সিফাত বিনতে ওয়াহিদ
সিনিয়র সাব-এডিটর

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে 'ক্যাপ্টেন' মাশরাফির অসম্ভব সাহসী এই ভ্রমণ ভুলে যাবার নয়। ছবি: সংগৃহীত

‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন! আওয়ার ফিয়্যারফুল ট্রিপ ইজ ডান’- ওয়াল্ট হুইটম্যানের বিখ্যাত কবিতা ‘ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন’র প্রথম এই লাইন পড়লে আমার সব সময় মনে পড়ে নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ের কৌশিকের কথা, মাশরাফি বিন মর্তুজা যার আরেক নাম। আমার কাছে সে শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়কই নন, বরং এক বিস্ময়, রূপকথারই অন্যতম এক সাহসী চরিত্র।

এক সময় বাংলাদেশের সবগুলো দৈনিকের শিরোনামে মাশরাফিকে ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ আখ্যায়িত করে ছাপা হতো বিশাল বিশাল খবর। এর বেশিরভাগই প্রশংসা আর স্তুতি বাক্যে ভরপুর, নিঃসন্দেহে তিনি নিজেকে সেই সম্মানের উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। এখন আর সেভাবে লেখা হয় না খুব একটা। আমি এখনো পত্রিকা পড়ার সময় দেখি তাঁর ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ নামটা খুঁজে পাওয়া যায় কী-না।

নিঃসন্দেহে তিনি নিজেকে সেই সম্মানের উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

সকল প্রয়োজনীয়তার আবশ্যিকতা কখনো না কখনো ফুরায়- এ অনুভূতি যন্ত্রণার, কিন্তু এটাই চিরন্তন সত্য। তবে কিছু কৃতজ্ঞতা ভুলে গেলে অকৃতজ্ঞের তকমা লাগিয়ে ঘুরতে হবে, অন্য কারো কাছে না হলেও, নিজের কাছে তো বটেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে মাশরাফি বিন মর্তুজা এমন এক কৃতজ্ঞতার নাম। বাংলাদেশের ক্রিকেটে ইনজুরি আর মাশরাফি বিন মুর্তজার নামটা অনেকটাই সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই একের পর এক ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি।

গত ১৫ বছরে ১১ বার ইনজুরিতে পড়েছেন মাশরাফি। যার মধ্যে বাঁ হাঁটুতে চারবার এবং ডান হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে তিনবার। টেস্ট অধিনায়কত্ব পাবার প্রথম দিনেই ইনজুরিতে পড়েছেন তিনি, ইনজুরির কারণে মিস করেছেন ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ। তবুও হাল ছাড়েননি, ছেড়ে দেননি খেলাও। নিজের জন্য না, খেলেছেন দেশের জন্য। অনুপ্রাণিত করেছেন টিমমেটদের ছাড়াও অগণিত ক্রিকেট প্রাণ তরুণ ভক্তকে। কিন্তু হাজার চোটেও যিনি খেলা ছেড়ে দেননি, তাঁকেই এবার খেলা ছাড়তে হচ্ছে।

টেস্ট অধিনায়কত্ব পাবার প্রথম দিনেই ইনজুরিতে পড়েছেন, ইনজুরির কারণে মিস করেছেন ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ। ছবি: সংগৃহীত

৩৫ পেরিয়ে ৩৬ এ পা দিচ্ছেন জাতীয় ক্রিকেট দলের এ অধিনায়ক। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই জানিয়েছিলেন, এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। ভারতের বিপক্ষে হারের পরই নিশ্চিত হয়েছে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবার বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ, সঙ্গে শেষ ম্যাচ মাশরাফিরও। সবাই তো আর সব সময় একই পারফরমেন্স ধরে খেলতে পারেন না, সেটা করতে গেলে অতিমানব হতে হবে। এই বিশ্বকাপে হয়তো তাই তাঁকে কিছুটা অনুজ্জ্বল দেখা গিয়েছে, কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দেওয়া তাঁর সমস্ত ত্যাগ মলিন হতে পারে?

অনুপ্রাণিত করেছেন টিমমেটদের ছাড়াও অগণিত ক্রিকেট প্রাণ তরুণ ভক্তকে। ছবি: সংগৃহীত

বহুবার আঘাতে জর্জরিত ভাঙা পাঁ নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের একটি আন্ডারডগ মনে করা দলকে বিশ্বমঞ্চের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে পরিণত করায় মাশরাফির কি কোনো অবদান নেই? মাশরাফি আর দলকে আগের মতো ব্যক্তিগত পারফরমেন্স দেখাতে পারছেন না, সে কারণে কি আমরা ভুলে যাবো আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে প্রথম রান দেওয়ার আগেই মাশরাফি তুলে নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তাঁর প্রথম উইকেটটা?

নাকি ভুলে যাবো ২০০৭ সালের বিশ্বকাপের কথা? ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে নামার আগে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর ছিল তাঁর, কলার উঁচু করে ওই ম্যাচে সেই চিরচেনা রান-আপে শেবাগকে ঠিকই বোল্ড করেন তিনি, গুণে গুণে নেন আরও চারটি উইকেট। সেই ম্যাচটা পাঁচ উইকেটে জিতেছিলো বাংলাদেশ।

আমরা হয়তো ক্রিকেট মাঠে আর দেখতে পাবো না মাশরাফিকে। মাঠে উপস্থিত থেকে মাশরাফিও হয়তো আর কাঁধে হাত রেখে অথবা ড্রেসিংরুম থেকে বুকে আঙুল দেখিয়ে সতীর্থদের বলবে না সাহস রেখে খেলতে। তবে মাশরাফি বিন মর্তুজার শুভকামনা এবং তাঁর ভালোবাসার অদৃশ্য হাতটা সতীর্থদের কাঁধে ঠিকই থাকবে সব সময়।

তাঁর ভালোবাসার অদৃশ্য হাতটা সতীর্থদের কাঁধে ঠিকই থাকবে সব সময়। ছবি: সংগৃহীত

জীবনের অনেক ভ্রমণের কথা হয়তো অন্য আরও অনেক ভ্রমণের ভিড়ে আমরা ভুলে যাই। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের দুঃসময় বা ফিয়্যারফুল ট্রিপটা হয়তো কাটিয়ে উঠেছে, বিশ্বের শক্তিশালী দলগুলো এখন তাদের সমীহ করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ‘ক্যাপ্টেন’ মাশরাফি বিন মর্তুজার অসম্ভব সাহসী এই ভ্রমণ তো ভুলে যাবার নয়, শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখার…

লেখক: সিনিয়র সাব এডিটর, আজকের পত্রিকা

আজকের পত্রিকা/সিফাত