মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পাহাড়ি শিশুরা। ছবি : সংগৃহীত

১৯৫২ সালে নিপীড়িতের ভাষা বাংলা এখন রূপ নিয়েছে নিপীড়কের ভূমিকায়। ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলার আগ্রাসনে বিলুপ্ত হতে বসেছে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও সংস্কৃতি।

মাতৃভাষার জন্য নেতৃত্বদানকারী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের স্বীয়দায়িত্ব হওয়া উচিৎ পাহাড়ি জাতিদের মাতৃভাষাকে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ঘটানো। এ চেতনা বোধ ও দায়িত্ববোধ থেকে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল সেখানেও পাহাড়ি ভাষা ও বর্ণমালাগুলো অবহেলিত। স্বদেশি বর্ণমালা হিসেবে বাংলা বর্ণমালার পরেই চাকমা বর্ণমালার স্থান।

পাহাড়িরা মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে চায়। শিক্ষা কার্যক্রমে যদি মাতৃভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তাহলে শিক্ষা গ্রহণের সাথে মাতৃভাষার শিক্ষার বিষয়টিও একত্রে ঘটবে। নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষার ব্যবহার, চর্চা তখন বৃদ্ধি পাবে।
সরকারের ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও বিগত ২০১৪ সাল থেকে দেশের ৫টি ভাষাগত সংখ্যালঘু ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রমে অপূর্ণতা রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১১টি পাহাড়ি জাতির মধ্যে প্রধান হচ্ছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা। ফলে ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে তাদের অংশগ্রহণ বেশি। অপর দিকে ম্রো, খুমী, লুসাই, বম, পাংখোয়া, চাক ও খিয়াং ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ তেমন হয়না। সবদিক বিবেচনায় স্ব স্ব জাতির ভাষাকে শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ ভাষাকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।

পাহাড়িদের মধ্যে যারা সাহিত্যচর্চায়রত তারা স্বজাতীয় ভাষায় ও বাংলা উভয় ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে থাকেন। বাংলা বর্ণে পাহাড়ি ভাষার অনেক শব্দ সঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় না।

অপর দিকে নিজস্ব বর্ণমালায় লেখা হলে এর পাঠক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। পাহাড়িরা তাদের ভাষাকে শুধুমাত্র কথ্যরূপে প্রকাশ করে থাকে, লেখ্যরূপ প্রকাশে ব্যবহার করে থাকে বাংলাভাষা। সামাজিক যে কোনো কাজের আলোচনা স্বভাষায় করলেও সেগুলোর লিখিতরূপ দেয়া হয় বাংলা ভাষায়। পাহাড়িদের নিজ মাতৃভাষা ক্ষয় হচ্ছে শত শত বছর ধরে।

সরকারি উদ্যেগে উচিত ছিলো প্রাথমিক স্তর থেকে পাহাড়িদের বাধ্যতামূলকভাবে নিজ মাতৃভাষায় পড়াশুনা চালু করা, নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালায় শিক্ষা উপকরণগুলো তৈরি করা, উচ্চতর শ্রেণিতে পাহাড়িদের সংস্কৃতি ও ভাষা বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।

স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও বাংলাদেশে ভাষাগত সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আদিবাসীদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের দাবি উপেক্ষিত হয়েই আসছে। ফলে দেশের ৪৫টি নৃগোষ্ঠীর ২০লাখেরও বেশি মানুষ বংশ পরম্পরায় ভুলতে বসেছেন নিজস্ব ভাষার ঐতিহ্য, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, সাহিত্যকীর্তি। এমনকি আদিবাসী শিশুর নিজ মাতৃভাষায় অক্ষরজ্ঞান না থাকায় তাদের সংস্কৃতিও হচ্ছে মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্ত।

প্রয়োগিক ভাষা হিসেবে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার আগ্রাসী থাবায় ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে নৃগোষ্ঠীগুলোর নিজ নিজ ভাষার গৌরব।

সাধারণভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা হতদরিদ্র প্রধান প্রধান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন, মনিপুরী, গারো, সাঁওতাল ও খাসিয়া) প্রত্যেকেই নিজস্ব ভাষা ও নিজ ভাষার বর্ণলিপি অনেক সমৃদ্ধ। আবার কয়েকটি আদিবাসীগোষ্ঠির নিজস্ব বর্ণমালা না থাকলেও তাদের রয়েছে রোমান বর্ণমালায় ভাষাচর্চার ঐতিহ্য। কিন্তু চর্চার অভাবে এসব বর্ণমালা সবই এখন বিলুপ্ত প্রায়।

