‘লেখালেখি বন্ধ হলে আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে পড়বে, আমি বাঁচতে পারবো না।’- একজন লেখকের সমস্ত অনুভূতি জুড়েই থাকে তার লেখালেখির দুনিয়া। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও তেমনই ছিলেন, এ জন্যই হয়তো নিজের সম্পর্কে সব সময় তিনি এ কথাই বলতেন। মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও তিনি লেখা থামাননি। নিউইয়র্কে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও লিখেছেন নিজের শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’।

১৩ নভেম্বর বুধবার নন্দিত এই কথাসাহিত্যিকের ৭১তম জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের এ দিন তিনি নেত্রকোনার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। অসম্ভব সৃষ্টিশীল এই মানুষটির পদচারণা ছিল শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনেই। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্ম বলতে প্রধানত বোঝায় তার বিরচিত গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, গোয়েন্দা কাহিনী, আত্মজীবনীমূলক উপাখ্যান, ভ্রমণ কাহিনী, অনুবাদ, কবিতা, সঙ্গীত এবং চিত্রকর্ম। পরিচালক হিসাবে তিনি যে সকল নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সেগুলোও তার সৃষ্টি কর্মের অন্তর্ভুক্ত।

বাংলা কথাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একজন ব্যতিক্রমী লেখক। রচনার ব্যাপ্তি, বিষয়ের বৈচিত্র্য, চরিত্র নির্মাণ, রচনাশৈলী, সংলাপ প্রভৃতি মিলিয়ে তিনি এক অভিনব ধারা সৃষ্টি করেন, যা একান্তই তার নিজস্ব শৈলী হিসেবে স্বীকৃত। উপস্থিত বুদ্ধিজাত প্রকাশ ও রসবোধের কারণে তার রচনা সহজেই পাঠকের চিত্ত স্পর্শ করে। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের গতানুগতিক ধারাকে অতিক্রম করে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন এক স্বতন্ত্র ভুবন। একজন সফল লেখক হিসেবে সাহিত্য-শিল্পের বিভিন্ন শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরণ তাকে এনে দেয় বিপুল জনপ্রিয়তা। বহুমাত্রিকতা তার রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।

ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন এবং নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিমার রসায়ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন।

পারিবারিক পরিমন্ডলে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অনুকূল আবহে হুমায়ূন আহমেদের শৈশব জীবন অতিবাহিত হয়। তাঁর পিতার সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল। তিনি সমকালীন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতেন। বগুড়ায় অবস্থানকালে ‘দীপ নেভা যার ঘরে’ শিরোনামে তাঁর একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সন্তানদেরও তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার জন্য উৎসাহ দিতেন। হুমায়ূনের অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। তিনি মূলত শিশু-কিশোরদের জন্য কল্পবিজ্ঞান গল্প ও কাহিনী রচনা করেন। তার সবচেয়ে ছোট ভাই আহসান হাবীব রম্যলেখক ও কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’-এর সম্পাদক। তাঁদের মা আয়েশা ফয়েজও লেখালেখি করতেন। ‘জীবন যে রকম’ শিরোনামে তার একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে।

শৈশবে হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান। তাঁর একটি লেখা থেকে জানা যায়, তাঁদের পিতা ছেলেমেয়েদের নাম পরিবর্তন করতেন। তাই তিনি নিজেই পুত্রের আগের নাম পরিবর্তন করে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে হুমায়ূন ছিলেন সবার বড়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাকে আটক করে এবং নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। নিজের রচিত প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে এ ঘটনার আলোকপাত করেন তিনি। সত্তর দশকের এই সময় থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই কালপর্বে তার গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। তার সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি ও শুভ্র চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে।

বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার গল্প হুমায়ূন আহমেদ তুলে ধরেন সহজ সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। ব্যক্তি-মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আবেগ-অভিমান, হতাশা-বঞ্চনা, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আর অন্যদিকে সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত- সবকিছুই অসাধারণ নৈপূণ্য প্রতিভাত তার রচনায়। ব্যক্তিজীবনের নিতান্ত সাদামাটা ঘটনা থেকে শুরু করে পারিবারিক জীবনের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গ, মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের চিত্র সুনিপুণভাবে উঠে আসে তার গল্প-উপন্যাস ও নাটকে। ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্র অবলম্বনে লেখা উপন্যাসেও তিনি অত্যন্ত পটু।মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প-উপন্যাসে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বেদনা প্রবলভাবে ফুটে ওঠেছে, যা সমগ্র জাতির দুঃখ, বেদনা ও সংগ্রামের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখকের বর্ণনার কৌশলে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অতিপ্রাকৃত ঘটনাবলি তিনি উপস্থাপন করেন বাস্তবতার আবরণে, যা পাঠক সানন্দে গ্রহণ করে। তার শিশুতোষ রচনা নির্মল আনন্দের পরিবেশ তৈরি করে। ভূতের গল্পগুলো আকর্ষণীয় এবং রোমাঞ্চকর।

হুমায়ূন আহমেদের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য চরিত্র নির্মাণ। তার গল্প-উপন্যাস-নাটকের চরিত্রদের প্রায় সকলেই যেন পরিচিত মানুষ। পারিপার্শ্বিকতার অতি চেনা সাদামাটা মানুষ থেকে শুরু করে খেয়ালি, মনস্তাত্ত্বিক- সব ধরনের চরিত্রের সমাবেশ ঘটান তিনি। কিছু চরিত্র আছে প্রতীকী, এদের কেউ কেউ খ্যাপা, পাগলাটে। তার কল্পনাশক্তি এক একটি চরিত্রকে পাঠকের অন্তরে ঠাঁই করে দেয়। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, বাকের ভাই – এরা এই শ্রেণির চরিত্র। এদের মধ্যে আছে প্রগাঢ় মানবিক মূল্যবোধ ও বৈশিষ্ট্য। হিমু বেকার যুবকের প্রতিভূ একটি খেয়ালি চরিত্র। হলুদ জামা পরে, খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়, কথাবার্তা ও চিন্তাভাবনায় কিছুটা উদ্ভট, যুক্তি মানে না। তবে সে সৎ ও বিবেকবান। কখনো মিথ্যা কথা বলে না, কারো ক্ষতি করে না; বরঞ্চ মানুষের উপকার করতে ভালোবাসে। হিমুর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ও প্রবল চেতনাবোধ কাজ করে। হিমু বিশ্বাস করে, সব মানুষের মধ্যেই একটা ইতিবাচক দিক থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সকল অন্ধকারের মধ্যেও মানুষের শুভবোধেরই জয় হয়। প্রকারান্তরে এটা লেখকেরই অন্তর্নিহিত জীবনদর্শন।

অন্যদিকে মিসির আলি একজন যুক্তিবাদী মনস্তত্ত্ববিদ, যিনি আবেগের চেয়ে যুক্তিকে প্রাধান্য দেন এবং চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও যুক্তি দিয়ে। মিসির আলি সত্যসন্ধানী এবং ভালো মানুষ। হিমু ও মিসির আলি যেন লেখকেরই দুই সত্তা। শুভ্র চরিত্রটিও বিবেকী মানুষেরই প্রতিভূ। ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ‘বাকের ভাই’ চরিত্রটি প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে । একটি নাটক ও তার চরিত্র কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও জীবনধর্মী হলে দর্শক এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে, তা একমাত্র হুমায়ূন আহমেদের নাটকেই প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। এ ঘটনা আমাদের সামাজিক অবক্ষয় এবং তার বিপরীতে বিবেকবানদের প্রতিবাদের প্রতীকী চিত্র।

