'ফুলওয়ালা' বইটি ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে আমাদের কবিতা পড়াতেন প্রফেসর আলী আরিফুর রেহমান, যিনি কবিতা কখনো শরীর দিয়ে অভিনয় করে বোঝাতেন, আর অবাক করা বিষয় ছাত্রদের মাঝ থেকে অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে চাইতেন, নিজে অর্থ বলে দিতেন না। ইংরেজি শব্দ বুঝতে পারাই যে শেষ কথা নয়, এর মধ্যে অন্য এক পৃথিবী লুকিয়ে থাকতে পারে- এ রকম গভীর এক ভাবনায় গ্রেট আলী স্যার আমাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তাই কবিতার পাঠ আমার কাছে সে সময় থেকেই হয়ে উঠেছিল গুপ্তধন খোঁজার মতো।

২০০৮ সালে ১ম বর্ষে পড়াকালীন, ইংরেজি সাহিত্যের মেটাফিজিক্যাল জনরার প্রথম দিককার একজন কবি এন্ড্রিউ মারভেলের ‘টু হিজ কয় মিস্ট্রেস’ কবিতাটি পড়ে এর ভেতরের গুপ্তধন (রূপক অর্থ) খুঁজতে প্রায় ৬ মাস সময় লেগে গিয়েছিল। এর আগে নিজেও কবিতা লিখতাম, তবে এ কবিতার অর্থ উপলব্ধির পর থেকে নিজেকে কবি হিসেবে ভাবতে আক্ষরিক অর্থেই ধৃষ্টতা মনে হয়। ঠিক করি, আমি বরং যারা কবিতা লিখতে পারে, তাঁদের কবিতা বুঝে বিশ্লেষণ করে গুপ্তধন খোঁজার এই আনন্দ নিয়েই কাটিয়ে দেব জীবনটা।

এখানে কবি রাসেল মোহাম্মেদ খাইরুলের ‘ফুলওয়ালা’ বইটির সূক্ষ্ম পাঠ সম্পন্নের পর বহুদিনের সেই চিরচেনা আনন্দ অনুভূতি পুনরায় ফিরে এলো, তাই এর সম্পর্কে কিছু বলবার ইচ্ছে প্রকাশ পেল। বসে গেলাম ল্যাপটপ নিয়ে। কিপ্যাডের অক্ষরগুলোয় গুঁতোগুঁতি করে, বইটি ও কবি সম্পর্কে পাঠকদের কিছু ধারণা দিতে পারবো বলে মনে করছি।

প্রথমেই কবি সম্পর্কে কিছু আলাপ করা যেতে পারে। রাসেল মোহাম্মেদ খাইরুলকে ব্যক্তিগতভাবে চেনার সুযোগ হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নের সময়। আমি মাস্টার্সে পড়বার সময়ে রাসেল ১ম বর্ষে ভর্তি হয়। ইংরেজি বিভাগে জ্যেষ্ঠ ও নবীন ছাত্রদের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন আর ফেসবুকের কল্যাণে এই আপাত গম্ভীর কিন্তু চিন্তায় প্রাণোচ্ছল ছেলেটির সাথে পরিচয় হয়। বিভাগের হয়ে ক্রিকেট খেলার অনুশীলনে ওকে দেখতে পাই। আর পরবর্তীতে একসাথে খেলাও হয়েছিল। নবীন ভাই-বোনেরা আমার কাছে পড়াশুনা বিষয়ে বিভিন্ন আলাপ করতে আসতো। তবে রাসেল ব্যতিক্রম ছিল। ওর কবিতা পাঠাতো ফেসবুকে। আর অনুভূতি জানতে চাইতো। অবাক হয়ে লক্ষ্য করতাম, আমাদের বিভাগের অনেক কবি বা গল্পকারের তুলনায় বয়সে বেশ নবীন হলেও প্রজ্ঞায় ছেলেটির গভীরতা আছে।

