একই শিরোনামে পাঁচ কবির কবিতা। ছবি : সংগৃহীত

একই শিরোনামে কবিতা লেখার অভ্যাস ইতিপূর্বে বাংলা সাহিত্যে কারও মধ্যে ছিলো কিনা জানা নেই। তবে বর্তমান সময়ে একটি নির্দিষ্ট শিরোনামকে কেন্দ্র করে কবিতা লেখার চর্চা অকস্মাৎ দেখা যাচ্ছে। এই ধরণের কবিতা চর্চায় অনেকেরই রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এমনই একটি শিরোনাম হচ্ছে ‘বন্দুককে সন্দেহ করলে, গুলি তো আসবেই’। এই শিরোনামকে পুঁজি করে নিজস্ব চিন্তা, বুদ্ধি, কল্পনা ও দর্শন শক্তি দিয়ে একটি স্বকীয় কবিতা লেখার প্রচেষ্টা করতে গিয়েই তৈরি হয়েছে পাঁচটি ভিন্ন স্বাদের কবিতা। আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্যে পাঁচজন কবির লেখা সেই পাঁচটি কবিতা প্রকাশ করা হলো।

বন্দুককে সন্দেহ করলে
সামতান রহমান 

বন্দুককে সন্দেহ করলে গুলি তো আসবেই। একবার এক গাছকে সন্দেহ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলাম, বৃষ্টিকে সন্দেহ করে পড়েছিলাম চৈত্রে! বন্দুক থেকে ছোড়া গুলি একবারের বেশি মারতে পারে না বলে, কত উচ্চাভিলাষী গুলি, মানুষের মুখ থেকে ছুড়ে যেতে চায় কথায়, ভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চায় ব্যবহারে, ফিরিয়ে দেয়া যেমন বেঁচে থাকে ফিরে আসার ভেতর

অন্তরভেদের স্বপ্ন নিয়ে মানুষের ঘৃণাকে ঈর্ষা করে যায় সন্দেহবশ গুলি, বারুদের গোলাঘর জানে অবহেলার কাছে কী সামান্য সে!

সমস্ত অস্ত্রাগার সন্দেহ করেও আমি কিন্তু নিরুদ্বেগ। যে গুলিচ্ছেদই আসুক, ভেদ মুহূর্তের আগে থমকে যাবে; যেখানে বিঁধে, তার সমস্ত জুড়েই আমার জমে গেছে মানুষের সন্দেহ!

আর মানুষের সন্দেহ নিয়ে যারা বেঁচে থাকার কথা বলে, অহরহ মিথ্যাবাদী তারা!

বন্দুককে সন্দেহ করলে
কবির হোসেন

বন্দুককে সন্দেহ করলে গুলি তো আসবেই। দা’কে ধার বিষয়ক প্রশ্ন করা যেমন কোনো লাউয়ের পক্ষেই নিরাপদ নয়, শার্টের নিচে টসটসে বুক নিয়ে বন্দুককে ছোট করে দেখাও নিরাপদ নয়। বন্দুককে ছোট করে দেখবো না বলেই তো আমি নিয়মিত আতশ কাচের চশমা পরি— পকেট ছোরাদের দেখি একেকটা তলোয়ার আর পিস্তলদের দেখি বন্দুক, বুলেটকে দেখি রকেট, তলোয়ারদের দেখি আরো তলোয়ার আর বন্দুকদের দেখি আরো বন্দুক। বন্দুককে চশমা খুলে দেখলে গুলি তো করবেই।

একজন তো দূরবীণ উল্টো করে বন্দুক দেখেছিল, তার বুকে বন্দুকেরা এখন গুলির চর্চা করে।

বন্দুককে সন্দেহ করলে
কাজী মেহেদী হাসান

বন্দুককে সন্দেহ করলে গুলি তো আসবেই
সুবোধের দেয়াল লিখনের তেমন প্রয়োজন নেই
প্রয়োজন নেই স্কুলে যাবার
পাঠ্য বইয়ের ভেতর অন্য কোন গল্প লুকোতে
আমাদের পিতামাতারা কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন
প্রয়োজন নিয়ে মুক্তচিন্তার
শিশুদের কৌতুহলী প্রশ্নে ধর্মে ও মর্মে কেঁপে ওঠা মানুষেরা
মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে সুস্থির দাঁড়িয়ে থেকে নাকচ করেছেন
মানুষকে সন্দেহ করলে আয়না তো হাসবেই
বিনাকারণে;

