দুয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রিয় বসন্ত ফুল। ছবি: সংগৃহীত

‘আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে/এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়/আহা আজি এ বসন্তে’। প্রিয় বসন্ত দুয়ারে দাঁড়িয়ে, শীত বলছে- তবে আসি? ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে গাছে ধরেছে নতুন পাতা-ফুল। চারিদিক উৎসবমুখর। এ ঋতুতে বাংলার প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজাতে যে ফুলগুলো আসে, চলুন জেনে নেওয়া যাক তাদের রূপ ও গুণের বাহার-

কৃষ্ণচূড়া

ফুলের নাম- কৃষ্ণচূড়া। ছবি: সংগৃহীত

কৃষ্ণচূড়া চমৎকার পত্র-পল্লব এবং আগুনলাল ফুলের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষ্ণচূড়া গাছের লাল, কমলা, হলুদ ফুল এবং উজ্জল সবুজ পাতা একে অন্যরকম দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। এ ফুল মাদাগাস্কারের শুষ্ক পত্রঝরা বৃক্ষের জঙ্গলেও পাওয়া যায়। যদিও জঙ্গলে এটি বিলুপ্ত প্রায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি জন্মানো সম্ভব হয়েছে। সৌন্দর্য বর্ধক গুণ ছাড়াও, এই গাছ উষ্ণ আবহাওয়ায় ছায়া দিতে বিশেষভাবে উপযুক্ত। কৃষ্ণচূড়া ফুলের রং উজ্জ্বল লাল। পত্র ঝরা বৃক্ষ, শীতে এ গাছের সব পাতা ঝরে যায়। বাংলাদেশে বসন্ত কালে এ ফুল ফোটে। ফুলগুলো বড় চারটি পাপড়ি যুক্ত। পাপড়িগুলো প্রায় ৮ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হতে পারে।

নাগলিঙ্গম

ফুলের নাম- নাগলিঙ্গম। ছবি: সংগৃহীত

নাগলিঙ্গম বা হাতির জোলাপ এক প্রকার ফুল। এর আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বনাঞ্চল। এটি পৃথিবীর অনেক জায়গায় চাষ করা হয়। বাংলাদেশে বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক, টংগী, বরিশালের বিএম কলেজ, ময়মনসিংহের মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, গফরগাঁও সরকারি কলেজ, গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সারাদেশে অনধিক ৫০টি গাছ রয়েছে। নাগলিঙ্গম ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গুচ্ছ পাতাগুলো খুব লম্বা, সাধারণভাবে ৮-৩১ সেন্টিমিটার, কিন্তু ৫৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বায় পৌঁছতে পারে। উল্লেখ্য, নাগেশ্বর, নাগকেশর ও নাগলিঙ্গম তিনটি ভিন্ন প্রজাতি। এই গাছে ফুল ধরার পর বেলের মতো গোল গোল ফল ধরে। এগুলো হাতির খুবই প্রিয় খাবার। এজন্য এর অন্য নাম হাতির জোলাপ গাছ।

পলাশ

ফুলের নাম- পলাশ। ছবি: সংগৃহীত

পলাশ মাঝারি আকারের পর্ণমোচী বৃক্ষ। সংস্কৃতিতে এটি ‘কিংসুক’ এবং মনিপুরী ভাষায় ‘পাঙ গোঙ’ নামে পরিচিত। তবে পলাশ গাছ তার ফুলের জন্যই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। পলাশ গাছ সর্বোচ্চ ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। শীতে গাছের পাতা ঝরে যায়। বসন্তে এ গাছে ফুল ফোটে। টকটকে লাল ছাড়াও হলুদ ও লালচে কমলা রঙের পলাশ ফুলও দেখা যায়। এর বাকল ধূসর। শাখা-প্রশাখা ও কাণ্ড আঁকাবাঁকা। নতুন পাতা রেশমের মতো সূক্ষ্ম। গাঢ় সবুজ পাতা ত্রিপত্রী, দেখতে অনেকটা মান্দার গাছের পাতার মতো হলেও আকারে বড়। পলাশের ফল দেখতে অনেকটা শিমের মতো। বাংলাদেশে প্রায় সব জায়গাতে কমবেশি পলাশ গাছ দেখতে পাওয়া যায়।