ভাষায় আবেগের নানা ধরন- ক্রোধ, অসহায়ত্ব, একগুঁয়েমি বা জীবন-তৃপ্তি ফুটিয়ে পাঠকদের রাসেলের কবিতা পুরোপুরি পড়তে এক প্রকার বাধ্য করতে পারার ক্ষমতা দেখতে পেতাম ওর লেখায়। একদিন বাবু ভাইয়ের দোকানে সকালের নাস্তা করার সময় ওর হাতে দেখতে পাই ডি এইচ লরেন্সের ‘সান্স এন্ড লাভারস’ উপন্যাসটি, গভীর মনোযোগে ও পড়ছে। এই উপন্যাস ইংরেজি বিভাগে আমাদের সময় ৪র্থ বর্ষে পড়ানো হতো। সাইকোঅ্যানালিসিসের প্রাথমিক কোনো জ্ঞান ছাড়াই ১ম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে এই বই পড়তে দেখে আমি কিছুটা তিরস্কার করি, ছেলেটার চেহারায় একটা দুঃখের ভাব ফুটে ওঠে। সেই চেহারা এখনো স্পষ্টভাবে মনে গেঁথে থাকার একমাত্র কারণ, আমি সেদিন কতটা অযৌক্তিক অহমিকার পরিচয় দিয়েছিলাম, সেটি এই ছবি মনে করিয়ে দেয়। আসলে ওইদিন সে বয়সের তুলনায় দর্শনে ও মননে কতটা এগিয়ে ছিল সেটির নজির চোখে পড়েছিল।

এই উন্নত দর্শন ও মননের প্রকাশ ঘটেছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফুলওয়ালা’তে। বইটিতে কবিতার সংখ্যা ৫৫। প্রতিটি পাতায় দুটো করে কবিতা এমনভাবে সাজানো যেন দ্বিতীয় কবিতাটি প্রথম কবিতায় যা বলা হয়েছে, এরই পরবর্তী ধাপ। শিরোনামগুলোও মনে হয়েছে একটি আরেকটির পরিপূরক। যেমন, প্রথম কবিতা ‘মানুষ’-এ রাসেল প্রশ্ন করছে জীবনের সুন্দর দিকগুলোকে অবহেলা বা প্রত্যাখ্যান করে মানুষ কোথায় যায়, কী অর্জন করে বা আসলে কি প্রকৃত মানুষ থাকে? আর দ্বিতীয় কবিতা ‘নিজের ভেতরে হাঁটি’ কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে মেকি পৃথিবীর যান্ত্রিকতাকে কটাক্ষ করে কবির নিজের ভেতরের মানুষকে খোঁজার বাসনা।

এভাবেই দ্বিতীয় কবিতাটি যেন প্রথম কবিতায় তোলা প্রশ্নের জবাব দিতে চাইছে। দার্শনিক এই মনোভাবের সে প্রকাশ সফলভাবে করতে পেরেছে প্রাণবন্ত কিছু ‘ইমেজ’ সৃষ্টি করার মাধ্যমে। ‘মানুষ’ কবিতার কয়েকটি শব্দগুচ্ছে যেমন- ‘নির্জন শহরের রাস্তায় জমে থাকা জলে/হঠাৎ ভাসিয়ে দেওয়া কাগজের নৌকা’, ‘আলমারিতে সাজিয়ে রাখা অ্যালবামে স্বচ্ছল জীবনের/ জবানবন্দী’, ‘আবিষ্কৃত সাপের ছোবল’, ‘খোকার সজীব মুখে টুথপেস্টের ঘ্রাণ’, ‘খুকির হাতের রিনিঝিনি’, ‘কুকুরে গর্জানো রাত’, ‘ঘামের সাইরেন’, ‘আচারের বৈয়াম আর শুকনো রুটির স্বাদ’ ইত্যাদি একজন সচেতন পাঠককে ধরিয়ে দেয় ‘ভিজ্যুয়াল’ বা চাক্ষুষ, ‘অডিটরি’ বা শ্রবণজনিত, ‘অলফ্যাক্টরি’ বা ঘ্রাণজ, ‘গাসটেটোরি’ বা স্বাদজনিত, ‘ট্যাকটাইল’ বা স্পৃশ্য ইত্যাদি ইমেজের দারুণ প্রয়োগ, এবং নিঃসন্দেহে এগুলো কবির ভাষার মুন্সিয়ানা প্রমাণ করে।