অধিকাংশ নাটকেই হুমায়ূন সমাজের বিরাজমান অন্যায়, অবিচার ও সামাজিক অসঙ্গতিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। চরিত্রচিত্রণের ভিতর দিয়ে প্রকাশ পায় লেখকের সুগভীর জীবনবোধ। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে স্বাধীনতা-বিরোধী রাজাকারদের প্রতি তার ঘৃণা অবশ্যই ছিল। একজন সাহিত্যিক হয়ে তা তিনি সরাসরি ব্যক্ত না করে, নাটকের মাধ্যমে বার্তাটি টিয়া পাখির মুখ দিয়ে এভাবে প্রকাশ করেন- ‘তুই রাজাকার’। মাত্র দুটি শব্দের মধ্য দিয়ে রাজাকারদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের এই অভিব্যক্তি অসাধারণ।

বাংলাদেশের লোকায়ত জীবন ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি গুণী এই লেখকের অনুরাগ ছিল গভীর। এই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে তার গল্প-উপন্যাস-নাটক, আবহ ও চরিত্র নির্মাণে। নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সমাজজীবনের প্রেক্ষাপট নানাভাবে এসেছে তার রচনায়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল জমিদার চরিত্র তার অধিকাংশ নাটকের প্রধান কুশীলব হয়ে ওঠে। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা বিশেষ ব্যঞ্জনা পায় নাটকগুলোতে। এ ছাড়া তার মনোজগতে অধ্যাত্মচেতনাও প্রবল ছিল। এ কারণেই হয়ত তার রচনায় বাউল, ফকির ও সাধক শ্রেণির মানুষের বিচরণ লক্ষণীয়।

কাহিনী বলার ধরন, বিষয়ের বৈচিত্র্য, বর্ণনায় পরিমিতিবোধ, নাটকীয় চমক সৃষ্টি, ভিন্নধর্মী চরিত্র নির্মাণ, প্রাঞ্জল ভাষা প্রয়োগ হুমায়ূন আহমেদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সংলাপ রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত ও কালজয়ী। তিনি নিজের মতো করে সাহিত্যের ভাষা ও সংলাপ তৈরি করেন, যা পাঠককে আকৃষ্ট করে।

পরিচালক হিসেবে হুমায়ূনের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো সর্ব সাধারণ্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ১৯৯৪ সালে তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি লাভ করে। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ আটটি পুরস্কার লাভ করে। তার নির্মিত অন্যান্য সমাদৃত চলচ্চিত্রগুলো হলো ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্যামল ছায়া’ এবং ‘ঘেটু পুত্র কমলা’।

শ্যামল ছায়া ও ঘেটু পুত্র কমলা চলচ্চিত্র দুটি বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের জন্য দাখিল করা হয়েছিল। এছাড়া ঘেটু পুত্র কমলা চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য হুমায়ূন আহমেদ শ্রেষ্ঠ পরিচালনা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

হুমায়ূন আহমেদের বহুমাত্রিক সৃজনকর্মের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় সংগীত। তিনি কেবল নিজের নাটক ও চলচ্চিত্রের জন্য গান রচনা করেছেন। স্বল্পসংখ্যক গান রচনা করলেও এসব গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং অ্যালবাম আকারে প্রকাশিত হয়। উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’, ‘আমি আজ ভেজাব চোখ সমুদ্রের জলে’, ‘চাঁদনি পসর রাতে যেন আমার মরণ হয়’, ‘আমার আছে জল’, ‘মনে বড় আশা ছিল’ প্রভৃতি। তার রচিত শেষ গান ‘ঠিকানা আমার নোট বুকে আছে/নোট বুক নেই কাছে।’ মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ গানটি রচনা করেন তার চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিতব্য ‘যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন’ টেলিছবির জন্য। হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের লোকসংগীতকেও সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন নাটকে ও চলচ্চিত্রে। রবীন্দ্রসংগীত থেকে আরম্ভ করে হাছন রাজা, লালন শাহ ও অন্যান্য লোকশিল্পীর গান এমন কী লোকশিল্পীকে তিনি অনায়াসে ব্যবহার করেছেন তার নাটকে।