সোনালু

ফুলের নাম- সোনালু। ছবি: সংগৃহীত

সোনালু বা বাঁদরলাঠি সোনালী রঙের ফুলবিশিষ্ট বৃক্ষ। সোনালী রঙের ফুলের বাহার থেকেই ‘সোনালু’ নামে নামকরণ। এ ফুলের আদিনিবাস হিমালয় অঞ্চল ধরা হলেও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মায়ানমার অঞ্চল জুড়ে রয়েছে এর বিস্তৃতি। অস্ট্রেলিয়ায় নিউ সাউথ ওয়েলস ও কুন্সল্যান্ডের উষ্ণ অঞ্চলে এদের প্রচুর দেখা মেলে। প্রকৃতিকে নয়নাভিরাম রূপে সাজাতে এবং প্রকৃতি পরিবেশের শোভা বর্ধনে সোনালু গাছ সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়। অস্ট্রেলিয়ায় অনেক সড়কের দুই পাশে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সারিবদ্ধভাবে একই ধরনের গাছ লাগানো হয়, সোনালু বা বাঁদরলাঠি গাছ এদের অন্যতম। গ্রীষ্মকালে যখন সব গাছে একসাথে সোনালী ফুল ফোটে, তখন মনে হয় সোনালী আলোকচ্ছটায় চারপাশ আলোকিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের রাজধানি শহর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এবং দেশের অন্যান্য সড়ক-মহাসড়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বন জঙ্গলের গ্রামীন রাস্তার ধারে ছোট বড় সোনালু গাছ দেখতে পাওয়া যায়।

কাঠগোলাপ

ফুলের নাম- কাঠগোলাপ। ছবি: সংগৃহীত

কাঠগোলাপ মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, ভেনেজুয়েলা ও দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় ফুল। কাঠগোলাপ বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন গুলাচি, গোলাইচ, গোলকচাঁপা, চালতাগোলাপ, গরুড়চাঁপা ইত্যাদি। গাছটি ৮-১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাঠগোলাপ বিচিত্র গড়নের হয়ে থাকে। ফুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলও কোনো কোনো ফুল দুধের মতো সাদা, কোনোটি সাদা পাপড়ির উপর হলুদ দাগ, আবার কোনোটি লালচে গোলাপি রঙের। আবার সাদা রঙের কিছু ফুল দীর্ঘ মঞ্জরিদণ্ডের আগায় ঝুলে থাকে। বাংলাদেশে এ ফুল বসন্তেই ফোটে।

কনকচাঁপা

ফুলের নাম- কনকচাঁপা। ছবি: সংগৃহীত

বসন্তের ফুল হলেও কনকচাঁপা থাকে গ্রীষ্মের শেষ পর্যন্ত। ফুলটি খুব দুর্লভ। ঢাকায় আছে মাত্র দুটি গাছ। একটি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির বাগানে, অপরটি রমনা পার্কে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ কনকচাঁপার আদিনিবাস। কলম বা বীজ থেকে কনকচাঁপার চারা করা যায়। তবে বীজ থেকেও চারা গজায়। সাধারণত ঘন গুল্মের জঙ্গল ও পত্রঝরা বনে জন্মে। একসময় সিলেট ও চট্টগ্রামের বনে অধিক দেখা যেত। এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বাদে মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও দক্ষিণ ভারতের প্রাকৃতিক বনে কনকচাঁপা জন্মে।

