তিন পার্বত্য জেলা হয়ে উঠেছে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু। ছবি : সংগৃহীত

বিগত বেশ কয়েক বছর থেকে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগ্রহের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঈদ সময়ের ভ্রমণ। ঐতিহ্যগতভাবে ঈদের ছুটিতে মানুষ শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে ছুটে যায়। কারণ এই সময়ে বেশ লম্বা ছুটি পায়, তাই তারা পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।

তবে বর্তমানে সেই প্রথার কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে মানুষ তাদের কিছুটা সময় অবকাশ যাপনের জন্য বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়।

বিগত ১০ বছরে ঈদকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের ভ্রমণ প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা কারণ দায়ী।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০১০ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিলো মাত্র ৭৮০ মার্কিন ডলার আর ২০১৮ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ১৭৫২ মার্কিন ডলারে। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এই পর্যটনের বিকাশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ঈদ পর্যটনের গুরুত্ব বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ব্যাপকতা লাভ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ঈদ পর্যটনকে কেন্দ্র করে।

এক পরিসংখ্যান অনুসারে, বিগত ঈদুল ফিতরে দেশটি প্রায় ৬০ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়া আয় করে। এই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার বালি পর্যটন কেন্দ্রে হোটেলগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ বুকিং ছিলো, যা অন্য সময়ে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে।

এই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় পর্যটকদের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক ঘুরতে যায়।

শুধুমাত্র ইন্দোনেশিয়া নয়, ঈদকে কেন্দ্র করে ভারত, মালেয়শিয়া, মিশর, তুরস্ক, আরব আমিরাতসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটক আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়, যা তাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বর্তমানে ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেগবান হয় আর পর্যটন শিল্প তার বাইরে নয়। বর্তমান সময়ে ঈদ কেন্দ্র করে পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রকার প্রস্তুতি থাকে। তারা আগাম চাহিদাকে মাথায় রেখে ও পর্যটকদের আকর্ষণ করতে বিশেষ বিশেষ অফার দিয়ে থাকে।

তবে বিগত কয়েক বছর থেকে পর্যটক আকর্ষণে বিভিন্ন ট্যুর অপারেটর সংগঠন ঈদের আগে পর্যটন মেলার আয়োজন করে থাকে। এতে দেশের ট্যুর অপারেটর, হোটেল, রিসোর্ট, এয়ারলাইন্স কোম্পানিসহ দেশি-বিদেশি অনেক সংগঠন অংশগ্রহণ করে থাকে।

ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হচ্ছে ও সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।

ঈদে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের জায়গায় থাকে কক্সবাজার। পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত হলো কক্সবাজার। সারা বছর বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে এই সমুদ্রসৈকতে নেওয়া হয় নানা রকম কর্মসূচি। ঈদ উপলক্ষে করেও তা অব্যাহত থাকে। তাই তো প্রতি ঈদে কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যায় পর্যটক আসে। পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি ঈদে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে কক্সবাজার। যেখানে সারাবছর কক্সবাজার ভ্রমণে আসে ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যটক।

এই সময় সব হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট পর্যটকে পরিপূর্ণ থাকে। তাছাড়াও দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রে সমাগম ঘটে বিপুল পর্যটকের। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সবুজে ঘেরা পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে ঢল নামে মানুষের।

এই তিন জেলা মূলত বয়সে তরুণ পর্যটকদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। এখানে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের প্রসার লক্ষণীয়। তাছাড়া বান্দরবানের নীলাচল, নীলগীরি, স্বর্ণমন্দির, রাঙ্গামাটির মেঘের রাজ্য সাজেক, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু, খাগড়াছড়ির রিছাং ঝরনা, আলুটিলা গুহা, দেবতার লেকসহ অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশ হাওর-বাওড় ও নদীমাতৃক দেশ। আর বিগত কয়েক বছর ধরে ঈদ উদযাপিত হয়ে আসছে বর্ষাকালে। বর্ষাকালে বিভিন্ন হাওর-বাওড় ও নদী কানায় কানায় পূর্ণ থাকে।

মূলত সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট জেলায় হাওর ও জলাভূমির অবস্থান। বর্ষায় সেখানে দিগন্তজুড়া জলরাশি। বর্তমানে এসব অঞ্চলে পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে তা আরো বাড়ানো সম্ভব হবে। পূণ্যভূমি সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় স্থাপনা ও সবুজ চা বাগান পর্যটকদের বারবার আকর্ষণ করে। সিলেটের জাফলং পর্যটন কেন্দ্র, বিছানাকান্দি, রাতারগুল বেশ পরিচিতি লাভ করেছে।

বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার অঞ্চলে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে সেখানে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের কিছু হোটেল ও রিসোর্ট। এসব হোটেল ও রিসোর্ট বিশেষ করে ঈদ মৌসুমে পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ থাকে।

তাছাড়া কুয়াকাটা, খুলনা, কুমিল্লাসহ দেশের অন্যান্য জেলার দর্শনীয় স্থানের ঈদে পর্যটকের উপস্থিতি অনেক পরিমাণে বেড়ে যায়। বর্তমানে ঢাকার আশেপাশে বিশেষ করে গাজীপুরে ব্যাপকহারে রিসোর্ট গড়ে ওঠেছে।

মূলত কর্মব্যস্ত ঢাকার মানুষের বিনোদনের চাহিদার কথা মাথায় রেখে এই রিসোর্টগুলো গড়ে ওঠে। এসব রিসোর্টে নানা ধরনের বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে এসব রিসোর্ট আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পার্ক, অ্যামিউজমেন্ট পার্কে পর্যটকের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নন্দন পার্ক, গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, ফ্যান্টাসি কিংডম, জাতীয় শিশু পার্কসহ অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্র মানুষের উপস্থিতি বাড়ে।

ঈদে শুধু দেশেই নয়, বিদেশে ভ্রমণের প্রতিও মানুষের আগ্রহ দিন দিন বেড়েছে। অনেক সময় বাড়তি পর্যটকের চাপ সামলাতে এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোকে সমস্যায় পড়তে হয়।

বিদেশ ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের প্রধান পছন্দের জায়গা হলো ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ। তবে বর্তমানে দেশীয় পর্যটন বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশ নির্ভর পর্যটন কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
মানুষের ভ্রমণ চাহিদা তার সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষ তার ক্লান্তি, অবসাদ, ব্যস্তজীবন ভুলে নিজেকে চাঙ্গা করে তুলে ভ্রমণের মাধ্যমে। আর বাংলাদেশের মানুষ এই জন্য ঈদের সময়টা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে চায়।

সর্বোপরি সঠিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও অনান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশে ঈদ নির্ভর পর্যটন আরো বাড়বে। পর্যটন বিকাশে স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

যাতে তারা পর্যটন থেকে সরাসরি লাভবান হয় সেইদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এতে আমাদের দেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উন্নতি লাভ করবে।

লেখক : ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস