হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ছবি : সংগৃহীত

কবি, সাবেক রাষ্ট্রপতি রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার জন্ম ১৯৩০ সালে উত্তরাঞ্চলীয়  জেলা রংপুরে। তাঁর পিতা ছিলেন একজন খ্যাতনামা আইনজীবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। স্কুলে পড়ার সময়েই তাঁর প্রথম কবিতা রচনার প্রয়াস। বাংলাদেশের প্রকৃতি আর মানুষ কবির সকল মুগ্ধতার মধ্যে একটি একান্ত নিস্বর্গের মতো জন্ম নিয়েছিলো সেই কৈশোর কালেই।

তার কবিতা ভাবনা ও কাব্য জীবনের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও ভালোবাসার বিষয়টি বিবেচনা করলে অনেকের মনে হতে পারে রাজনীতিবীদ কিংবা সেনাপ্রধান নয়, তার একান্ত তীব্র ইচ্ছে ছিলো কবি হওয়ার। মানব জীবনে এমনই লোভনীয় ‘কবি’ উপাধি। তাই তো জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি কবিতা ভালোবেসে এসেছেন। তার সেসব কাব্য সাধনার জন্যে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন।

কবি এরশাদের কবিতায় দেশের রুপ, সৌন্দর্য ও প্রকৃতির পাশাপাশি প্রেমের তীব্র আহ্বান লক্ষণীয়। তার একটি জনপ্রিয় কবিতা ‘প্রেমগীতি’। যেখানে কবি এরশাদ লিখেছেন- ‘ক্লান্ত বিকেলে অবশ পায়ে/ ঘুরেছি যখন এই পথে। শান্ত নদীর নিরব কিনারে/ দেখা হয়েছিলো তোমার সাথে।’ কবিতাটিতে তিনি প্রেমের তীব্র আহ্বানের কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ‘তোমার নয়নে নয়ন রাখিয়া/ বলেছিনু এসো প্রিয়া/ তাপিত হৃদয়ে ঝরনা ঝরাও/ প্রেমের অঞ্জলি দিয়া।’ এরকম বহু কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে কবি এরশাদের বাংলার রুপ, লাবণ্য, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেমের মতো বিষয়গুলো।

প্রেমিক ও কবি এরশাদের জীবনে বহু সংখ্যক প্রেম আসা সত্ত্বেও তারা কারো থেকেই চিরস্থায়ী মানসিক সঙ্গ তিনি ঠিকভাবে পাননি। এছাড়া রাজনৈতিক জীবনেও ছিলো নানা ব্যর্থতা। এসব নিয়ে তাকে বেশ নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে হয়েছে। তাই তো জাপার এক সভায় প্রস্থানরত স্ত্রী রওশনের হাত ধরে থামিয়ে তিনি তাকে শোনান তারই লেখা একটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তি- ‘নিঃসঙ্গ ধূসর বিশাল এক অন্ধকারে/ আমি জেগে আছি/ কোথায় উষার জ্যোতি/ কতদূর আলোর মৌমাছি?’ এবং তার স্ত্রীকে বলেন, রওশন তুমি আমার আলোর মৌমাছি।

নিঃসঙ্গ, প্রেমিক, কবি, রাজনীতিবীদ নিজেকে একজন প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমী এবং সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে লিখেছেন বেশ কিছু কবিতার বই। সেসব বইয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার লেখা কবিতা। চলুন পড়ে নেয়া যাক তার লেখা ‘হে সুধীবৃন্দ’ কবিতাটি-

সুধী, এমন সভায় প্রথম এলে/ আমার নিমন্ত্রণে;

হৃদয়টা তাই নাচলো সুখে/ এই মিলনের দিনে।

সবার প্রতি শ্রদ্ধা ছিলো গহীন হৃদয় তলে,

উজার করি দিলাম আজি/ খুশীর অশ্র জলে।

কাব্য আমার আপন জগৎ/ মনের মহারানী,

তার লাগিয়া বেঁধেছিনু/ ছোট্ট গৃহখানি।

সেই গৃহেতে বসত করে/ আমার ভালোবাসা

প্রেয়সীকে চিনিয়ে দিতে/ এই সভাতে আসা।

প্রিয়া আমার এমন প্রিয়া/ থাকে সংগোপনে

আপন ইচ্ছায় উঁকি মারে/ মনের বাতায়নে।

সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে/ আনি আপন ঘরে,

আলিঙ্গনে ধরা পড়ে/ আমার বাহুডোরে।

তারে নিয়েই জীবন আমার/ এই দেহের সে প্রাণ

সদাই যেনো গাইতে পারি/ জীবনের জয়গান।

কবিতার পাশাপাশি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সাহিত্যের অন্যান্য শাখা নিয়েও বই লিখেছেন। তবে কবিতার তার অপার প্রেম ছিলো। এখন অবধি তার লেখা ২৭টিরও বেশি বই বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে মাত্র ৪টি গদ্যগ্রন্থ বাকি সবই কবিতার বই। এসব কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘হে আমার দেশ’, ‘ঈদের কবিতা’, ‘বৈশাখের কবিতা’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘একুশের কবিতা’, ‘যে কবিতা সুর পেল’, ‘জীবন যখন যেমন’ ও ‘এক আকাশে সাত তারা’ ইত্যাদি। এছাড়া এরশাদের সকল কবিতা এক মলাটে পাঠকের হাতে পৌছে দিতে আকাশ প্রকাশনী থেকে প্রকাশ ‘এরশাদের কবিতাসমগ্র’ বইটি।

সব মিলিয়ে একজন রাজনীতিবীদ, স্বৈরশাসক, কবি, প্রেমিক যে পদ তিনি যখন ধারণ করেছেন, সে পদে তাকে নিয়ে বাংলার ভূখণ্ডে প্রচুর আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। সাহিত্যের প্রতি তার প্রবল অনুরাগও হয়তো পাঠকমনে জায়গা করে নেবে।  তাই ভালো-মন্দ মিলিয়ে তাকে নিয়ে জনমানুষের মধ্যে এক মিশ্র প্রকৃতির অবস্থান থাকলেও এরশাদ থেকে যাবেন এই বাংলায়। স্বৈরশাসক, রাজনীতিবীদ, প্রেমিক অথবা কবি হয়ে।

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/