দ্বিতীয় কবিতা ‘নিজের ভেতরে হাঁটি’তেও রাসেলের কিছু শব্দগুচ্ছ যেমন ‘একগুঁয়ে ঘুম’, ‘অসহায় কবিতার ছানা’, ‘অদম্য বিলাসিতা’, ‘স্বপ্ন ব্যাঙের ছাতা’, ‘রং মেখে সং সেজে’ থাকা ‘ম্যাজিশিয়ান’ ইত্যাদির মধ্যে অলংকারশাস্ত্রের বিস্তারিত পাঠ ও দখলের প্রমাণ মেলে। শেষোক্ত ‘ম্যাজিশিয়ান’ শব্দটির মাঝ দিয়ে কবি হয়তো নিজের কথাই বলতে চেয়েছেন। জীবনের মায়া, মোহ বা নিত্য প্রয়োজনীয়তার ভিড়ে মানুষ আপন সত্তাকে হারিয়ে ফেলে। জীবন যেমন সাজায়, কেউ তেমন করেই সাজতে বাধ্য হয়। হয়তো এই অর্থেই ‘সং’ সেজে থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কবির ভেতরের অভিপ্রায়, একদিন এই সং সাজার অবসান ঘটিয়ে নিজের ভেতরের ম্যাজিশিয়ান সামনে আসবে ‘ভবিষ্যতের গুমোট আঁধার আলোকিত করবার ধান্দায়’। বর্তমানের অসহায় ‘আমি সত্তা’ একদিন নিশ্চিত করবে আলোকিত আগামী। ‘ধান্দায়’ শব্দটি এখানে মূল ভাবনায় কিছুটা নেতিবাচকতা প্রকাশ করছে। এখানে অন্য কোনো শব্দ চয়ন কবির অভিপ্রায়কে আরও দৃঢ় করতে পারতো।

এরপরের দুটি কবিতা ‘অদ্ভুত আনন্দ’ ও ‘সাধের জীবন’ সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে লেখা। আগের কবিতাগুলোতে যেখানে চারপাশ সম্পর্কে এক সুতীব্র হতাশা ও নেতিবাচকতা প্রকাশ পেয়েছিল, এই দুই কবিতায় রাসেল জীবনের স্তুতি গেয়েছেন। তবে আগের ধারা বজায় রেখে এ দুটি কবিতাও অন্তর্নিহিত ভাব প্রকাশে একটি আরেকটির পরিপূরক। ‘অদ্ভুত আনন্দ’ কবিতায় কবি সার্বিকভাবে প্রকৃতি ও তার মাঝে মানব জীবনের মাধুর্য ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কবিতার কিছু শব্দগুচ্ছ যেমন, ‘আকাশের ক্যানভাস’, ‘মেঘেদের স্কেচ’, ‘ফুলেদের দোলনা’, ‘দিনমজুরে মৌমাছিরা’ ইত্যাদিতে রূপকের ব্যবহার সত্যিই প্রশংসনীয়।

প্রকৃতির রত্নসম্ভার রাসেলের লেখনীতে ‘রোমান্টিক’ ধাঁচে প্রকাশ পেয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কিটস বা শেলির কথা মনে করিয়ে দেয়। শুধু প্রকৃতি নয়, শিশুদের কথা বলবার সময় রাসেল লিখেছেন, ‘তারা যেন ক্যালেন্ডারের পাতাগুলি চুরি করে বড় হয়ে গেছে খুব দ্রুত’। কথার ভাঁজে এমন সুন্দর বিষয়গুলোকে ফুটিয়ে রাসেল বলতে চেয়েছেন জীবন কতটা সুন্দর! কবির মনের এমন আনন্দানুভূতি নিশ্চিতভাবে পাঠক মনেও প্রকাশ করছে। এভাবে ‘অদ্ভুত আনন্দ’ কবিতাটি যদি সমষ্টিগতভাবে প্রকৃতি ও জীবনের কথা বলে থাকে, তাহলে ‘সাধের জীবন’ কবিতাটি বলছে ব্যক্তি জীবনের কথা। আগের কবিতাটি যদি বলতে চায় সামগ্রিকভাবে জীবন সুন্দর ও উপভোগ্য, তবে পরের কবিতাটি বলছে আনন্দময় এই মানবজন্মে কবি আপন চিহ্ন রেখে যেতে চান।