লেখক হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বিশাল পাঠকসমাজ তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মকে বই পাঠে আগ্রহী করে তোলা। বছর বছর তাঁর রচনার কলেবর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। তাঁর রচনার পাঠকদের অধিকাংশই তরুণ- স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং সর্বস্তরের মানুষ। একসময় পশ্চিমবঙ্গের গল্প-উপন্যাসের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো এদেশের পাঠকদের। সেই পাঠকশ্রেণিকে হুমায়ূন আহমেদ গৃহমুখী অর্থাৎ দেশমুখী করে তোলেন তাঁর যাদুকরি সাহিত্যসম্ভার দিয়ে। সাহিত্য-শিল্পের একটি মুখ্য উদ্দেশ্য মানুষকে বিনোদন ও আনন্দ দেওয়া। এ কাজটি তিনি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। উনিশ শতকের সমকালীন পটভূমিতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। জনপ্রিয়তার দিক থেকে হুমায়ূন আহমেদ শরৎচন্দ্রকে ছাড়িয়ে যান। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য-সমালোচক এবং পাঠকদের কাছেও তিনি শক্তিমান লেখক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের অগ্রগতির ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের অবদান অতুলনীয়। এ দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পকে ম্রিয়মাণ অবস্থা থেকে গতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসেন তিনি। তিনি এককভাবেই বইয়ের বাজার তৈরি এবং প্রকাশনা শিল্পে পুঁজির প্রবাহ সৃষ্টি করেন। তার সৃষ্টিশীল লেখার কল্যাণে বাংলাবাজারের অসংখ্য পুস্তক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত বাংলা একাডেমীর বইমেলায় বিক্রি হওয়া সৃজনশীল গ্রন্থের একটি বড় অংশ হুমায়ুন আহমেদের। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমীর বইমেলার প্রধান আকর্ষণ।

সাহিত্য জগতের সংকীর্ণ দলাদলি বা রাজনীতির সঙ্গে হুমায়ূন কখনোই জড়িত হননি। তবে দেশ ও জাতির সমস্যার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন না। তাই দেশের যে কোনো সংকটময় মূহুর্তে তিনি সুচিন্তিত মতামত ও বক্তব্য প্রকাশ করতেন। নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে পিতৃভূমি নেত্রকোনায় তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এ স্কুল নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল, যা জীবদ্দশায় পূরণ করে যেতে পারেননি।

নিসর্গপ্রেমিক হুমায়ূন আহমেদ নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কোলে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। তাই গাজীপুরের পিরুজালি গ্রামে স্থাপন করেন ‘নুহাশ পল্লী’ এবং সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে ‘সমুদ্র বিলাস’ নামে বাড়ি। নুহাশ পল্লীকে সাজিয়েছেন নয়নাভিরাম বৃক্ষ, দিঘি ও ভাস্কর্য দিয়ে। প্রায় দু’শ প্রজাতির ঔষধি গাছ রোপন করে নির্মাণ করেন একটি উদ্যান এবং তার অকাল প্রয়াত সন্তানের নামে তার নামকরণ করেন ‘রাশেদ হুমায়ূন ঔষধি উদ্যান’।

বাংলা সাহিত্যের উপন্যাস শাখায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন হুমায়ূন আহমেদ। এছাড়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

জীবনের শেষভাগে ধানমন্ডির ৩/এ রোডে নির্মিত দখিন হাওয়া ভবনের একটি ফ্লাটে বসবাস করতেন খ্যাতিমান এই লেখক। খুব ভোর বেলা ওঠা অভ্যাস ছিল তার, ভোর থেকে সকাল ১০-১১ অবধি লিখতেন তিনি। মাটিতে বসে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কখনো অবসর পেলে ছবিও আঁকতেন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বের মাসে সিঙ্গাপুরে ডাক্তারী চিকিৎসার সময় তার দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে টিউমার বাইরে ছড়িয়ে না পড়ায় সহজে তার চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হলেও অল্প সময়ের মাঝেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

১২ দফায় কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল হুমায়ূনের শরীরে। অস্ত্রোপচারের পর তার কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করায় তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। মলাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কৃত্রিমভাবে লাইভ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন প্রথিতযশা এই কথাসাহিত্যিক। পরে তাকে নিজ হাতে গড়া তার নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।

আজকের পত্রিকা/সিফাত