ডা. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও তাঁর ‘অচিনপুরি’ দলের সদস্যরা। ছবি আজকের পত্রিকা

পেশায় তিনি একজন চোখের ডাক্তার। কিন্তু গানের নেশায় বুদ হয়ে আছেন! রোগী দেখার ভিড় শেষে সময় পেলেই তিনি গান গাইতে বসেন। আর এ জন্য তিনি তার চেম্বারের পাশে তৈরি করেছেন একটি সুন্দর স্টুডিও। যেখানে তিনি তার ‘অচিনপুরি’ দলের সদস্যদের নিয়ে গানের রেওয়াজ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজের সাথেও নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। নাম তার ডা. মোহাম্মাদ জহিরুল ইসলাম। তিনি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউড অব অপথ্যালমোলোজি হসপিটালে রোগী দেখেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত আছেন কয়েক বছর ধরে। এছাড়াও খণ্ডকালীন বসেন ভিশন আই হসপিটালে। তিনি জন্মেছেন পূণ্যভূমি সিলেটে। আজকের পত্রিকা খুঁজে বের করে এই গুণী ডাক্তার শিল্পীকে। কথা হয় তার সাথে, ডাক্তারি পেশার মতো একটি চ্যালেঞ্জিং পেশার সাথে জড়িত থাকার পরেও কীভাবে সাংস্কৃতিক চর্চা করে যাচ্ছেন দলগতভাবে। বানাচ্ছেন বিভিন্ন গানের ভিডিও। কথা হয় শিল্পের প্রতি অতিপাগল এক যুবকের ডাক্তার হয়ে ওঠার গল্প। চলুন তাহলে পড়া যাক সংস্কৃতিমনা ডাক্তারের গল্প…

ছোটবেলা থেকেই কী গান শেখেছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ’আমি ছোট বেলা থেকেই সংগীতের প্রতি খুব দুর্বল ছিলাম। গান আমার রক্তে প্রবাহিত হয়। আমি সব সময় কেমন যেন একটা সুরের মধ্যে থাকতাম। আমার বাবা এক মুরশিদের ভক্ত ছিলেন। বাবা নিজে গান লিখতেন এবং একতারা বাজিয়ে গুন গুন করে গান গাইতেন। বাবার কাছে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতেন। তাদের সাথে বসে এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। আর গান করতেন। সংসারের প্রতি বাবা অনেকটা উদাসীন ছিলেন। আমার মা, নানা বাড়ির সহায়তায় আমাদের সংসারটা গুছিয়ে রাখতেন।

সংসারে একটা অভাব ছিল। আমার চিন্তা ছিল সংসারের অভাব গোছতে হবে আর সে জন্য আমাকে পড়াশোনা করতে হবে। আমি ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা করাতাম, পাশাপাশি গানের চর্চাও করতাম। গানের চর্চাটা শুরু করি আমার চাচার সহায়তায়। তিনি সাতক কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তার সহায়তায় সাতক সিমেন্ট স্কুলে ভর্তি হই। সেখানে মরমি সাধক শাহ দুরবিন শাহের আস্তানা ছিল। জায়গাটার নাম ছিল দুরবিন টিলা। আমরা স্কুলের পর সেই টিলায় যেতাম গান শুনতে। সেই তাড়নায় আমি ‘কনকচাপা খেলাঘর’ আসর নামে একটি একাডেমিতে ভর্তি হই এবং তাদের সাথে কোরাস গাই।’

মেডিকেলে মোটামোটা বই পড়ার পাশাপাশি গারেন চর্চা কীভাবে করা হতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন সিদ্ধান্ত নেই আমাকে ডাক্তার হতে হব। তখন আমি সিলেট শহরে চলে আসি। সিলেটে এসে একটি ম্যাগাজিন বের করি। নিজের লেখা কবিতাসহ শহরের বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে কবিতা, গল্প সংগ্রহ করে ‘উল্লাস’ নামের একটি দেয়াল পত্রিকা বের করি। শফিউদ্দিন আহমেদ নামে এক স্যার ছিলেন আমার। তার কাছে আমি কবিতা দেখাতাম। তার উপদেশে বিভিন্ন লেখকদের বই পড়তাম আর গান শুনতাম। গান শুনাটা আমার এমন একটা অভ্যাস ছিল যে, বই পড়াকালীনও আমি গান শোনতাম।’

এরপর আমি যখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম তখন আমি গানের একটি একাডেমিতে ভর্তি হলাম। কিন্তু মেডিকেলে পড়ার চাপের কারণে সেটা ধারাবাহিকভাবে করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। বাংলাদেশ বেতারের সিলেট শাখার বাদক শিল্পীদের আমি আমার হোস্টেলে নিয়ে আসতাম। তারা বাজাতেন আমি গাইতাম। তারপরও সংগীতের প্রতি নেশাটা আমার পূর্ণতা পাচ্ছিল না। আমি প্রতি বৃহস্পতিবার আমার গ্রামের বাড়ি চলে যেতাম। সিলেটের জনপ্রিয় বাউল কারি আমিনউদ্দিনের একজন সাগরেদের সাথে আমি ভাব জমাই। রাতে বসতাম তার সাথে গান গাইতে। গান করতে করতে রাত একটা বেজে যেত। এত রাতে কোথেকে আসছিস প্রশ্ন করলে, মাকে বলতাম, হোস্টেল থেকে আসছি, ভাত দাও। আমি কোনো গুরুর কাছে গান শিখিনি। তবে গানের জন্য আমি খুব কষ্ট করেছি।

এরপর এই সংস্কৃতিমনা মানুষের জীবনে আসে পরিবর্তন। তিনি কিছুটা ধর্মীয় কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাবলিগ জামাতের সাথেও জড়িত ছিলেন বলে তিনি জানান। তাবলিগের সাথে থেকে তার জীবনে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় জীবন থেকে আমি সব ধরনের পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপখাইয়ে নিতে শিখেছি। ধর্মে গান-বাজনা করা নিষেধ থাকলেও আমি কিন্তু গোপনে গান চর্চা করে যেতাম। গান বাজনা মানেই খারাপ কিছু না। আপনি বই পড়ার মাধ্যমে নিজেকে আত্মশুদ্ধি করতে পারেন। জ্ঞানী ব্যক্তিদের অনুসরণ করে তাদের কথা মতো চলেও করতে পারেন।’

বিনয়ের সাথে নিজের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি কথাগুলো বলতে বলতে মৃদুস্বরে তিনি বলেন, ‘আমি হাসন রাজার একনিষ্ঠ ভক্ত। আমি একজন চিকিৎসক, আমার একটা সামাজিক অবস্থান আছে। এত কিছুর পরও আমাকে পরকালে যেতে হবে। নিজের কাজের হিসেব দিতে হবে। তাই আমি আমার ভেতরের কথাগুলো আমার গানে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর সে জন্য আমি আমার কর্মপরিবেশে গানের একটি পরিবেশে তৈরি করে নিয়েছি।’

আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি এমন আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমি সিলেটের মানুষ। সিলেটের প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যারা আছেন, আমি আন্তরিকভাবে তাদের বলতে চাই। আসুন আমরা সকলে মিলে একসাথে কাজ করি। আমাদের অগ্রজ যারা আছেন তাদের দেখানো পথে বাংলা সংস্কৃতিকে আরো একটু এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। আর হ্যাঁ, আমি আনন্দের সাথে জানাতে চাই। আমি গান করছি। আমার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন।’

চলুন শোনাযাক তার কন্ঠে অসাধারণ একটি গান…

আজকের পত্রিকা/জেবি