বিদ্রোহী একদল তরুণ কবি, যারা কবিতাকে পরিণত করেছেন তাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রধান অস্ত্রে। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইন্তেকাল করেছেন। ১৪ জুলাই রবিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ৯০ বছর বয়সী এরশাদ রক্তে সংক্রমণসহ লিভার জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২২ জুন সিএমএইচে ভর্তি করা হয় তাকে। এর আগেও তিনি একাধিকবার দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ- বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অদ্ভুত রহস্যময় চরিত্র, অনেকক্ষেত্রে ঘৃণিতও। রাজনীতির মতো সিরিয়াস একটি ফিল্ডে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এত হাস্যরসাত্মক কৌতুকের সৃষ্টি এর আগে বাংলাদেশে কখনো হয়েছে বলে জানা নেই। এরশাদ মানেই যেন হাসির পাত্র! অথচ তাঁর ছিল দীর্ঘ এক বর্ণাঢ্য জীবন। সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত…রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো অলঙ্কিত না কলঙ্কিত করেছিলেন এরশাদ, সেসব বিচার-বিশ্লেষণ হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর খুব নগণ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

এরশাদের কবিতা ভাবনা ও কাব্য জীবনের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও ভালোবাসার বিষয়টি বিবেচনা করলে অনেকের মনে হতে পারে রাজনীতিবীদ কিংবা সেনাপ্রধান নয়, তার একান্ত তীব্র ইচ্ছে ছিলো কবি হওয়ার। মানব জীবনে এমনই লোভনীয় ‘কবি’ উপাধি। তাই তো জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি কবিতা ভালোবেসে এসেছেন। তার সেসব কাব্য সাধনার জন্যে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন।

কবি খ্যাতি পাওয়ার জন্য এরশাদের ছিল কাঙালিপনা। তাঁর শাসনামলে দেশের প্রায় সবগুলো জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় ছাপা হতো তাঁর কবিতা। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে বেরিয়ে গেছে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, ‘কনক প্রদীপ জ্বালো।’ বঙ্গভবনে নিয়মিত বসছে কবিতার আসর। ঢাকার সে সময়কার প্রথম সারির নামকরা কিছু কবি তাকে ঘিরে থাকেন এসব অনুষ্ঠানে। এ নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। যদিও ক্ষমতায় আসার আগে এরশাদের কবি জীবন সম্পর্কে কেউ-ই তেমন একটা জানতেন না বলেই জানা গেছে একাধিক সূত্রে। এ নিয়ে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালীনই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয়েছিল তাকে।

১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাসে জেনারেল এরশাদ তখন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। মাত্র তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন। সংসদ ভবনে তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দফতর (সিএমএলএ)। সেখানে রীতি অনুযায়ী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জেনারেল এরশাদ কথা বলবেন তার যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে। সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের তৎকালীন কূটনৈতিক সংবাদদাতা জাহাঙ্গীর হোসেন উঠে দাঁড়িয়ে জেনারেল এরশাদকে বললেন, ‘আমি কি আপনাকে একটি অরাজনৈতিক প্রশ্ন করতে পারি?’

১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে এরশাদের সেই সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত

জেনারেল এরশাদ বেশ খুশি হয়ে গেলেন। কিন্তু জাহাঙ্গীর হোসেন যে প্রশ্নটি তাকে ছুঁড়ে দিলেন, সেটির জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। জাহাঙ্গীর হোসেন তাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনি ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানতো না আপনি একজন কবি। এখন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় আপনার কবিতা ছাপা হয়। পত্রিকার প্রথম পাতা তো খবরের জন্য, কবিতার জন্য নয়। বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানেরও তো এই ভাগ্য হয়নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কবিতা প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ জারি করা হয়েছে?’

নয় বছরের শাসনামলে সেনাশাসক জেনারেল এরশাদকে কোন সংবাদ সম্মেলনে এরকম বিব্রতকর প্রশ্নের মুখোমুখি সম্ভবত আর হতে হয়নি। এ প্রশ্নের উত্তরে এরশাদ বললেন, ‘আমি দেশের জন্য এত করি, এটুকু কি আপনি দেবেন না আমাকে?’ জাহাঙ্গীর হোসেন প্রশ্নটি আবার করায় এরশাদ জবাব দিলেন, ‘আপনি যদি চান, আর ছাপা হবে না।’ এরপর সত্যিই জাতীয় দৈনিকগুলোতে ছাপা কমতে থাকে এরশাদের কবিতা। প্রথম পাতা থেকে এরশাদের কবিতা জায়গা নিতে থাকে ভেতরের পাতাগুলোতে।

কবি খ্যাতি পাওয়ার জন্য যে এরশাদের ছিল এত কাঙালিপনা, তাঁর সরকার পতনে কবিতা ছিল একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। একদিকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সেনাশাসক জেনারেল এরশাদ, যিনি কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য আকুল। অন্যদিকে বিদ্রোহী একদল তরুণ কবি, যারা কবিতাকে পরিণত করেছেন তাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রধান অস্ত্রে।

সরকারি ট্রাস্ট থেকে তখন প্রকাশিত হতো দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা। দৈনিক বাংলার সম্পাদক তখন শামসুর রাহমান। দুটি কাগজেই নিয়মিত ছাপা হতে লাগলো জেনারেল এরশাদের কবিতা। তখন কবিদের দুটি সংগঠন ছিল। একটির নাম ‘কবিকন্ঠ’। এর নেতৃত্বে ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসানের মতো কবিরা। এরশাদ ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কবিকন্ঠ বেশ সক্রিয় ছিল। তাঁরা জেনারেল এরশাদকে বলে ধানমন্ডিতে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি এই সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেন। সেখানে প্রতি মাসে কবিতার আসর বসতো। সেখানে এরশাদ থাকতেন প্রধান অতিথি। তিনি নিজে কবিতাও পড়তেন।

অন্যদিকে শামসুর রাহমান এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মিলে কবিদের আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেটার নাম ছিল ‘পদাবলী’। তাদের ঘিরে জড়ো হন আরেকদল কবি। বাংলাদেশের কবিদের জন্য এটি ছিল এক অভূতপূর্ব সময়। দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তি কবিতার অনুরাগী, কবিযশপ্রার্থী। কাজেই কবিদের মধ্যে শুরু হলো এক ধরনের প্রতিযোগিতা, কীভাবে কবিতার মাধ্যমে তার নৈকট্য এবং আশীর্বাদ পাওয়া যায়।

দেশে সংবাদপত্রগুলোর ওপর তখন জারি রয়েছে কঠোর সেন্সরশীপ। কিন্তু তার মধ্যে নানা কথা, নানা গুজব ভেসে বেড়ায়।একটি গুজব ছিল, জেনারেল এরশাদের নামে ছাপা হওয়া এসব কবিতা আসলে লিখে দেন নামকরা ক’জন কবি। যদিও কারা ছিলেন সেইসব কবি, এ সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য কখনোই পাওয়া যায়নি।

আজকের পত্রিকা/সিফাত