ইসলাম ও অর্থের প্রতীকী। ছবি: আজকের পত্রিকা

ঋণ-কর্জ মানুষের তথা সমাজের একটি প্রয়োজনীয় লেনদেন। সমাজে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তি জীবন-যাপন করার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো সময় ঋণ নেওয়ার কিংবা অন্যকে দেওয়ার সম্মুখীন হতে হয়। তবে এই মানবীয় সুন্দর নিয়ম এবং অপরকে সহযোগিতা করার এই ইসলামী সুপ্রথাও অনেক সময় কুমতলবীর চক্রান্তে ও মায়াজালে ফেঁসে বিদ্বেষ, ঝগড়া-ঝাঁটি এমনকি বড় রকমের শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর অনেকে তো এই ঋণ প্রথাকেই পুঁজি জমা করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বে পুঁজিপতি হয়েছে ও হচ্ছে। আর দরিদ্র সম্প্রদায় তাদের মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে ঋণের জাঁতায় পিষ্ট হচ্ছে।

আমরা এই প্রবন্ধে ইসলামে ঋণের বিধি-বিধান সম্পর্কে কিছুটা জানার চেষ্টা করবো। যেন ঋণের সঠিক বিধান জানতে পারি এবং বেঠিক বিধান হতে নিরাপদে থাকতে পারি। ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ।ঋণের অর্থঃ ঋণের আরবী শব্দ ‘কায্র্’, যা প্রচলিত বাংলা ভাষায় কর্জ নামে পরিচিত। এর বাংলা সমার্থবোধক শব্দ হচ্ছে, দেনা, ধার, হাওলাদ ইত্যাদি।শরীয়তের পরিভাষায় ঋণঃ মাল-পণ্য অপরকে প্রদান করা, যেন তার মাধ্যমে সে উপকৃত হয়, অতঃপর দাতাকে সেই মাল কিংবা তার অনুরূপ ফেরত দেওয়া। [ফিক্হ বিশ্বকোষ, খন্ড ৩৩, পৃঃ১১১]ঋণের বৈধতাঃ ঋণ প্রথা বৈধ, যা সুন্নত এবং ইজমা (ঐক্যমত) দ্বারা প্রমাণিত। [মুগনী, ইবনু কুদামাহ,৬/৪২৯]

নবী (সাঃ) একদা এক উষ্ট্রী ধার নেন এবং ফেরত দেওয়ার সময় সেই সমগুণের উষ্ট্রী না পাওয়ায় তার থেকে উত্তম গুণের পুরুষ উট ফেরত দেন এবং বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি সে, যে উত্তম ঋণ পরিশোধকারী।’’ [বুখারী ,অধ্যায়,ইস্তিকরায, নং২৩৯০]

ঋণ যোগ্য জিনিসাদিঃ অর্থাৎ কি কি জিনিস ঋণের অন্তর্ভুক্ত, যা ঋণ হিসাবে আদান-প্রদান করা যেতে পারে? এ বিষয়ে ফুকাহাদের মতভেদ বিদ্যমান। তবে নির্ভরযোগ্য মত হচ্ছে, প্রত্যেক এমন বস্তু যা বিক্রয় করা বৈধ, তা ঋণ দেওয়াও বৈধ। [যাদুল্ মুস্তাক্বনা’, হিজাভী/২১২]

ঋণ প্রদানের ফযীলতঃ ঋণ প্রদান একটি নেকির কাজ, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। এর মাধ্যমে লোকের সাহায্য করা হয়, তাদের প্রতি দয়া করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সমস্যা হ্রাস করা হয় কিংবা সমাধান করা হয়।নবী (সাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ব্যক্তির দুনিয়াবী বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা তার আখেরাতের বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবীর কষ্ট সহজ করবে, আল্লাহ তার দুনিয়া ও আখেরাতে সহজ করবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণে বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্য করে। [মুসলিম,অধ্যায়ঃ যিকর, দুআ,তাওবাহ ও ইস্তিগফার]নবী (সাঃ) আরো বলেনঃ যে কেউ কোনো মুসলিমকে দুই বার ঋণ দেয়, তা সেই অনুযায়ী এক বার সাদাকা করার মত। [ইবনু মাজাহ, সূত্র হাসান,ইরওয়াউল গালীল নং১৩৮৯]

