রাজধানীর অলি-গলিতে কোচিং শিক্ষার নামে চলছে সাইনবোর্ড টানানো। ছবি : সংগৃহীত

২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই আবারও শুরু হয়েছে কোচিং বাণিজ্য। ২ ফেব্রুয়ারি এ পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ হয় ১০ মার্চ। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ২৭ জানুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেয় সরকার।

এই নির্দেশনা এবং ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ উপেক্ষা করে নিজেদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে কোচিং সেন্টারের মালিকরা। সরকারের অভিযানও স্থগিত রয়েছে। ফলে কোচিং সেন্টারের মালিকরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত তিন দিন রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে এ চিত্র পাওয়া যায়। কোচিং শেষে বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে বের হচ্ছেন। একসঙ্গে কোনো বাড়ি থেকে ১৫-২০ জন ছাত্রছাত্রী বের হচ্ছে এমন চিত্রও দেখা গেছে কোথাও কোথাও।

এ নিয়ে অভিভাবক-শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ, সরকারি প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্তরে নানা রকম সমালোচনা শুরু হওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশব্যাপী অবৈধ কোচিং কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান পরিচালনা করে।অভিযানে শতাধিক কোচিং সেন্টারের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। বর্তমানে কোচিং সেন্টার বিরোধী অভিযান নেই বললেই চলে।

প্রক্যাশ্যে এভাবে চলছে কোচিং বাণিজ্যের প্রচারনা। ছবি : সংগৃহীত

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ৮ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে ৫০০ নম্বর উত্তর শাহজাহানপুর বাসা থেকে ১০ থেকে ১৫ জন অভিভাবক সন্তানদের নিয়ে বের হচ্ছেন। এর আধা ঘণ্টা আগে ৫০১ নং বাসা থেকে সস্তানদের নিয়ে বের হন ১৫ থেকে ২০ জন অভিভাবক। আবার কোনো কোনো শিক্ষা বোর্ডের নাম ব্যবহার করেও কোচিং বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছেন কেউ কেউ। শাহজাহানপুরের একটি বাড়িতে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘ইংলিশ কোচিং বাই প্রফেসর মো. মুজিবুর রহমান, হেড এগজামিনার, ঢাকা বোর্ড।’

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক গোলাম সামদানী বলেন, ‘আমার ছেলের রোল ২০ জনের মধ্যে। নিশ্চয়ই সে খারাপ ছাত্র নয়। কিন্তু বিভিন্ন সিটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৫০ নম্বরের পরীক্ষায় সে মাত্র ২০/২২ নম্বর পায়’। তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে বাধ্য হয়েই শ্রেণী শিক্ষকদের বাসায় প্রাইভেট কোচিংয়ে ভর্তি করাই। এখন দেখা যাচ্ছে, কোচিংয়ে ঠিকভাবে পড়ানো হচ্ছে না, বাসাই পড়াতে হচ্ছে, কিন্তু সিটি পরীক্ষায় এখন ৫০ নম্বরের মধ্যে ৪৮/৪৯ নম্বর পাচ্ছে। এই শিক্ষকের কাছে পড়াতে মাসে এখন গুণতে হচ্ছে সাত হাজার টাকা।’

কোচিং সেন্টার মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ কোচিং অ্যাসোসিয়েশন’র মতে সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রায় এক লাখ কোচিং সেন্টার রয়েছে। এগুলোর প্রতিটির সঙ্গে গড়ে ১০/১৫ জন স্থানীয় যুবক ও ব্যক্তি জড়িত। জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে গত অক্টোবর পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোচিং সেন্টারের একটি তালিকা দেওয়া হয়। এই তালিকা অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতেই কোচিং সেন্টার রয়েছে ৪৮৮টি। এরমধ্যে রমনা এলাকায় ৪৬টি, লালবাগে ৫১টি, মতিঝিলে ৯৬টি, ওয়ারিতে ৫২টি, গুলশানে ২০টি, তেজগাঁওয়ে ৬৪টি, মিরপুরে ৮৮টি এবং উত্তরা এলাকায় ৩১টি কোচিং সেন্টার রয়েছে।

এ বিষয়ে ভিকারুননেসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান ক্যাম্পাসের বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ফারহানা খানম বলেন, ‘মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শ্রেণীর অভিভাবক শিক্ষকদের কোচিং করানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন।’ ওই অভিভাবকরা চান স্কুলের শিক্ষকরা কোচিংয়ে না পড়াক, যাতে ছাত্রছাত্রীরা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়, কিন্তু সানরাইজ, ই-হক, উদ্ভাস- এই জাতীয় কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছেন না ওইসব অভিভাবক বলে ফারহানা জানান। তিনি আরও জানান, ‘উদ্ভাস’র নামে রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল, খিলগাঁও, ফার্মগেট, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় শাখা খুলে কোচিং বাণিজ্য চলছে। কিন্তু সরকার ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

 

কোচিং বাণিজ্যের এলাকায় পুলিশের অভিযান। ছবি : সংগৃহীতং

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘আমরা সব ধরনের কোচিং বাণিজ্যই বন্ধ দেখতে চাই’। যারা ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কোচিং সেন্টার খুলে শিক্ষা বাণিজ্য করছে এবং যারা সরকারের বেতন ভাতা নিয়ে শ্রেণীকক্ষে পাঠদান না করে ছেলে মেয়েদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি করেন তিনি।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান বলেছেন, ‘সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষকরা কোচিং কার্যক্রম এমনিতেই কমিয়ে দিয়েছেন এটা আমি শুনেছি। আর এমপিওভুক্ত ও অন্যান্য বেসরকারি হাইস্কুলের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে আমাদের তেমন কিছু করার নেই। এটা পুরোটাই শিক্ষামন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব।’

এ বিষয়ে ১৩ মার্চ সাভারের আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইউনির্ভাসিটির অষ্টম সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. দিপু মনি বলেছেন, ‘কোচিং বাণিজ্য চিহ্নিত করে সেটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’। কোচিং সেন্টার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কথা হচ্ছে। তথ্য পেয়েছি প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টার সঙ্গে অনেক সময় অনেক কোচিং সেন্টারকে জড়িত থাকতে দেখা গেছে’। তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে শিক্ষামন্ত্রী জানান।

আজকের পত্রিকা/আরবি/সিফাত