হতে পারে কবি নিজের কবিতার কথা বলছেন যার মাধ্যমে তিনি ‘আঙ্গুলের ছাপের মতন রেখে’ যাবেন, কবির ‘হৃদয়ের ঘ্রাণ’ হয়ে যেগুলো ‘প্রসন্ন পৃথিবীর বুকে’ ছড়িয়ে পড়বে। কবিতাগুলোও হবে কবির মতোই একরোখা। কারণ তার কবিতাগুলো ‘ফুলের’ নয়, ‘কাঁটার’ কথা বলবে। তার কবিতাগুলো হয়তো চারিদিকের অসঙ্গতিকে চিড়ে বের করবে অথবা জীবন ধাঁধায় ভুলে ভরা ‘খয়েরি পাতার সম্মেলন’ হয়ে কোনো কোণে পড়ে থাকবে। কিন্তু কবিতাগুলো তাই বলবে, যা কবি তার জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। দুটি কবিতাই ‘সনেট’ আকারে লেখা। তবে শেক্সপিয়ারিয় সনেটে যেমন শেষ দুই লাইনে কবিতার মূল বক্তব্য পাওয়া যায়, বা পেত্রার্কীয় সনেটে যেমন শেষ ছয় লাইনে কোনো সমাধান বা দর্শন প্রকাশ পায়, রাসেলের এই কবিতা দুটিতে তেমন কিছু হয়নি। ওর বক্তব্য বা দর্শন পুরো কবিতা জুড়েই ছেয়ে আছে।

এরপরের কবিতা ‘পাহারা’ কবি হিসেবে রাসেলকে অন্য মাত্রায় এগিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথম দুই বাক্যই বলছে তেমন কিছু, ‘কবিতার চতুর্দিকে শব্দেরা পাহারা দিয়ে চলেছে/কেউ রাইফেল কাঁধে তুলে, কেউ বা ছোরা বা চাপাতি হাতে।’ এই দুই বাক্য কোনো সাধারণ এড়িয়ে যাবার মতো লেখনী নয়, এ কথা যেন যুগের পর যুগ ধরে কবিতা, কবি ও শিল্পীদের রাজনীতি, মৌলবাদ, সরকার ব্যবস্থা ও সমাজের দাসত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এমন কোনো সমাজ, যেখানে কবি হারিয়েছে লেখার বা বলার স্বাধীনতা। হয়তো কলমের একটি আঁচড়, ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস- পরেরদিনে রক্তভরা নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে আছে এমন ঘটনার সৃষ্টি করতে পারে। কবি যখন লিখবেন তখনো যেন অদৃশ্যভাবে এ সমস্ত চিন্তা কড়া পাহারায় রাখছে কবিকে, এক অদ্ভুত শেকল পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কবির কলমে। তারপরও রাসেলের ভাষায়, ‘হঠাৎ হঠাৎ দু একটা দস্যু শব্দ-/ফাঁকফোকর দিয়ে চলে আসছে।’ রাসেল মনে করিয়ে দিতে চাইছে সাহিত্যের ওপর জুলুম, শোষণ কখনো সফল হয় না। সাহিত্য তার প্রতিবাদের ভাষা ঠিকই তৈরি করে নেয়। সাহিত্যের এই ‘ভয়ানক দস্যিপনা’ ছিল বলেই সৃষ্টি হয় অনেক অমর কবিতা ও মহান কবির। এই কবিতাও এ রকম সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ‘দস্যু’ কবিতা।

প্রেম ও দ্রোহ দুটি অনুভূতি আপাত দৃষ্টিতে বিপরীত হলেও এদের পথচলা হাতে হাত রেখে। ‘পাহারা’ কবিতার দ্রোহের পরের তিনটি কবিতা প্রেমের। ‘তোমাকে দেখলে’ কবিতায় ‘তোমাকে’ শব্দটির মাধ্যমে কবি পরিচয় দিয়েছেন এক ব্যক্তিত্বের, যার জন্য কবি লিখে চলেছেন। যাকে দেখলে রাসেলের ‘কবিতার নীল খাতা শব্দেরা জোর করে/যুদ্ধের ঘোষণায় রক্তাক্ত করে ফেলে’। এই অনুভূতির নাম ‘অনুপ্রেরণা’। ওয়ার্ডসওয়ার্থ অনুপ্রেরণা নিতেন প্রকৃতি থেকে, জীবনানন্দ হয়তো ‘বনলতা সেন’-এর চুল থেকে, সুনীল নিতেন নিরার ‘হাঁটুর ওপরে থুঁতনি’র ছবি মনে রেখে। রাসেল ঠিক কী দেখে নিতেন, সেটা এখানে পরিস্কার নয়, তবে প্রত্যেক কবির জন্যই এমন এক আশ্রয়ের বড় প্রয়োজন, তাছাড়া শব্দেরা নানা রঙ্গে নানা কায়দায় প্রকাশিত হতো না।

