আমি এরিকের মা হয়েও তাকে কোনো সেবা-শুশ্রুষা করতে পারছি না। ছবি: সংগৃহীত

সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং সেনা প্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে নিয়ে আবারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী বিদিশা এরশাদ। ‘এরশাদের সেকাল-একাল’ শিরোনামের আবেগঘন ওই স্ট্যাটাসে বিদিশা এরশাদের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের ইতিহাস উল্লেখ করেন। এছাড়া বর্তমানে তাঁর (এরশাদের) এই নিঃসঙ্গ জীবন যাপন নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদিশা।

এরশাদকে বিভিন্ন সময় তাঁর পরিবার এবং নিজ রাজনৈতিক দলের সদস্যরা ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছেন উল্লেখ করে বিদিশা আরও জানান, এই দুঃসময়ে এক সময়ের রাষ্ট্রনায়কের পাশে তাদের কেউই অবস্থান করছেন না। এক সময়ের এই প্রতাপশালী ব্যক্তিকে বিছানায় সারতে প্রয়োজনীয় সব কর্ম। বিদিশা জানিয়েছেন, এরশাদের পাশে নেই তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যও।

পাঠকদের জন্য বিদিশার ওই স্ট্যাটাসটি হুবুহু তুলে দেওয়া হলো-

‘এক সময়কার প্রভাবশালী রাষ্ট্রপতি যিনি দীর্ঘ নয় বছর বাংলাদেশকে শাসন করেছেন। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ তথা অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নের জন্য যিনি লড়াই করেছেন তিনি আজকে একা নিঃসঙ্গ ভাবে জীবন যাপন করছেন তার বাড়িতে এবং ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সি এম এইচ)। অত্যন্ত দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে, যে মানুষটিকে ঘিরে তার পরিবার তার রাজনৈতিক দলীয় সদস্যরা যে সুবিধাটুকু নিয়েছেন, তার এই দুঃসময়ে তার পাশে থাকার মতো আজকে কেউ নেই। এখন তার সকাল-সন্ধ্যা একাকীত্ব ভাবে কেটে যাচ্ছে। জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন দলীয় মতামতের উপর ভিত্তি করে এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে।

আজকে জীবন সায়াহ্নে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তার পাশে তার দলীয় নেতা কর্মীরাও নেই। এমনকি তার পরিবারের কোন সদস্যও নেই। এই অসুস্থ সময়ে হয়তো বা তিনি মনে মনে ভাবেন যে আজকে আমার পাশে যদি পরিবারের কোন সদস্য থাকতো তাহলে হয়তো বা তাদের কাছে জীবনের সুখ-দুঃখ, জীবনের শেষ সময়ের কিছু কথা তাদের কাছে বলতে পারতেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, অসুস্থতার এই রকম এক পর্যায়ে তাকে নিয়ে গেছে যে, এখন তাকে তার বিছানাতে প্রয়োজনীয় কাজ-কর্মগুলো সারাতে হচ্ছে। পাশে তার বিশ্বস্ত কয়েকজন গৃহকর্মী ছাড়া আর কেউ বলার মতো নেই। যে মানুষটিকে ব্যবহার করে মানুষ ক্ষমতার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তারাই আজ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সবার অপেক্ষা সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব কখন চোখ বন্ধ করবেন এবং তার অবশিষ্ট সম্পদ কে কখন কীভাবে আত্মসাৎ করবেন সেই অপেক্ষায় আছেন।

আসলে আমি বাংলাদেশের সমস্ত জাতীয় পার্টির এবং অনান্যে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে বলতে চাই, আপনারা যে যেখানে যে অবস্থানে আছেন, আপনারা আপনাদের জনপ্রিয় দলের প্রধানের জন্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, প্যাগোডা, গীর্জা সব জায়গায় প্রার্থনা করুন আল্লাহ রব্বুল আলামীন যাতে তাকে দীর্ঘ হায়াত দান করেন। উনি সুস্থ হয়ে যেন আবার দেশ ও দশের খেদমত করতে পারেন এবং রাষ্ট্রের জন্য কথা বলতে পারেন, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কথা বলতে পারেন, দলের জন্য কথা বলতে পারেন, মানুষের দুঃখ দূরদর্শিতা নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন এই আশা সবার কাছে ব্যক্ত করছি।

আমিও নিজেকে দূরভাগ্যবান হিসেবে মনে করছি এই জন্য যে আমি এরিকের মা হয়েও তাকে কোনো সেবা-শুশ্রুষা করতে পারছি না। এক দিকে আমার সন্তান অবহেলায় অনাদরে বড় হচ্ছে, আরেক দিকে সন্তানের বাবা বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে। এই দুই জনের কথা ভেবে ভেবে আমার দিন কেটে যায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমীনের কাছে আমার প্রার্থনা এটাই থাকবে তিনি যেন আমার সন্তান ও স্বামীকে সুস্থ করে দেন এবং আমাদের মাঝে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখেন।’