ঋণ লেন-দেনে মেয়াদ নির্ধারণঃ বিষয়টির ব্যাখ্যা হচ্ছে, ঋণ দাতা এবং ঋণ গ্রহীতা লেন-দেনের সময় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণ করতে পারে কি পারে না? সঠিক মত হচ্ছে, মেয়াদ নির্ধারিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে মেয়াদ বৃদ্ধিও করতে পারে। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেনঃ হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধারে কারবার করবে, তখন তা লিখে রাখবে। [সূরা বাকারাহ – ২৮২] অতঃপর মেয়াদ নির্ধারিত থাকলে ঋণদাতা নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ঋণ গ্রহীতার নিকট থেকে ঋণ ফেরত নেওয়ার দাবী করতে পারে না। বরং সে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য। কারণ নবী (সাঃ) বলেনঃ মুসলিমগণ শর্ত পূরণে বদ্ধপরিকর। [আহমদ,আবু দাউদ,তিরমিযী]ঋণের মাধ্যমে লাভ অর্জনঃ ইসলামে ঋণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষকে সাহায্য করা, তাদের প্রতি দয়া করা তথা তাদের জীবন-যাপনে সহযোগিতা করা,সহযোগিতার আড়ালে সুবিধা অর্জন নয়। তাই বলা হয়েছে, ঋণের উদ্দেশ্য হবে আধ্যাত্বিক বৃদ্ধি বাহ্যিক বৃদ্ধি নয়। আর তা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এই কারণে ঋণ গ্রহীতা ঋণ ফেরত দেয়ার সময় যা নিয়েছে তা কিংবা সেই অনুরূপ ফেরত দিতে আদিষ্ট, অতিরিক্ত নয়। ঋণ দাতা এর অতিরিক্ত নিলে কিংবা ঋণ গ্রহীতা অতিরিক্ত ফেরত দিলে, তা সুদ হিসাবে গণ্য হবে। কারণ ফিক্হী মূলণীতিতে উল্লেখ হয়েছে,‘কুল্লু কার্যিন র্জারা নাফ্আন ফাহুআ রিবা।’ অর্থাৎ প্রত্যেক ঋণ, যার মাধ্যমে লাভ উপার্জিত হয়, তা সুদ। প্রকাশ থাকে যে, উপরোল্লেখিত ফিকহী মূলণীতিটি হাদীস হিসাবে যয়ীফ (দুর্বল)। দেখুন, ইরওয়াউল গলীল,আলবানী, নং ১৩৯৮। তবে কায়েদা ফিকহিয়্যাহ (ফিকহী মূলণীতি) হিসাবে স্বীকৃত।

ঋণের মাধ্যমে লাভের উদাহরণঃ কাউকে এক হাজার টাকা ধার দেওয়া এবং ফেরত নেওয়ার সময় বেশী নেওয়া। এটা স্পষ্ট। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া এই উদ্দেশ্যে বা এই শর্তে যে, ঋণ গ্রহীতা ঋণ দাতার কিংবা তার পরিবারের কাউকে চাকরি দিবে বা দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। কাউকে ঋণ দেওয়া এই উদ্দেশ্যে যে, সে তাকে ঘর বা দোকান ভাড়া দিবে কিংবা এ ধরনের অন্য কিছু, যা সমাজের অনেকাংশে প্রচলিত।

ইসলামে উত্তম ঋণ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং বর্তমান ব্যাংকিং প্রথা, একটি সংশয় নিরসনঃ