এই আশ্রয় যদি একজন ‘নারী’ হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে যে বাস্তবে কবির পাওয়া হয়নি- সেটি পরিস্কার হয়েছে পরের কবিতা ‘এখনও এ জীবনে’। রাসেল বেশ আক্ষেপ করেই লিখেছেন, ‘কভু মিললো না চুমুর মদির স্বাদ’, যদিও লেখা হয়েছে ‘আহ্লাদ করে’ অনেক কবিতা। কবির তাই সরল স্বীকারোক্তি, ‘তবুও জুটেনি প্রেম; তাই মনে হলো, আমি এ ব্যবসায় আনাড়ি’। তবে এই প্রেমে আনাড়ি কবিই পরের কবিতা ‘নিতান্ত মানুষ বলে’ লিখে প্রমাণ দিয়েছেন ভাবগাম্ভীর্যের। এ কবিতায় সার্বিকভাবে মায়ার এই জগতকে কবি তুলে ধরেছেন। এই জগতে স্বপ্ন দেখা মাত্রই ‘শিং দিয়ে গুঁতো দেয়’ কোনো বাস্তবতা, তারপরও ‘মায়ার ফাঁদে পড়ে’ ফুঁ দিয়ে সব দুঃখ ভুলে মানুষ গৃহে ফেরে, ভালোবাসে।

এরপরের দুটি কবিতা ‘আছি’ ও ‘এই সেই কবি’ হয়তো রাসেলের নিজের কথা বা যে কোনো কবির অস্তিত্বের কথা বলতে চাইছে। শব্দরা কবিকে কখনো ছেড়ে যায় না। নিজের শরীরের আর দশটি অঙ্গের মতো ওরা কবির শরীর ও মন দখল করে রাখে, রাসেলের ভাষায় ‘ছায়ার’ মতো। ‘তৃষিত ঠোঁটে চুমোর মতন’, ‘রাঙা হৃদয়ের ঘরে নিভৃত রাজপুত্র হয়ে’, বা ‘কড়া নীল মুক্ত হয়ে’ শব্দেরা জন্ম নেয় ‘পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়’। পরের কবিতা ‘এই সেই কবি’ বলছে একজন কবির জীবনের সংগ্রামের পথের কথা। ছেপে যাওয়া শব্দ আমরা পড়ি বা কাগজে দেখতে পাই, কিন্তু ছাপার পূর্বে একজন কবিকে শব্দ সাজাতে গিয়ে যে অসংখ্য মুহূর্ত পাড়ি দিতে হয়, তা নিয়ে বলেছেন রাসেল। একজন কবি কবিতার রসদ খোঁজে জীবন ও এর সাথে জড়িত সকল অভিজ্ঞতা থেকে, ‘ফুলওয়ালা’র মতো। বেছে বেছে করে শব্দ চয়ন। সঠিক শব্দে লিখতে হবে তো, কারণ ‘মিথ্যা ও নকল পৃথিবীকে’ একজন কবি ‘অবিরত তার তেজী কাঠগড়ায় তুলে নিয়ে আসে’, ‘নতুন পৃথিবী’ উপহার দেবার আশায়। একজন ফুলওয়ালাও কিন্তু বেছে বেছে সুন্দর ফুল দিয়ে মালা গাঁথে, সুন্দর মালাটি তৈরি করে ক্রেতাদের দেবে বলে। মূল বইয়ের নামকরণ করার পেছনে রাসেলের এই কবিতার ‘ফুলওয়ালা’ শব্দটি বাছা তাই যথার্থ।

আগের ধারা বজায় রেখে পরবর্তী দুটি কবিতা ‘আটক’ ও ‘কল্পনা আমার দেশের নাম’ একটি অন্যটিকে সম্পূর্ণ করছে। ‘আটক’-এ কবি বলছেন পৃথিবীর যান্ত্রিক বাস্তবতার কথা। কেউ নিয়ম বা কেউ অনিয়মের নিয়মে আটক। সব শ্রেণীর মানুষ আটকে আছে জীবনের বেড়াজালে, সময়ও আটকে আছে সঠিক সময় দেওয়ার চক্রে। কোনো কিছুই নতুন নয়, চারিদিকে আটকে পড়া ‘অসহায় করুণ প্রাণীকুল’। কিন্তু পরের কবিতায় রাসেল পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এক সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন দেশের কথা। তার নাম ‘কল্পনা’, যেখানে প্রকৃতির রং রূপ অনন্তকাল জুড়ে সুন্দর, যেখানে কোনো ধ্বংসযজ্ঞ নেই, যেখানে প্রেম অটুট, জীবন শান্তির। রাসেল বলতে চাইছেন পৃথিবীর সবকিছুই গৎবাঁধা নিয়ম বা অনিয়মের মাঝে আটকে পড়লেও, একজন কবির স্বাধীন কল্পনার জগতকে আটকে রাখা যায় না। কবি সযত্নে তাকে নির্মাণ ও রক্ষা করেন ‘লাল নীল পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়’।

‘এইসব দিনগুলো’ কবিতাটি আবারও বলছে নিত্য দিনের সাধারণ ঘটনার মাঝে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট আশার কথা, সংশয় সংহার করে যে দিনগুলোকে। তবু কিন্তু জীবন এগিয়ে যায়। কবিতারাও তৈরি হয়, সফলতা বা ব্যর্থতাকে পাশ কাটিয়ে। আর যে প্রেমের জন্য আজ ‘এইসব দিনগুলো’তে এত আকুতি, পরের কবিতা ‘একদিন আমিও’ বলছে এক ভবিষ্যতের কথা, যেদিন প্রেমিক কবি হবে কারো প্রেমের কারণ। কারো খোঁপার দিকে না তাকিয়ে কবি হবেন খোঁপায় বাঁধা ফুল, বা ‘কফির পেয়ালা’ যাতে চুম্বন আঁকবে প্রেমিকা। এ দুটি কবিতাকে চাইলে আজ যা অনর্জিত ও আকাঙ্ক্ষিত, তা আগামীতে দৃশ্যপট পাল্টে কারো আকাঙ্ক্ষা বা অর্জনের লক্ষ্য বস্তুতে বদলের সম্ভাবনা ও সংকল্প হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

পরের দুটি কবিতা ‘মানচিত্র’ ও ‘কে’ শেষ হয়েছে প্রশ্ন দিয়ে। ‘মানচিত্র’তে কবি প্রশ্ন করছেন মানুষের অবিরাম ছুটে চলাকে। কিসের আশায়, কোন লক্ষ্যে সবাই ছুটে চলছে, কী খুঁজছে তাকে প্রশ্ন করছে। সবাই হয়তো আনন্দ খুঁজছে। কিন্তু এর শেষ কোথায়? পার্থিব জগতের ভোগ বিলাসের আনন্দ যেখানে সারকথা, সেখানে হয়তো আনন্দের জন্য এভাবেই ভিক্ষাবৃত্তি চলবে। টি এস এলিয়টের ‘ওয়েইস্ট ল্যান্ড’ কবিতায় পার্থিব সাফল্য অর্জনের নেশায় মানুষের যে যান্ত্রিক জীবনের বর্ণনা করা হয়েছে, তার অনুরুপ চিন্তায় এই কবিতা রাসেল লিখেছেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ ভোগ বিলাসের কোনো মানচিত্র বা সীমারেখা নেই। এজন্য হয়তো কবি ভুগছেন হতাশায়। কবিতা লেখার জন্য কোনো কারণ বা স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছেন না। এই কথা বলা হয়েছে পরের কবিতা ‘কে’ লেখনীতে। হয়তো কবি এমন কোনো ব্যক্তিত্বের সন্ধান করছেন, যে নিরস এই পৃথিবীকে জাগিয়ে আবারও স্বপ্ন দেখাতে পারবেন। শব্দেরা তখন প্রাণ খুঁজে পাবে। এক্ষেত্রে অবচেতন মনে হয়তো টমাস কিডের ‘দ্যা ডার্কলিং থ্রাশ’ কবিতার সেই পাখির কথা কবি ভেবে থাকতে পারেন, যেখানে থ্রাশ পাখিকে রূপকভাবে তুলে ধরা হয়েছে জীর্ণ পৃথিবীতে প্রাণ ফিরে আনার শক্তি হিসেবে।

