদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মগুলোকে সাংবাদিকদের মানতে বাধ্য করে থাকেন। এভাবেই এই সময়ে এসেও নীলকর, জমিদারদের প্রেতাত্মা মালিকদের অন্যায় সিদ্ধান্ত ও খেয়ালিপনার শিকার হয়ে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে পেশাদার, দায়িত্বপরায়ণ ও সৎ চাকরিজীবীরা।

এবার আসি কেন এমন হচ্ছে, তা নিয়ে। অনেক কারণের মধ্যে কিছু কারণ হল, হকার, গাড়ির লাইনম্যান, ওষুধ কোস্পানির সেলসম্যান, ইন্সুরেন্সকর্মী, জমির দালাল, থানার দালাল, জুয়াড়ি, মাদক ব্যবসায়ীরাও অনুপ্রবেশ করছে এ পেশায়।

মেধাবীরা এই পেশায় আসতে চাইছেন না। তাই বলে অনেক সময় প্রায় অযোগ্য কিছু মানুষকে দিয়ে কাজ চালানো শুরু হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা নাইবা বললাম। বছরের পর বছর পড়াশুনা করে সবোর্চ্চ শিক্ষা মেধাবী একজন ছাত্র সাংবাদিকতায় পেশায় এলেও তাকে সাংবাদিকতা করতে হচ্ছে এইট পাস বা প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে না পারা ছাত্রের সাথে!

এছাড়াও কোনো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করছে না অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। এখানেও অনিয়ম। লেয়াজু বা চামচামি করতে না পারলে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না।

এসব প্রশিক্ষণবিহীন, সাংবাদিকতা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞানবিহীন অদক্ষরা শিং-গজানো বাছুরের মতো বুকে আইডি কার্ড ঝুলিয়ে পেশার সুনাম ক্ষুন্ন করছে। একজন হাতুড়ে ডাক্তারেও মিনিমাম ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নেয় আর সাংবাদিক….

এরাই সরকারি বেসরকারি অফিসে গিয়ে ধমক দিয়ে কাজ করাতে চায়। এর বাইরে আছে স্বঘোষিত ধান্দাবাজ আর চাঁদাবাজদের সাংবাদিক হয়ে ওঠা। ব্ল্যাকমেইলিং যাদের পেশা। যারা মানুষের গলায় পা দিয়ে হাতিয়ে নেয় টাকা। আর
এসব সাংবাদিক’দের দায় নিতে হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদেরকে।

এছাড়াও করোনার এই সময় এক ধরণের সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে। যাদের নামে অভিযোগ শতশত। তারা হল, তথাকথিত ফেসবুক সাংবাদিক। তারা মৃত্যুর সংবাদ সহ যাবতীয় অশুভ সংবাদ ছাপছেন। যাচাই বাছাইয়ের বালাই নেই। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা নেই।

তারা মানুষের মৃত্যু নিয়ে নিউজ করেন। ধৈর্য এর লেশমাত্র নেই? অনেক সময় জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে দুই লাইন ফেসবুকে দিয়ে দেন।

এ ধরনের নিউজ দেয়া যে কত বড় ক্রাইম তা কি তারা জানেন? কেউ মামলা করলে ধাক্কা সামলাতে পারবেন কিনা তারাই জানেন!

আর একদল আছেন যারা ফেসবুকে প্রতিদিন ৪/৬ লাইনের স্টেটাস দেন। সারা বিশ্বে করোনা মহানারীতে আক্রান্ত কত, মরলো কত। যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত কত, মরলো কত, নিউইয়র্কে আক্রান্ত কত, মরলো কত, প্রতি কয়মিনিটে কত জনের মৃত্যু হচ্ছে ইত্যাদি।

এদের মধ্যে হাতে গোনা দু একজন বাদে কারো স্টেটাসেই পুরো কোন তথ্য নেই। জন্মিলে মৃত্যু হয়, অসুস্থ হলে সুস্থ হয় এটাইতো স্বাভাবিক নিয়ম। ডিটেলস তথ্য না দিয়ে স্টাটাসটা সোস্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন কেন !

অথচ ঘরবন্দী মানুষদের মধ্যে অনেকে অসুস্থ আছেন, অনেক সিনিঁয়র সিটিজেন আছেন। তাদের দেয়া এই স্টাটাস পড়ে অনেকেই প্যানিক হচ্ছেন তা কি তারা জানেন?

ফেসবুকে যে সংবাদ অন্যের ক্ষতি করে, প্যানিক ছড়ায় তা ক্রাইম।

দেখা যায়, কেউ ফেসবুকে একটা স্টাটাস দিলেন। ওমনি শকুনের মত তারা হামলে পড়বে এর উপর। ছুরি, কাঁচি নিয়ে এরা প্রস্তুত থাকে সব সময়। আপনার স্টাটাসের অংশটুকু কেটে তার নাম দিয়ে দাড়ি কমা সেমিকোলন কোন কিছু না বদলিয়ে বসিয়ে দেবে। আজব চরিত্র এরা।

কারো স্টাটাস “শেয়ার” করতে ওরা লজ্জা পায়। কিন্তু অন্যের স্টাটাস নিজের নামে চালাতে একটুওলজ্জা বোধ করে না।

মনে রাখা দরকার সব শ্রেণী পেশায় “হাতুড়ে” প্রজাতি বিপজ্জনক। এদেরকে রুখতে হবে। থামাতে হবে।

 

  • 316
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    316
    Shares