ইসলাম ঋণ দেওয়াকে যেমন লোকের সাহায্য তথা তাদের কষ্ট দূরীকরণ হিসাবে স্বীকার করে, তেমন ঋণ পরিশোধে উত্তম দৃষ্টান্ত পেশ করে। তাই ঋণ গ্রহীতা ঋণ ফেরত দেয়ার সময় বেশি বা উত্তম ফেরত দিতে পারে, যাকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘হুসনুল্ কাযা’ বা উত্তম পরিশোধ বলা হয়।আবু রাফে হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একদা নবী (সাঃ) এক ব্যক্তি হতে একটি উষ্ট্রী ধার নেন। তার পর সাদাকার উট আসলে আবু রাফেকে আদেশ দেওয়া হয়, সে যেন সেই ব্যক্তির উট ফেরত দেয়। আবু রাফে (রাযিঃ) ফিরে এসে বলেঃ [সেই সমগুণের উট নেই বরং তার থেকে উত্তম] রুবায়ী মুখতার [এমন পুরুষ উট যা ছয় বছর বয়স অতিক্রম করে সপ্তম বছরে প্রবেশ করেছে এমন] উট আছে। নবী (সাঃ) বলেনঃ তাই দিয়ে দাও; কারণ ভাল মানুষ তারা যারা উত্তম পরিশোধকারী। [মুসলিম, অধ্যায়ঃ বয়ূ, নং ৪১০৮]

অনেকে ইসলামের এই সুন্দর বিধান না বুঝতে পেরে, কিংবা না বোঝার ভান করে, কিংবা অপরিপক্ক জ্ঞানের কারণে কিংবা অন্তরে প্রবৃত্তির রোগ থাকার কারণে, বিষয়টিকে বর্তমান ব্যাংকিং প্রথায় অতিরিক্ত প্রদান করা ও অতিরিক্ত গ্রহণ করা বৈধ বলে ফতোয়া দিয়েছে। তাদের মন্তব্য, নবী (সাঃ) যেমন ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় বেশী দিলেন এবং ঋণ দাতা বেশী গ্রহণ করলেন, তেমন আমরা ব্যাংকে ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় যদি বেশী দেই এবং তারা সেটা গ্রহণ করে তো অবৈধতার কিছু নেই। উত্তরে বলবো, নবী (সাঃ) এর ঋণ ফেরতে বেশি দেওয়া এবং বর্তমান যুগের ব্যাংকিং প্রথায় বেশী লেন-দেনের প্রথার মধ্যে বিরাট পার্থক্য বিদ্যমান। প্রথমতঃ নবী (সাঃ) কে ঋণ দাতা ঋণ প্রদানের সময় কোনো শর্ত দেয়নি যে, ঋণ ফেরত কালে বেশী ফেরত দিতে হবে। অন্যদিকে বর্তমান ব্যাংক সুক্ষ্ম হিসাবের মাধ্যমে বেশী দেওয়ার শতকরা হার নির্ধারণ করে দেয় এবং নির্ধারিত সময়ে তা ফেরত না দিতে পারলে শতকরা হার আরোও বৃদ্ধি পায়। আসলে ব্যাংক এই চক্রের মাধ্যমেই অর্থায়ন করে থাকে, আর আমরা বুঝেও বুঝি না।দ্বিতীয়তঃ সমাজে এটা পরিচিত ছিল না যে,নবী (সাঃ) কে ঋণ দিলে তিনি অতিরিক্ত ফেরত দেন। বরং তিনি হঠাৎই এই রকম আদেশ দেন।

এই কারণে ইসলামী পন্ডিতগণের ঐক্যমত রয়েছে যে, যে কোনো ঋণে যদি বেশি ফেরতের শর্ত থাকে, তাহলে সেটা হারাম।ইবনুল মুনযির বলেনঃ ‘তাদের ঐক্যমত রয়েছে যে, ঋণ দাতা যদি ঋণ গ্রহীতাকে ঋণ ফেরতের সময় বেশী দেওয়া কিংবা হাদিয়া সহ ঋণ ফেরত দেওয়ার শর্ত দেয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে বেশি নেওয়াটা সুদ।’ [মুগনী,৬/৪৩৬]

তাই ঋণ ফেরতের সময় বেশি গ্রহণ বৈধ নয়, যতক্ষণে দুটি শর্ত না পাওয়া যায়। ক- ঋণ দাতা ঋণ গ্রহীতার সাথে লাভ নেওয়ার শর্ত দেয় নি। খ- সমাজে বেশি দেওয়ার প্রথা প্রচলিত ও নয়।যদি শর্ত দেওয়া হয় কিংবা এটা সমাজে প্রচলিত থাকে, তাহলে বেশি নেওয়া সুদ হবে। এখানে প্রচলিত শব্দটির উল্লেখ এই কারণে করা হচ্ছে যে, শারিয়া মূলনীতিতে প্রচলিত প্রথা শর্তর মতই। অর্থাৎ শর্তারোপ তো করে না কিন্তু প্রথা ও প্রচলন অনুযায়ী বেশি নেয় বা দেয়, তাহলে সেটা শর্ত হিসাবেই গণ্য হবে।

ঋণ পরিশোধে বিলম্ব না করাঃ ঋণ দাতা যখন মানুষের উপকার্থে ঋণ প্রদান করে, তখন ঋণ গ্রহীতার দ্বীনী ও নৈতিক দায়িত্ব হবে তা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া। যদি এইরকম না করে টাল-বাহানা শুরু করে, মিথ্যা ওজর পেশ করতে লাগে, তাহলেই আপসে মিল-মুহব্বত ও ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয়, শত্রুতা বৃদ্ধি পায় এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস যোগ্যতা হারায়।মহান আল্লাহ বলেনঃ উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ছাড়া আর কি হতে পারে? [সূরা আর রাহমান – ৬০]তিনি অন্যত্রে বলেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, হকদারদের হক তাদের নিকট পৌঁছে দিতে। [ সূরা নিসা – ৫৮]নবী (সাঃ) বলেনঃ ধনী ব্যক্তির টাল-বাহানা করা অত্যাচার। [মুত্তাফাকুন আলাইহ]তিনি (সাঃ) আরো বলেনঃ যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে, সে তিনটি স্বভাব থেকে মুক্ত ছিল, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেঃ অহংকার, গনীমতের সম্পদ হতে চুরি এবং ঋণ। [ইবনু মাজাহ, আলবানী (রহঃ) সহীহ বলেছেন]ঋণ

পরিশোধের পূর্বে মৃত্যুবরণঃ ঋণ মানুষের হক-পাওনা, তা পূরণের পূর্বে মৃত্যুবরণ করা মানে মানুষের হক নিজ স্কন্ধে থেকে যাওয়া, যা বড় অপরাধ। সেই কারণে এই প্রকার ব্যক্তির জানাযার নামায নবী (সাঃ) নিজে পড়েন নি। ইমাম তিরমিযী হাসান-সহীহ সনদে আবু ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত করেন, নবী (সাঃ) এর কাছে একদা এক ব্যক্তির জানাযা নিয়ে আসা হলে, তিনি (সাঃ) বলেনঃ তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়; কারণ সে ঋণী। [তিরমিযী, অধ্যায়ঃ জানাযা, নং১০৬৯]এই কারণে ইসলামী পন্ডিতগণ বলেন, মাইয়্যেতের তারেকাহ (উত্তরাধিকার) বন্টণের পূর্বে কয়েকটি হক নির্ধারিত, তা পূরণের পরেই তার উত্তরাধিকার বন্টিত হবে। তন্মধ্যে মাইয়্যেতের উপর অপরের হক সমূহ অন্যতম। সেই হক আল্লাহর হোক, যেমন যাকাত কিংবা মানুষের হক হোক, যেমন ঋণ। [আল্ মুলাখ্খাস আল্ ফিক্হী, ড. ফাউযান/৩৩৪]অভাবী