কাঁঠালচাঁপা

ফুলের নাম- কাঁঠালচাঁপা। ছবি: সংগৃহীত

কাঁঠালচাঁপার রঙ সবুজাভ হলুদ এবং পাকা কাঁঠালের মত তীব্র ঘ্রাণযুক্ত; এ কারণেই এর নাম হয়েছে কাঁঠালচাঁপা। এই গাছ আকারে বিশাল বলে ছোট বাগানের জন্য এটি উপযুক্ত নয়। এটি ছাটাই করে সুন্দর রাখতে হয়। বীজ বা কলমের মাধ্যমে এর বিস্তার ঘটানো হয়। এর আদিভূমি দক্ষিণ চীন, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও ভারতবর্ষ। অপরিণত ফুলের রং কাচা সবুজ, পরিণত হলে পাকা কাঁঠালের গন্ধ ছড়ায়। এভাবে অনেকেই ফুল শনাক্ত করেন। রং হলদেটে বা সোনালি হলুদ, কাক্ষিক, পাপড়ির সংখ্যা ৬ এবং খোলা। ফুলের বোঁটা বাঁকা, আঁকশির গড়ন। গুচ্ছবদ্ধ ফল গোলাকার, দেখতে অনেকটা আঙুরের থোকার মতো এবং পাখিদের প্রিয়।

শিমুল

ফুলের নাম- শিমুল। ছবি: সংগৃহীত

শিমুল মালভেসি পরিবারের একটি গণের নাম। এরা পশ্চিম আফ্রিকা ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, এবং পূর্ব এশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ার উপউষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্থানীয় প্রজাতি।মালয়, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ চীন, হংকং এবং তাইওয়ানে ব্যাপকভাবে এ গাছের চাষ হয়। চীনের ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ থেকে জানা যায় যে, ন্যাম ইউয়েতের রাজা চিউ তো খ্রীষ্ট-পূর্ব ২য় শতকে হ্যান শাসনামলে সম্রাটকে প্রদান করেছিলেন। একে সংস্কৃত ভাষায় শাল্মলি-ও বলা হয়। এটি পাতাঝড়া বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। গাছের উচ্চতা ১৫ থেকে ২০ মিটার। কাণ্ডের চারপাশে সুবিন্যস্ত থাকে শাখা-প্রশাখা, তবে সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বৃহদাকার শিমুল গাছে অধিমূল জন্মে। গাছের গায়ে কাঁটা থাকে যার গোড়ার অংশ বেশ পুরু। তবে বয়স্ক গাছে তেমন কাঁটা থাকে না। শীতের শেষে পাতা ঝরে যায়, ফাল্গুনে ফুল ফোটে। ফল মোচাকৃতি। চৈত্র বা বৈশাখ মাসে ফল ফেটে শিমুল তুলা বেরিয়ে আসে। শিমুল গাছের ছাল ঘা সারাতে সহায়তা করে।রক্ত আমাশয়ে দুর করে।ছাল ফোড়ার উপর প্রলেপ দিলে উপকার হয়।

উদাল

ফুলের নাম- উদাল ফুল। ছবি: সংগৃহীত

উদাল হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদ্ভিদ প্রজাতি। উদাল গাছের কাঠ বাদামি রংয়ের হয়ে থাকে । কাঠ সাধারণত নরম ও হালকা হয়। এই গাছের কাঠ দিয়ে চা বাক্স বানানো হয়। এই গাছের বাকল থেকে এক ধরনের আঁশ পাওয়া যায়, সে আঁশ দিয়ে মোটা রশি তৈরি করা হয়। এর বাকলের শরবত খেলে শরীর ঠাণ্ডা রাখে এবং এ ফুলের বৃন্ত ছেঁচে পানির সঙ্গে চিনি দিয়ে শরবত করে খেলে প্রস্রাবের সমস্যা ও বাতের ব্যথা দূর হয়। ফুলগুলি হলুদ রঙের, ফুলের ভেতর বেগুনি। এদের ডাঁটায় একসঙ্গে কয়েকটি রোমশ বিদারী শুষ্ক ফল গুচ্ছবদ্ধ, পাকলে গাঢ় লাল। এই গাছের বড় বড় কয়েকটি বীজ থাকে এবং বীজের রং কালো। বাংলাদেশসহ ক্রান্তীয় এশিয়ার প্রজাতি, বাকল থেকে আঁশ পাওয়া যায়। এদের বীজে চাষ করা হয়।

আজকের পত্রিকা/সিফাত