‘আজ সারাদিন’ কবিতাটি বর্ণনা করছে অনেক কিছু না পাওয়া আর ব্যর্থতার কথা। প্রেমিক হৃদয়ের অপূর্ণতার কথা। এ ধাঁচের কবিতা বেশ কয়েকটি লিখেছে রাসেল। তবে কবিতার মাঝে মাঝে খণ্ড খণ্ড দৃশ্য তৈরির কায়দা এখানেও সুন্দরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরের কবিতা ‘সব কি তেমনি থাকে?’ প্রকাশ করছে হতাশা। তবে এই হতাশার কারণ ভিন্ন। হতাশা না বলে একে সংশয়ও বলা যায়। একজন কবি কবিতা লিখছে হয়তো চারিদিকের অসংলগ্ন কিছুকে একদিন পরিবর্তিত হতে দেখবে এই আশায়। কিন্তু কবি এখানে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। আসলেই কি কোনো পরিবর্তন হয়, কারণ সব কিছুকেই তো আগের রূপেই দেখা যায়। তাহলে কবিতা লিখে কবি কি আদৌ কিছু অর্জন করছেন- এই চিন্তা থেকে কবি যা তৈরি করেছেন, তাও আবার একটি ‘কবিতা’।

‘প্রত্যেকের’ কবিতাটিতে কবি রাসেল একজন ব্যক্তি মনের ভেতরের অনুভূতি ও তার সাথে যুক্ত নিত্যদিনের পথচলাকে তুলনা করেছেন বিশাল এক ‘সাম্রাজ্যে’র সাথে। এই তুলনাটি নতুন নয়, তবে এই তুলনা করতে গিয়ে রাসেল সেই আপন সাম্রাজ্যে থাকা দুঃখ, স্বপ্ন, প্রেম, ব্যর্থতা, বিষাদ, ঘৃণা, অহমিকা, সাহস এই অনুভূতিগুলোকে কাব্যিক ঢঙে যেভাবে চিত্রায়ন করেছেন, সেটি প্রশংসনীয়। কিছু শব্দগুচ্ছ যেমন ‘অসরল ঘৃণা’, ‘নীতিহীন তপ্ত পাপ’, ‘উন্মুক্ত অস্থির অহমিকা’ পারসোনাল মেটাফোরের সাবলীল প্রয়োগের উদাহরণ।

এই কবিতাটি যদি আপন পৃথিবী নিয়ে বলা হয়ে থাকে, তাহলে পরের কবিতা ‘অন্বেষণ’ বলছে একজন কবির আপন দুনিয়ার কথা। একজন কবিকে রাসেল তুলনা করেছেন একজন অন্বেষণকারী দার্শনিকের সাথে, যে প্রতিনিয়ত নিজের পৃথিবীতে বিচরণ করে প্রকৃতি ও যান্ত্রিক পৃথিবী থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে ভাষার মোড়কে ব্যক্ত করে আপন দর্শন। তবে রাসেল ‘কি খুঁজো কবি?’ প্রথম লাইন ও একই লাইনের দ্বিত্ব ঘটিয়ে শেষ লাইনের মাধ্যমে কবির এই খোঁজাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কারণ জাগতিক পৃথিবী অনেক নিষ্ঠুর, কবিতা লেখার প্রতিকূল, স্বাধীনতা নামের পরাধীন জগতে কবিরা ‘দানবের করালগ্রাসে বিধ্বস্ত ভীষণ’। তবু কবিরা লিখে যায়। এর মাঝে কবি হিসেবে রাসেল হতাশা যেমন দেখিয়েছেন, আবার কবিদের এই একগুঁয়েমি স্বভাবের প্রশংসাও করেছেন। সাহিত্যের ভাষায় একে বলে ‘প্যারাডক্স’ বা ‘কূটাভাস’।

উল্লেখ্য, রাসেল মুহাম্মেদ খাইরুলের জন্ম ১৪ জুলাই, ১৯৯৩ সালে ঢাকা জেলায়। জন্ম ঢাকায় হলেও বেড়ে ওঠা গাজীপুর চৌরাস্তার তেলিপাড়া গ্রামে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা থেকে।বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়নরত। রাসেল মুহাম্মেদ খাইরুলের ‘ফুলওয়ালা’ বইটি ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছে।

লেখক: আশিক ইসতিয়াক

আজকের পত্রিকা/সিফাত