এম. এ. খায়ের নিজামী, সভাপতি, বাংলাদেশ বন্ধু ফোরাম, আরব আমিরাত। ছবি: সংগৃহীত

“ঈদ” মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই “ঈদ” নামক শব্দটিকে আল্লাহ আমাদের মাঝে প্রতি বছরে দুইবার করে পালন করার সুযোগ দিয়েছেন এবং এই দুটি ঈদ’ই পালন হয় শত-শ্রদ্ধ ত্যাগ তিতিক্ষার অবসানের পর বরেণ্য খুশির বন্যা বইয়ে দিয়ে। তৎমধ্যে একটি পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনা পর এবং অপরটি সম্পদের ত্যাগের পরিত্রাণ।

এখন আমরা জেনে নিতে পারি এই “ঈদ” এরকিছু কথা:
হাদিসে শরীফে বর্ণিত আছে, ‘রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ যখন মদিনাতে আগমন করলেন, তখন মদিনায় দুটো দিবস পালিত হতো, যে দিবসে তারা (মদিনার লোকজন) খেলাধুলার মাধ্যমে আনন্দঘন মুহূর্তকে অতিবাহিত করতো।

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এ দুই দিনের তাৎপর্য কী? মদিনাবাসীগণ বললেন, আমরা এ দুই দিনে (আনন্দ) খেলাধুলা করি। তখন রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ তাআ’লা এ দুই দিনের পরিবর্তে তোমাদের জন্য এই খুশির চেয়েও আরও শ্রেষ্ঠ খুশির দুটো দিন দান করেছেন। তার মধ্যে একটি হলো “ঈদ-উল-ফিতর” এবং অপরটি হলো “ঈদ-উল-আজহা” (আবু দাউদ)

এই হলো ঈদের সূচনা। তারপর থেকেই রাসুল (সা:) এর খুসখবরীতে মুসলমানরা দুই ঈদ আদায় করে থাকেন। “ঈদ” হচ্ছে আরবি শব্দ। যার অর্থ হলো ফিরে আসা। ঈদ যেহেতু মুসলমানের দ্বারে দ্বারে বার বার আনন্দের বার্তা নিয়ে ফিরে আসে, সঙ্গত কারণেই এ আনন্দকে ঈদ হিসেবে নাম করণ করা হয়েছে।

এই পরিপেক্ষীতে বিশ্বের সমগ্র মুসলিম জাতী যেমনিভাবে আল্লাহর হুকুম আদায়ে পবিত্র মাহে রমজানে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা বা রোজা পালন করেন তেমনি ভাবে এই রোযা পালনের পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনে “ঈদ” বা আনন্দ উদযাপন করে থাকে। যে আনন্দ উদযাপন প্রতিটি মুসলিম পরিবারের মধ্যে এনে দেয়- কবিতার ভাষায়-

“পুর্ব-লালিত মনোমালিন্যের প্রত্যাহার,
স্বঘোষিত নতুনত্বের অনন্য বাহার,
জন্ম দেয় পারিবারিক অফুরন্ত ভালবাসার,
সকল বেদাভেদকে চিরতরে মানাতে হার”

ঈদুল ফিতর দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাৎপর্য হলো আল্লাহ তাআলা এ দিনে তার রোজাদার বান্দাদের নিয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করেন এবং তাঁর ইহসানের দৃষ্টি বার বার দান করেন। কেননা মুমিন বান্দারা আল্লাহর নির্দেশে রমজানে পানাহার ত্যাগ করেছেন আবার রমজানের পর তাঁরই নির্দেশে পানাহারের আদেশ পালন করে থাকেন। তাই দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল-ফিতরের মাধ্যমে বান্দাকে আল্লাহ তায়ালা পানাহারে মুক্ততা প্রকাশ করে দেন। তাই এই ঈদকে “ঈদ-উল-ফিতর” বলে নাম করণ করা হয়েছে।

প্রবাসীদের ঈদ প্রসঙ্গ:
সকলের অজানা হলেও এটাই সত্য যে, প্রবাসে যে বা যারা বসবাস করছে, তাদের জন্য ঈদ বলতে কিছুই নেই। তাদের প্রকৃত ঈদ হলো ফজরের নামাজের পর পরই ঈদের নামাজ পড়ে বাসায় এসে নিরবে ঘুমের মাধ্যমে স্বজনদের ভুলে থাকার বেদনাটুকু ভুলে গিয়ে সময় পার করা।

মাহে রমজানে সারাদিন রোজা রেখে রোদে পুডে ঘাম ঝরিয়ে অত্যন্ত কষ্ট জর্জরিত অবস্থায় ডিউটি পালনের মাধ্যমে অর্জিত হয় সামান্যতম বেতন। যা কি না নিজের চলার মত কিছু খরচ করলো বা নাই করলো তাড়াতাড়ি দেশে স্বজনদের পাঠিয়ে দেওয়ার চিন্তা করে যায় প্রতিনিয়ত। পরিবারের সকলকে নতুন জামা কাপড় সহ পর্যাপ্ত পরিমানের মার্কেটিং এবং বাড়ীর অন্যান্য যাবতীয় খরচাদি সামলাতে সামলাতে নিজের জন্য কোন কিছু কেনা কাটা করার খবরই থাকে না প্রবাসীদের।

পক্ষান্তরে প্রবাসীরা প্রায় সবাই মা-বাবার কথা, স্ত্রী-সন্তানের কথা, ভাই-বোনের কথা সহ আত্মীয় স্বজনদের কথা চিন্তা করে যা বেতন পায় তা সবই বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। সবাইকে যার যার মত খুশি করতে গিয়ে পরে দেখা যায় নিজের জন্য কিছুই নাই। সেই পরিশ্রম ও কষ্টের সাথে আরো মিশ্রিত হয় স্বজনদের কাছে না পাওয়ার বেদনা। সব মিলিয়ে এটুকুই হচ্ছে প্রবাসীদের “ঈদ” যা পরিবারের সকলকে খুশি করতে গিয়ে শুধু মাত্র ঘুমের মাধ্যমে হাজারো না ভুলা কষ্টগুলো একটু ভুলে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে সবাই।

তাই বাংলাদেশী সকল প্রবাসীদের (বিশেষ করে আরব আমিরাতে অবস্থিত) যাবতীয় ক্লান্তি দুর করার প্রচেষ্টায় আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম ও বাংলাদেশীদের সর্বস্তরের প্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন “বাংলাদেশ বন্ধু ফোরাম” এর মাধ্যমে সকলকে একই স্থানে একত্রিত করে অন্তত স্বজনদের কাছে না পাওয়ার ব্যাথা ও কষ্টগুলোকে ভুলিয়ে থাকার প্রচেষ্টায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঈদ পুণর্মিলনী ও বিভিন্ন আলোচনা সভার মাধ্যমে সকলকে এক স্থানে জডো করে আনন্দকে ভাগাভাগি করে সুন্দর ভাবে প্রবাসের সময় গুলো পার করাতে চাই। আশা করি সকলে এই ঈদেও আমাদের সাথে থাকবেন। এই প্রত্যাশা রেখে সবাইকে ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক জানাচ্ছি।

লিখেছেন-
এম. এ. খায়ের নিজামী
সভাপতি
বাংলাদেশ বন্ধু ফোরাম,
আরব আমিরাত।