একটা ছেলেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দিনে-দুপুরে
পুলিশ বলেছে, সন্দেহভাজন
মর্গের ডোম তার পকেটে পেয়েছে প্রেমিকার চিঠি
একদিন হঠাৎ চমকে গিয়ে আবার হাঁটি
বাসি পত্রিকাই পড়ে দেখবেন— টাটকা লাগে।

কোন একসময়, সময় হলে নিজের কাছে
যদি জানতেন, সত্যি সত্যি কেমন আছে?
যদি জানতেন, সব দিনগুলোই ‘গ্লুমি সানডে’?

যদি জানতো মানুষ—
মানুষ ভিন্ন, তার আর নাম নেই
জোনাকিরা সব আলো জ্বালবে, আলো নিভলেই।

তবে কি মানুষ শিরদাঁড়া টেনে দাঁড়িয়ে যেত, সন্দেহতে?
ট্রিগার, বুলেট জানতে পারতো আঙুলের ব্যথা?
চিৎকার করো মানুষ
চিৎকার করে বলো
এমন গোপনতম গোপনীয়তা…

বন্দুককে সন্দেহ করলে
সুবর্ণ আদিত্য

বন্দুককে সন্দেহ করলে গুলি তো আসবেই—
মানুষকে সন্দেহ করলে জেগে উঠে মানুষী
এইরূপ মহাস্থানে তিরোধানের পাশাপাশি
হুলস্থুল গুলি তো নেই! গুলি থেকে ছড়িয়ে গেছে খোসা, মানুষ নেই—তার প্রতিকৃতি আছে। মানুষের আওয়াজ তুলে এনে বাড়ি বড় করি। গুলি চেনে শুধু অাঙুলের ভাষা।

এমনও তো হয়…সমস্ত মিথের মধ্যে মদের চেয়ে
গ্লাস এগিয়ে থাকে! স্নাইপারের চেয়েও গতি নেয়
মানুষের চোখ।স্নানরত পাখিকে হুইসেল বাজিয়ে ইশারা দিচ্ছে মায়া—ডানার কাছাকাছি ভাবনা নিয়ে উড়ে যায় আকাশ।

আড়ালে যাওয়া মানেই তো দূরে যাওয়া নয়!
সমস্তই কেবল নিজের থেকে দূরে যায়—আরো কিছু যাবতীয় প্রক্ষেপণ করা যায় কী-না
বলতে পারছে না মানুষ।

তার হতে সামান্য চিত্র—পশু ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরগুলো টেনে নিয়ে এড়িয়ে যায় বহুকাল পেছনে
আকাশের মতো তদ্রুপ শ্রী ভগবান পরের বছর অবকাশ নেয়।

ছাঁচের আকারে ক্ষুদ্র একজন ক্ষুধা শ্রান্তির
ধকল জমা দিয়ে যায়—এবং অবধারিতভাবে এরপরই প্রেমের কাছাকাছি ভাবনা বাদ দেওয়া হবে বলে মনে করে আগুনের যাদুকর।

ভেতর দিয়ে তো আর পথ নেই—বাগান থেকেও আসে না আয়ু!
বন্দুককে সন্দেহ করলে গুলি তো আসবেই।

বন্দুককে সন্দেহ করলে
শঙ্খচূড় ইমাম

বন্দুককে সন্দেহ করলে
গুলি তো আসবেই—

তোমাদের আগেই বলেছিলাম
সন্দেহে সম্ভাবনা নয়, তবু
প্রসন্ন উড়াল দিকে—
থার্মাল আঁকছো—দ্বিধার থিরে—

এখানে শ্রেণি ছুঁয়ে যায়;
এসো—হাত ধরো; —ঈর্ষার
ডাকপারে অই—সাপ-সমুদ্র!

প্রাচীন পিতামহ কী ছুঁড়েছিলো
তার হৃদয়েও কি রাইফেলিং
ছিলো না?

আমি বিশ্বাস করি
হেনরি নক কোনোদিনই দেখেননি —
হরিণের থুতনি

তোমাদের আগেই বলেছিলাম
বন্দুককে সন্দেহ করলে
গুলি তো আসবেই—

আজকের পত্রিকা/