বৈসাবি উপলক্ষে রোববার রাঙামাটিতে আয়োজিত মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ম্রো জনগোষ্ঠীর নৃত্য পরিবেশনা। ছবি : বিজয় ধর

পাহাড়ে উৎসবের রঙ ছড়িয়েছে বিঝু, বৈসুক, সাংগ্রাইন। উৎসব ঘিরে রাঙামাটিসহ মুখর পাহাড়। চলছে আয়োজনের ব্যাপক প্রস্তুতি। পালিত হচ্ছে নানা বর্ণাঢ্য কর্মসূচি। ১২ এপ্রিল রবিবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে রাঙামাটিতে তিন দিনব্যাপী জুম সংস্কৃতি মেলা।

জুম সংস্কৃতি মেলার আয়োজন করেছে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল (জাক)। ১২ এপ্রিল রবিবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী রঞ্জিত দেওয়ান।

উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন মহলের উদ্যোগে চলছে ঐতিহ্যবাহী জুম্ম সংস্কৃতির খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক মঞ্চায়ন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গানের অ্যালবাম তৈরির প্রস্তুতি। স্থানীয় সংস্কৃতিবিষয়ক সংগঠন হিলর প্রোডাকশনের উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে ১০টি রোমান্টিক আধুনিক চাকমা গান নিয়ে ‘বড়গাঙানে হোক’ নামে একটি মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম। অ্যালবামের ১০টি গানের কথা লিখে সুর করেছেন, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কথাশিল্পী সুশীল প্রসাদ চাকমা।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশনা। ছবি : বিজয় ধর

হিলর প্রোডাকশনের সভাপতি সুপ্রিয় চাকমা শুভ বলেন, ‘অ্যালবামটির নির্মাণ প্রস্তুতি প্রায় শেষ। আশা করছি, শিগগিরই আমরা অ্যালবামটি দর্শকদের কাছে উপহার দিতে পারব। অ্যালবামে যে ১০টি চাকমা গান রয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ নতুন ও আকর্ষণীয়। আমাদের বিশ্বাস, সবগুলো গান দর্শকদের ভালো লাগবে।’

প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তিতে বাংলাবর্ষ বিদায় এবং বরণ উপলক্ষে উৎসবটির আয়োজন করে পাহাড়ি জনগণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত এগার ভাষাভাষি চৌদ্দ পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব এটি। তিন দিনব্যাপী উৎসব পালিত হয় ২৯-৩০ চৈত্র ও পহেলা বৈশাখ। উৎসবটি ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সাংগ্রাইং, চাকমারা বিজু নামে পালন করে। এ তিন ভাষার আদ্যাক্ষর নিয়ে এর সংক্ষিপ্ত পিরিচিতি নাম বৈসাবি’। এছাড়া তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, রাখাইনরা সাংক্রান ও অহমিয়ারা বিহু নামে তিন দিনের উৎসব পালন করে। উৎসবে পরিবেশিত হয় নৃত্য-সংগীতসহ বিনোদনমূলক ও উৎসবপূর্ণ নানা অনুষ্ঠান। পালিত হয় নানা আচার-অনুষ্ঠান।

বৈসাবি উপলক্ষে রবিবার রাঙামাটিতে আয়োজিত মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ম্রো জনগোষ্ঠীর নৃত্য পরিবেশনা। ছবি : বিজয় ধর

পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মানুষের বিশ্বাস মতে, পুরনো বছরের ব্যর্থতা, দুঃখ, গ্লানি ধুয়ে-মুছে ফেলে পানিতে ভাসিয়ে দিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তিন দিনের উৎসব। চাকমা সম্প্রদায় উৎসবের প্রথম দিন ফুলবিজু, দ্বিতীয় দিন মুলবিজু এবং তৃতীয় বা শেষদিন গোজ্যেপোজ্যে দিন নামে পালন করে। উৎসবে মারমা সম্প্রদায় পানি উৎসব আর ত্রিপুরা সম্প্রদায় মাতে গড়াইয়া নৃত্যে। মূলবিজুর দিন ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয়, বাহারি ও মুখরোচক খাবারের। পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পাচন (বহুবিধ সবজির মিশ্রিত সুস্বাদু তরকারি), মিষ্টান্ন, পায়েস, তরমুজ, মিষ্টি আলু, পানীয়, ভোজনসহ নানা খাবার। যার যে সাধ্যমতো ঘরে ঘরে চলে আয়োজন। একই সঙ্গে উৎসবে একাট্টা হয় আবহমান বাংলার চিরাচারিত বৈশাখী উৎসব।

জুম সংস্কৃতি মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বরেণ্য নাট্যজন মামুনুর রশীদ। ছবি : বিজয় ধর

এদিকে, ৯ এপ্রিল থেকে শুরু হয় রাঙামাটি বিজু, সাংগ্রাইং, বৈসুক, বিষু, বিহু, চাংক্রান-২০১৯ উদযাপন কমিটির তিন দিনের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। উদ্বোধনী ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দিয়ে শুরু হয় তিন দিনের অনুষ্ঠানমালা। এ ছাড়া ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানো।

জুম সংস্কৃতি মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের বরেণ্য নাট্যজন মামুনুর রশীদ। জাক সভাপতি শিশির চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ইনস্টিটিউট পরিচালক রুনেল চাকমা, খাগড়াছড়ির পরিচালক জীতেন চাকমা ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মনোজ বাহাদুর গুর্খা প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, মেলা উদযাপন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রনেল চাকমা।

আজকের পত্রিকা/বিজয় ধর/রাঙামাটি/প্রতিনিধি/আ.স্ব/জেবি

বৈশাখ নিয়ে আরও সংবাদ পড়তে ক্লিক করুন