ঋণীকে অবকাশ প্রদানঃ সমাজে যেমন কিছু লোক পাওয়া যায়, যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ঋণ শোধ করতে ঢিলেমি করে, তেমন সত্যিকারে এমন লোকও রয়েছে যারা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম। এই রকম ব্যক্তিকে ইসলাম অতিরিক্ত সময় দিতে উদ্বুদ্ধ করে।আল্লাহ তাআলা বলেনঃ যদি ঋণী দরিদ্র হয়, তবে স্বচ্ছল অবস্থা আসা পর্যন্ত অবকাশ দিবে আর মাফ করে দেয়া তোমাদের পক্ষে অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে! [ সূরা বাক্বারাহ – ২৮০]নবী (সাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, আল্লাহ তাকে কিয়ামত দিবসের কষ্ট থেকে নিষ্কিৃতি দিবে, সে যেন অভাবী ঋনীকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণের বোঝা লাঘব করে। [মুসলিম, অধ্যায়, ক্রয়-বিক্রয়, নং ৪০০০]এখানে একটি বিষয় বর্ণনা করা জরূরী মনে করছি, তা হল, ঋণ গ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে ঋণ ফেরত দিতে না পারে, তাহলে তাকে অবকাশ দিতে হবে বিনা লাভের শর্তে। কিন্তু যদি ঋণ দাতা তার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় এবং এর বিনিময়ে লাভ নেয় তাহলে তা স্পষ্ট সুদ হবে। যেমন কেউ এক বছর পর তার ঋণ ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু বছর শেষ হলে সে ফেরত না দিতে পারায় ঋণ দাতার নিকট আরো ৫ মাস সময় বাড়িয়ে দেয়ার আবেদন করলো। অতঃপর ঋণ দাতা তাকে বললোঃ ঠিক আছে মেয়াদ বাড়াবো কিন্তু এর বিনিময়ে তোমাকে ঋণ ফেরতের সময় মূল ধনের বেশি দিতে হবে। অর্থাৎ সময় বৃদ্ধির বিনিময়ে লাভ গ্রহণ। এটা স্পষ্ট সুদ, যা নবী (সাঃ) এর যুগে আরবের জনপদে ছিল এবং তা এখনও বিদ্যমান। [আল্ মুলাখ্খাস আল ফিকহী, ড.ফাউযান /২৩৭]

ঋণ পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণঃ আজ-কাল সমাজে আর এক প্রকার লোক দেখা যায়, যারা ঋণ নেয় পরিশোধ না করার উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ আসলে তার অন্তরে থাকে অন্যের অর্থ কৌশলে আত্মসাত করা। আর ঋণ করাটা হচ্ছে তার একটি বাহানা মাত্র। এই রকম লোকেরা এক সাথে কয়েকটি হারাম কাজে লিপ্ত হয়। ১ – বাতিল পদ্ধতিতে অন্যের মাল-সম্পদ ভক্ষণ, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। [বাক্বারাহ/১৮৮] ২ – ধোকা তথা প্রতারণা। ৩ – জেনে বুঝে সজ্ঞানে গুনাহ করা। ৪ – মিথ্যা বলা। নবী (সাঃ) বলেনঃ যে ব্যক্তি অন্যের মাল পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাআলা তার পক্ষ হতে পরিশোধ করে দেন। (পরিশোধ করতে সাহায্য করেন) আর যে ব্যক্তি তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তা নষ্ট করে দেন। [বুখারী, অধ্যায়ঃ ইস্তিকরায, নং২৩৮৭]তাদের এই রকম জঘন্য কাজ থেকে বিরত থাকা উচিৎ। কারণ মানুষের এই হক পৃথিবীতে আদায় না করা হলেও আখেরাতে আল্লাহর দরবারে তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। বরং আল্লাহ তা নিজে আদায় করে দিবেন।

