শিল্পী শাহাবুদ্দীন আহমেদের চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিক্স।

১.

গভীর রাতে এক হিন্দুপ্রধান গ্রামে হামলা করলো পাক আর্মি। গুলি আর আগুন দিয়ে তছনছ করে দিলো গ্রামটাকে।সবাই পালাচ্ছে।পাশেই বিশাল নদী।যদি নৌকা দিয়ে কোনোমতে পার হওয়া যায় নদীটা তবেই জানে বাঁচা যেতে পারে।রাতের অন্ধকারে সবাই ছুটছে নদীর দিকে।রমাকান্ত তার স্ত্রী আর ছেলে-মেয়ে নিয়ে ছুটছেন।মেয়েটি কোলে ছেলেটির হাত ধরে রেখেছেন মা।হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়লেন মা। কী হলো? রমাকান্ত হতভম্ব।আমার গুলি লেগেছে।কোনোমতে বললেন স্ত্রী সুধা।বুকের কাপড় থিক থিক করছে রক্তে।তুমি ওদের নিয়ে পালাও কোনোমতে বললেন স্ত্রী।রমাকান্ত দেরি করলেন না ছেলে-মেয়ের হাত ধরে ছুটছেন।নদীর ঘাটে নৌকা বেশি ছিলো না।সবাই হুড়োহুড়ি করে উঠছে। একটায় কোনোমতে উঠলেন রমাকান্ত। শক্ত করে ধরে রেখেছেন ছেলে-মেয়েকে।নদীটা পার হতে পারলে হয়।

নৌকা চলতে শুরু করলো।মাঝ নদীতে হঠাৎ মর্টারের শেল আঘাত আনল নৌকায়, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল নৌকাটা।রমাকান্ত ছেলে আর মেয়ে নিয়ে ডুবে গেলেন উত্তাল নদীতে। দু’হাতে দু’জনকে ধরে রেখে কোনোমতে ভেসে থাকার চেষ্টা করলেন।কিন্তু তিনি পারছেন না। যে কোনো একজনকে ছেড়ে দিলে হয়তো বেঁচে যেতে পারেন। কিন্তু কাকে ছাড়বেন ছেলেকে না মেয়েকে দ্রুত চিন্তা চলছে তার মাথায়। তিনি অন্ধকারে  রাতে নদী আর চোখের পানি এক করে মেয়েটাকে ছেড়ে দিলেন। তিনি কী ভেবে ছেড়ে দিলেন মেয়েটিকে? হয়তো ভেবেছেন মেয়ে একদিন চলে যাবে পরের ঘরে ছেলেটাই থাক। শেষ বয়সে বাবাকে দেখবে এমন টাই..? মেয়েটি ভেসে গেল। তিনি ছেলেটি এক হাতে ধরে উত্তাল নদী সাতরে কোনোমতে অন্যপাড়ে উঠে এলেন।আর আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলেন তিনি ডান হাতে ধরে আছেন মেয়েটিকে।তিনি রাতের অন্ধকারে ছেলেটিকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, বুঝতে পারেননি।

শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ ও আয়েশা ফয়েজের সঙ্গে পুরো পরিবার। ছবি : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সৌজন্যে প্রাপ্ত

২.

তরুণ ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায়।বাবার মন সায় দেয় না।তার চুপচাপ ঘরোয়া ছেলেটি কি পারবে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধ করতে? কিন্তু বাবা জানেন না ছেলেটি গোপনে ঢাকায়। গেরিলাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একের পর এক অপারেশন করে চলছে।ছেলে যে গভীর রাতে স্টেনগান লুকিয়ে রাখে ঘরে, সেটাও তিনি জানেন না। বাবা কেন, তাদের বাসার কেউই জানেন না তাদের বড় ছেলে ভয়ঙ্কর মুক্তিযোদ্ধা। চলছিল ভালোই। কিন্তু হঠাৎ একদিন ছেলের দুই বন্ধু এলো তার খোঁজে। মা চেনেন তাদের।খুশিও হলেন তাদের দেখে কত দিন পর এলো তারা। দুপুরে খেতেও দিলেন তাদের। খেয়ে দেয়ে ফিরেও গেলেনও তারা হাসি মুখে। বলে গেলেন, খালাম্মা পারভেজকে বলার দরকার নেই আমরা এসেছিলাম।আমরা আবার আসবো সহজ সরল মা বুঝতেই পারলো না তারা আলবদর। পরের দিন বাসায় পাক আর্মি আসে। ধরে নিয়ে যায় পারভেজকে। সে আর ফেরেনি কোনো দিন।

লেখক : আহসান হাবীব, লেখক, কার্টুনিস্ট

আহসান হাবীবের ছবি তুলেছেন: তানভীর আল হোসেন

অাজকের পত্রিকা/এমএইচএস