সুরকার, ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আলতাফ মাহমুদের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়’র জমি দখলের পাঁয়তারা করছেন এক শিল্পপতি ও তার পরিবারের সদস‌্যরা। অভিযোগ উঠেছে, বরিশালের ওই বিদ্যালয়ের প্রায় ১০ শতাংশ জমি জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বরিশালের সংস্কৃতিকর্মীরা।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ বিখ‌্যাত এ গানসহ অসংখ্য দেশাত্মবোধক ও উদ্দীপনামূলক গানের সুরকার আলতাফ মাহমুদ। তার নামে বরিশালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়’। বিদ্যালয়টি রক্ষা ও যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান।

এদিকে অবিলম্বে শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের নামে লিজকৃত জমির দলিল বাতিল করার দাবিতে এবং একইসাথে এই দলিল জালিয়াতের হোতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আগামী ৬ ডিসেম্বর শুক্রবার বিকাল সাড়ে তিনটায় শাহবাগে প্রতিবাদ জানানোর আয়োজন করেছে লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, ছাত্র-শিক্ষক ও পেশাজীবীরা।

মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে স্থানীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের উদ্যোগে আলতাফ মাহমুদের নামে সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৮৫ সালে বরিশাল সদরের হাসপাতাল রোডের পাশে ৫০ নম্বর বগুড়া-আলেকান্দা মৌজার ১৩৪ নম্বর খতিয়ানের ৩১৪৮ নম্বর হাল দাগের ৯.৪৬ শতাংশ এবং ১৯৮৬ সালে একই দাগ ও খতিয়ানে আরো ১.৯ শতাংশসহ দুই দফায় মোট ১০.৫০ শতাংশ জমিসহ একটি একতলা পাকা ভবন শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক আজিজ আহমেদ।

কালের বিবর্তনে মূল্যবান ওই জমির দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ভূমিদস‌্যুদের। ১৯৯৯ সালে নগরীর রূপাতলীর জনৈক রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিজ ও তার পরিবারের সদস্যরা ওই জমির মালিকানা দাবি করে তা রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেন জিয়াউদ্দিন হাসান কবিরকে। কিন্তু জিয়াউদ্দিন হাসান কবির সঙ্গীত বিদ্যালয়ের ওই জমির ধারেকাছেও যেতে পারেননি।

২০০৭ সালে ওই জমি সরকারি গেজেটভূক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে রফিক উদ্দিন আহমেদ রফিজসহ তার পরিবারের সাত সদস্য ফের ওই জমি শিল্পপতি বিজয় কৃষ্ণ দে’র স্ত্রী শৈল বালা দে’র কাছে ১৬ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। কিন্তু স্থানীয়দের বাধার মুখে বিজয় কৃষ্ণ দে ওই জমি দখলে করতে পারছিলেন না। ২০১২ সালে বিএস রেকর্ডেও ওই সম্পত্তি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভূক্ত হয়।

সেই থেকে হাসপাতাল রোডের ওই জরাজীর্ণ ভবনে শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছিল। বরিশালে শহীদ আলতাফ মাহমুদের অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন মুছে গেলেও এই সঙ্গীত বিদ্যালয়ের মাধ্যমে আলতাফ মাহমুদ এবং তার অমর সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে পারছিল নতুন প্রজন্ম।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়টি অন্যত্র স্থানান্তর করে ওই জমি দখলের অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে অমৃত ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের মালিক বিজয় কৃষ্ণ দে’র বিরুদ্ধে। তিনি বিদ্যালয়টি স্থানান্তরের জন্য নগরীর কালীবাড়ি রোডে একটি ঘরও ভাড়া করেন। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি না হলে ভেস্তে যায় তার পরিকল্পনা। পরে তিনি ২০১২ সালে বরিশালের যুগ্ম জেলা জজ ও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আদালতে ভিপি স্যুট মামলা করেন।

গত ২৫ মার্চ বরিশালের যুগ্ম জেলা জজ ও অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আদালতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩৪০/৬৮-৬৯ নম্বর লিজ কেসের মাধ্যমে ওই জমি শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়কে দেয়া হয়। ১৯৭২ সাল থেকে ওই স্থানে বিদ্যালয়টি সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। ওই জমিতে সরকারের পক্ষে লিজপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাদী শৈল দে বা অন্য কারোর কোন স্বত্ব বা দখল নেই।

ওই জমিতে শহীদ আলতাফ মাহমুদ সঙ্গীত বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনাসহ বিদ্যুৎ বিল এবং সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স নিয়মিত পরিশোধ হয়ে আসছে।

আজকের পত্রিকা/সিফাত