ঋণের যাকাতঃ অর্থাৎ কেউ কাউকে ঋণ দিলে এবং সেই ঋণ যাকাতের আওতায় পড়লে, যাকাত কাকে দিতে হবে? ঋণ গ্রহীতাকে যার কাছে সেই মাল আছে? না ঋণ দাতাকে? আসলে সেই অর্থ, দাতার নিকট থেকে গ্রহীতার কাছে স্থানান্তর হয়েছে মাত্র। নচেৎ প্রকৃতপক্ষে তার মালিক দাতাই। সেই কারণে ঋণ দাতাকেই সেই মালের যাকাত দিতে হবে। তবে ইসলামী গবেষকদের নিকট বিষয়টির একটু ব্যাখ্যা রয়েছে, তা হলঃ ঋণ গ্রহীতা যদি অভাবী হয়, যার কারণে সে সঠিক সময়ে ঋণ ফেরত দিতে অক্ষম কিংবা সক্ষম তবে টাল-বাহানাকারী , যার থেকে ঋণ আদায় করা কষ্টকর। এই ক্ষেত্রে ঋণ দাতার প্রতি সেই মালের যাকাত দেওয়া জরূরী নয়, যতক্ষণে তা তার হাতে না আসে। আর যদি ঋনী ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে সক্ষম হয় তথা সেই ঋণ পাওয়ার পুরো সম্ভাবনা থাকে, তাহলে যাকাতের সময় হলেই ঋণ দাতাকে তার যাকাত আদায় করতে হবে। [ফতোয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি, ৯/১৯১, ফতোয়া নং ৯০৬৯]তবে টাল-বাহানাকারীর কাছ থেকে কয়েক বছর পর ঋণ পাওয়া গেলে বিগত সব বছরের যাকাত দিতে হবে না এক বছরের দিলেই হবে? এ ক্ষেত্রে উপরোক্ত ফাতাওয়া কমিটি এক বছরের দিলেই হবে বলে ফাতওয়া দিয়েছেন। [ ফাতাওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি,৯/১৯০]ঋণ হতে আশ্রয় প্রার্থনা এবং ঋণ পরিশোধের দুআঃ নবী (সাঃ) ঋণ হতে আল্লাহর নিকট বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যা দেখে এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেনঃ আল্লাহর রাসূল! আপনি ঋণ থেকে খুব বেশি বেশি আশ্রয় প্রার্থনা করেন?নবী (সাঃ) বলেনঃ মানুষ ঋণী হলে, যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে এবং অঙ্গীকার করলে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। [বুখারী, অধ্যায়ঃ ইস্তিকরায, নং ২৩৯৭]

তাই তিনি (সাঃ) বলতেনঃ উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা! ইন্নী আউযুবিকা মিনাল্ কাসালি, ওয়াল্ হারামি, ওয়াল্ মা’ছামি, ওয়াল্ মাগ্রাম॥অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় কামনা করছি অলসতা, অধিক বার্ধক্য, গুনাহ এবং ঋণ হতে।[মুসলিম, অধ্যায়ঃ যিকর ও দুআ, নং৬৮৭১]তিনি (সাঃ) আরো বলতেনঃ উচ্চারণঃ আল্লাহহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল্ হাম্মি ওয়াল্ হাযানি, ওয়াল্ আজ্যি ওয়াল্ কাসালি, ওয়াল্ বুখ্লি ওয়াল্ জুব্নি, ওয়া যালাইদ্দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজাল।অর্থ, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, চিন্তা-ভাবনা, অপারগতা,অলসতা, কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে। অধিক ঋণ থেকে এবং দুষ্ট লোকের প্রাধান্য থেকে। [নাসাঈ, অধ্যায়ঃ ইস্তিআযাহ, নং ৫৪৭৮]

লেখকঃ আব্দুর রাকীব মাদানী | দাওয়াহ সেন্টার, খাফজী, সৌদি আরব।

আজকের পত্রিকা/এমইউ/এমএইচএস