এর ফলে নতুন প্রজন্মের পাহাড়িরা নিজ ভাষায় কথা বলতে পারলেও নিজস্ব ভাষায় লিখতে তারা একেবারে প্রায় অজ্ঞ।অথচ মাত্র চারদশক আগেও পরিস্থিতি এতোটা বিপন্ন ছিলো না। তখন নিজ মাতৃভাষার লিখিত চর্চার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে শিশু শিক্ষায় ভাষাটির বর্ণপরিচয় চলতো।

চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সারাদেশের শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে আদিবাসী শিশুর ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। এর একটি কারণ ভাষাগত বাধা। পাহাড়ি শিশু বাসায় যে ভাষায় কথা বলছে, স্কুলে সে ভাষায় লেখাপড়া করছে না। বাংলা বুঝতে না পারার কারণে শিশু মনে পাঠ্যবই কোনো দাগ কাটছে না, স্কুলের পাঠ গ্রহণ করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই আমরা অন্তত প্রাথমিক শিক্ষায় পাহাড়ি শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের দাবি জানিয়ে আসছি। আমরা চাই, মাতৃভাষায় বর্ণপরিচয়, ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট-খাট অংক, নিজ জাতির ও বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষার পাশাপাশি যেন পাহাড়ি শিশু বাংলাতেও অন্যান্য পাঠ গ্রহণ করতে পারে। এটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্যও জরুরি।

দেবাশীষ রায় খানিকটা দুঃখ করেই বলেন, চার-পাঁচ দশক আগেও পাহাড়িদের মধ্যে ভাষাচর্চার এতটা বেহাল দশা ছিলো না। আমি ছোটবেলায় দেখেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক গুরুজনই চাকমা ভাষায় নিজেদের মধ্যে চিঠিপত্র লেখালেখি করতেন। মারমা ভাষাতে ও সে সময় লিখিতভাবে ব্যক্তিগত ভাব বিনিময় ও লেখালেখি চলতো। কিন্তু প্রতিযোগিতার যুগে এখনই চর্চাটুকুর সবই হারিয়ে গেছে।

পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চাকমারা একটি বড় অংশ। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ চাকমা বাস করে। চাকমাদের মধ্যে শিক্ষিত শ্রেণির মানুষ নিজেদের ভাষাও বর্ণমালাতে তেমন একটা ব্যবহার করেন না। এমনকি চাকমা ভাষায় যারা সাহিত্যচর্চা করেন, তারা ও চাকমা বর্ণমালা ব্যবহার না করে কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক বাংলা বর্ণে লেখেন।

পাহাড়ে চাকমা ভাষায় দুটি পত্রিকা বের হয়। একটি মাসিক, নাম আবাংপাঙ। মাঝে মধ্যে জুনিপহ্র নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও বের হয়। কিন্তু পত্রিকা দুটি বাংলা বর্ণমালায় ছাপা হয়। আবাংপাঙ-এর সম্পাদক শুভাশীষ চাকমা বলেন, চাকমা বর্ণমালায় পত্রিকা বের করলে পড়ার কেউ নেই।

১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে জনসংহতি সমিতি। আঞ্চলিক দলটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, ব্যবহারিক ক্ষেত্র যদি তৈরি করা না যায়, তাহলে সে ভাষা মানুষ শিখবে কেন? এর জন্য দরকার সরকারি উদ্যোগে পাহাড়িদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা।

এ অবস্থায় নৃগোষ্ঠীগুলো বিপন্ন নিজ মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার স্বার্থে নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে তুলেছেন বর্ণমালা শিক্ষার স্কুল। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের এসব স্কুলে আদিবাসী ভাষার সঙ্গে পরিচিতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেস্ব সংস্কৃতি ও জীবনাচার ও শিক্ষা দেওয়া হয়।বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক পাহাড়িদের প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিশু শিক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে তাদের লেখা আদিবাসী বর্ণ পরিচয়ের বইপত্র পড়ানো হচ্ছে।
পাহাড়িদের চৈত্র সংক্রান্তি এবং বর্ষবরণ উৎসব বৈসুক, সাংগ্রাই, বিঝু ও বিষুর আগে প্রতিবছর জুম এস্থেটিক কাউন্সিল (জাক)সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অনেক বছর ধরে সংকলন, সাময়িকী, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি প্রকাশ করে আসছে। এসব প্রকাশনায় নৃগোষ্ঠী বর্ণমালা ঠাঁই না পেলেও বাংলা বর্ণমালাতেই চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষার সাহিত্যস্থান করে নেয়।
তাই বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হলেও নিজ দেশেই উপেক্ষিত হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ভাষা।

লেখা : কমল দাশ

আজকের পত্রিকা/শায়েল/জেবি