ঈদকে সামনে রেখে এ মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার জামদানি বেচা-কেনা হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। ছবি : সংগৃহীত

বাঙালি নারীর পোশাক বলতে এক কথায় শাড়ি। আর শাড়ির মধ্যে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী হচ্ছে বাংলাদেশের গর্ব জামদানি শাড়ি। সারা পৃথিবীকে চমক দেখানো মুসলিনের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে এই জামদানি।

‘জামদানি’ একটি ফার্সি শব্দ। ‘জাম’ হচ্ছে পারস্য দেশীয় একশ্রেণির উৎকৃষ্ট সুরা, আর দানি হচ্ছে বাটি বা পেয়ালা। অর্থাৎ উৎকৃষ্ট সুরা ধারণকারী পাত্র।

জামদানির ঐতিহ্য প্রায় ২শ’ বছর আগের। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাদা কাপড়ের ওপর ফুলের ডিজাইন করা উচ্চ দামের জামদানি দিল্লি, মুর্শিদাবাদ ও নেপালের নবাব ও বাদশাহরা ব্যবহার করতেন। সেই ২শ’ বছর আগে থেকেই বিখ্যাত রূপগঞ্জের জামদানি।

সামনে ঈদ। তাই কর্মব্যস্ততা বেড়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া জামদানিপল্লীর তাঁতিদের। জামদানিশিল্পীরা এখন কাপড় বুনতে গিয়ে সময় করে উঠতে পারছেন না অন্য কিছু করার। উৎসবকে সামনে রেখে তাদের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। চলতি বছরের ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩০ কোটি টাকার জামদানি দেশের বিভিন্ন বিপণিবিতানে যাবে। যাবে দেশের বাইরেও। এমনটাই জানালেন তাঁতিরা।

ফুলতেরছি, ছিটার তেরছি, ছিটার জাল, সুই জাল, হাটুভাঙ্গা তেরছি, ডালম তেরছি, পার্টির জাল, পান তেরছি, গোলাপ ফুল, জুঁই ফুল, পোনা ফুল, শাপলা ফুল, গুটি ফুল, মদন পাইড়সহ প্রায় শতাধিক নামের জামদানি বুনন হয় এই পল্লীতে। এগুলোর মধ্যে ছিটার জাল, সুই জাল ও পার্টির জাল নামের জামদানির মূল্য সবচেয়ে বেশি।

জামদানিপল্লীতে গড়ে ওঠেছে জামদানির আড়ং। এ আড়ংয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার জামদানির হাট বসে। ছবি : সংগৃহীত

এসব জামদানি শাড়ির দাম পড়ে প্রতিটি প্রায় ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর শাড়ি বুনতে সময় লাগে প্রায় ৩ থেকে ৬ মাস। এছাড়া ২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার জামদানি শাড়িও রয়েছে। কম দামের মধ্যে ওই সব শাড়ি বুনতে সময় লাগে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস।

জামদানিশিল্পীদের সংখ্যা দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে এখানে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার জামদানি তাঁতি ছিলেন।
জেলা জামদানি তাঁতশিল্প শ্রমিক ইউনিয়নসূত্র জানায়, ৬০ হাজার লোক এ শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে দেড় হাজার পরিবার এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

কথা হয় জামদানি তাঁতি আজহার হোসেন, হাসেম আলী ও টিপু ভুঁইয়ার সঙ্গে।

তারা জানান, বংশের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এ পেশায় রয়েছেন তারা। প্রতিমাসে অল্প মূল্যের ৩/৪টি শাড়ি বুনতে পারেন তারা। আর এ শাড়ি বিক্রির টাকা দিয়েই চলে তাদের সংসার।

বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা, সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি শাড়ি রফতানি হচ্ছে। এ রফতানির সঙ্গে জড়িত জামদানি শাড়ির ব্যবসায়ীরা। তাঁতিদের কাছ থেকে তাঁরা শাড়ি কিনে রফতানি করে থাকেন। প্রতিবছর জামদানিপল্লী থেকে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি রপ্তানি করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, করাচী, লাহোরে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছরই হয় জামদানিমেলা।

জামদানি শাড়ির বিক্রিকে ঘিরে শীতলক্ষ্যার পাশে ডেমরায় ও নোয়াপাড়া জামদানিপল্লীতে গড়ে ওঠেছে জামদানির আড়ং। এ আড়ংয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার জামদানির হাট বসে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ও ব্যবসায়ীরা আসেন এখানে জামদানি শাড়ি কিনতে। প্রায় দুই শতাধিক পাইকার বিভিন্ন প্রকার জামদানি ক্রয় করে দেশ-বিদেশে বিক্রি করে আসছেন। দুটি হাটে প্রতিমাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি বেচা-কেনা হয় বলে বিক্রেতারা জানান। ঈদকে সামনে রেখে এ মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার জামদানি বেচা-কেনা হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস/জেবি