এম. এ. আর. শায়েল
সিনিয়র সাব এডিটর

ওই যুবকদের নীরব দর্শক হিসেবে ধরে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠে। ছবি: সংগৃহীত

স্বজন বা প্রিয়জন হারানোর শোক এতো সহজে ভুলা যায় না। কিছু কিছু ঘটনার ক্ষততো মরার আগেও শুকায় না। কেউ কেউ হয়তো এ শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন, আবার কেউ কেউ পারেন না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর হয়তোবা কাঁদতে কাঁদতে অনেকের চোখের জলও শুকিয়ে যায়।

রিফাতের স্ত্রী মিন্নি

আর কত প্রাণ গেলে জেগে উঠবে এ সমাজ, এ দেশ? আর কত মায়ের বুক খালি হলে কম্পিত হবে প্রিয় স্বদেশ? আর কত ভাইয়ের জন্য পথ চেয়ে চেয়ে চোখের পানি শুকাবে লক্ষী বোনের? তবুও ভাই তার আসবে না ফিরে আর কোনোদিন। আার কত পথ চেয়ে বাবা গ্রহণ করবে তার তাজা ছেলের রক্তাক্ত লাশ? আর কত বাবা অকালে বহন করবে পুত্রের লাশবাহী খাটিয়া। যে বাবা কাঁধে নিয়ে পুত্রকে নিয়ে খেলা করত? আর কত দেখব পথে পথে মৃত্যু। আর কত গরীব ঘরের দরওয়াজার ধূসর চৌকাঠ সহসা রঞ্জিত হবে ছেলের ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকে টপ টপ করে বেয়ে পড়া রক্তস্রোতে?

চারিদিকে শুধু মৃত্যুর মিছিল। এ মিছিল আর কত? আর কত মায়ের বুক খালি হলে পিশাচ নরপশুরা থামাবে তাদের উন্মাদ খেলা?

এই খেলা তো বাড়ছেই! বলছি, বরগুনা সদর উপজেলার বড় লবণখোলা গ্রামের শাহ নেওয়াজ রিফাত শরীফের কথা। যাকে এলোপাতাড়ি কোপানোর সময় স্বামীকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তার স্ত্রী। নৃশংসভাবে কোপানোর ভিডিওটি বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়।

আয়শা আক্তার মিন্নি।

নিহতের স্ত্রীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাকে উত্ত্যক্ত করতো নয়ন, তার স্বামী প্রতিবাদ করায় হত্যা করা হয় তাকে। তবে রিফাতের বন্ধুরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলছে, বিয়ের আগে মাদক ব্যবসায়ী নয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো রিফাতের স্ত্রী মিন্নীর।

নিহত রিফাতের বন্ধুরা জানান, এলোপাতাড়ি কোপানোর পর রিফাতকে ফেলে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় রিফাতকে প্রথমে বরগুনা হাসপাতালে ও অবস্থার সংকটাপন্ন হলে তাকে বরিশালের শের ই বাংলা মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাতের মৃত্যু হয়।

রিফাতের পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বখাটে নয়ন তার স্ত্রী আয়েশাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। রিফাত প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যা করা হয়। তারা এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার চান।

রিফাত ও মিন্নির বিয়ের ছবি

রিফাতের স্ত্রী বলেন, তারা সবাই অস্ত্র নিয়ে হামলা করে, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্তু আশেপাশের কেউ এগিয়ে আসে না। বিয়ের পরেও নয়ন আমাকে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। আমার স্বামীও তা জানতো।

রিফাতের শ্বশুর বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চাই আমি।

এদিকে রিফাতকে কুপানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে শুরু হয় এর পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা, সমালোচনা। যদিও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ৪৮ ঘণ্টার মাথায় বেশ কয়েকজন আসামিকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এখনো মুল আসামিরা ধরা পড়েনি। অনেকেই আশা করছেন, অচিরেই মূল ঘাতকরাও ধরা পড়বে। কেননা, স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার করার। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালতও আইজিপিকে নির্দেশ দিয়েছেন খুনিরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে।

তবুও আলোচনার শেষ নেই, উৎসুক সাধারণ মানুষের মনে। যে যেভাবে পারছেন, এর নিন্দা জানাচ্ছেন। মানুষজন জেগে উঠতেও শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে দেশব্যাপী আন্দোলন। অনেক স্থানেই বৃহস্পতিবার পালিত হয়েছে মানববন্ধন।

কিন্তু এরপরও আলোচনা থেমে নেই। সাথে চলছে সমালোচনাও। অনেকে ঘাতকের হাতে জীবন দেয়া রিফাতের স্ত্রীকে ঘটনার নেপথ্যে দায়িত্বে করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারী অনেকে বলছেন, অন্যের প্রেমিকা ভাগিয়ে নিলে এমনই হয়, এর জন্য দায়ী মেয়েদের লোভ আর ভালবাসার নামে মিথ্যে ছলচাতুরি…।

আবার অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইছেন না, রিফাতের স্ত্রীর জড়িত থাকার কথা। তারা বলছেন, এগুলো ভুয়া কথা, কেউ বিসসাস করবেন না। আর যদি ধরেই নেই যে রিফাতের বউ ভাল নয়। তাই বলে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার অধিকার তাদের কে দিয়েছে?

কেউ কেউ বলছেন, রিফাতের স্ত্রীর বিয়ের আগে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। তবে রিফাতের স্ত্রী বলছেন ভিন্নকথা। তার বক্তব্য হলো, খুনি নয়ন ও তার সহযোগীরা।

আবার কেউ কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত দর্শকদেরও দায়ি করছেন। আবার অনেকে সমাজব্যবস্থাকেও ধুয়ে দিচ্ছেন। অনেকের বক্তব্য দর্শকরা ভিডিও করতে পারেন, সাহায্যের জন্য এগিয়ে যেতে পারেন না। তবে সচেতন অনেকেই বলছেন, যে বা যারা ভিডিওটা করেছেন, সেই ভিডিওর কারণে কিন্তু আসামিদের সহজে চিহ্নিত করা যাবে। তা না হলে রিফাত মারা যাবার পর মামলা হলে তদন্তকালে পুলিশ হয়তো রিফাতের স্ত্রীর কথা বিশ্বাসই করতো না। ফলে বিচারই পেতো না তার পরিবার।

আবার অনেকেই বলছেন ‘এজন্য আপনি আমি সবাই সরাসরি দায়ী। কারণ আমরা নিজেদের অধিকার জনগণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। এমনি এমনিতেই তো সুশাসন, সুশৃঙ্খল দেশ চাইলেই তো হবে না।

রিফাত ও মিন্নির ছবি

আবার অনেকে বিশ্বজিৎ হত্যার প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, ১৩ জন পালাতক, ৪ জন খালাস, আটক ৮ জনের মধ্যে ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল। এইচডি কোয়ালিটির ভিডিও থাকার পরেও এটা হচ্ছে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার আপডেট। আর এটা তো লো-রেজুলেশন ভিডিও।

তাদের মতে, বিশ্বজিৎ হত্যার সঠিক বিচার হলে আজকে প্রকাশ্যে রিফাতকে মরতে হত না। অনেকেই বলছেন, ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমনকে এগিয়ে যাওয়ার কথা। এর প্রতিক্রিয়ায় আবার অনেকেই বলছেন, আমরা সবাই ব্যারিস্টার সুমন কে খুঁজি, কিন্তু কেউ ব্যরিস্টার সুমন হতে চাই না। দেশটাতো আর ব্যারিস্টার সুমনের একার না।

ফেসবুক ব্যবহারিদের মতে, মেয়েটা যদি তার স্বামীকে খুন করাতো, তাহলে সেতো সেখানে উপস্থিত থাকতো না, আবার ওকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতো না। অনেক লোক সেখানে ছিল কেউতো আসেনি। খুনিদের ফাঁসি দেওয়া হোক। এটাই সবার চাওয়া হোক।

অতীত দেখে বর্তমান অপরাধ কে আড়াল করার কোন সুযোগ নেই !! তাই দ্রুত ক্রসফায়ার দরকার !! তবেই অপরাধের যথাযথ শাস্তি পূর্ণ হবে !!

এক ফেসবুক ব্যবহারি বলেছেন, আমি যতদূর জানি, এরা একই কলেজে পড়ে, তাই এমত দু একটি ছবি থাকতেই পারে। এ নিয়ে জলঘোলার দরকার নেই। ভাই রিফাত হত্যার বিচার চাই, আর মেয়েটা যদি তার স্বামীকে ভালোই না বাসত তা হলে সে তার স্বামীকে এইভাবে বাচাতে আসত না। তাই ভাই ব্যাপরটি অন্যদিকে প্রবাহিত করবেন না…. এরা একই কলেজে পড়ে।

আরেকজন লিখেছেন, একটা মেয়ে প্রেম করতে রাজি না হলে, বা বিয়ে করতে রাজি না হলে, অন্য ছেলের সাথে বিয়ে হলে সেই ছেলে কে প্রকাশে এতগুলোর লোকের সামনে হত্যা করবে। এদের কঠিন বিচার হওয়া উচিত। এদের ফাঁসি চাই।

আরেক ফেসবুক ব্যবহারি লিখেছেন, রিফাত হত্যার নৈপথ্যে প্রেম ভালবাসা ! আমি মেয়ে মিন্নিকে দায়ী করছি! ভাল ভাবে খোঁজ নিন, দেখবেন এই মেয়েটাই একজনকে খুন করলো আরেকজন কে খুনী বানালো! ছেলেদের বলবো প্লিজ কারো এক্স নিয়ে টানাটানি করবেন না । জিনিসটা খুব খারাপ, মাথায় সত্যি খুন চেপে যায়।

তাই কোন মেয়েকে ভালবাসা বা বিয়ের আগে খোঁজ নিয়ে দেখেন তাকে কেউ ভালবাসে কিনা! বেসে থাকলে তাকে সহযোগিতা করুন! ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন না! লড়াই করে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করবেন না! ভালবাসার শক্তি অনেক বেশি, আপনাকে কুপিয়ে সে ফাঁসিতে ঝুলবে নির্ভয়ে!

মিন্নিরা বেঈমান, লোভী, স্বার্থবাদী।

মো. বারি নামে এক ফেসবুক ব্যবহারি বলেছেন, এক সময় প্রেম ছিল বিন্দু আকৃতির। এখনকার প্রেম হল ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, পঞ্চভুজ, ষড়ভুজ এমনকি বহুভুজ আকৃতির। আকৃতিগত গণ্ডগোল তো হবেই।

অনলাইন সংবাদের নিচে এমনি শত শত, হাজার হাজার মন্তব্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এ আলোচনা চলবে আরও কয়েকদিন। তারপর খাদিজা, বিশ্বজিৎ, নুসরাতদের মতো চাপা পড়ে যাবে হয়তো।

কেননা, এদেশে প্রতিদিন খাদিজারা, বিশ্বজিৎ ও নুসরাতরা ক্ষতিবিক্ষত হয়, শত শত মেয়ে নির্যাতিতা ও ধর্ষিতা হয়, খুন হয়, হামলা হলে এদেশে আন্দোলন হয় আর উচ্চ মহল বিচারের আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যেই লাউ তা কদু অবস্থায় হয়।

রিফাত হত্যা নিয়েও স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, দোষীদের শাস্তির কথা, সে ক্ষেত্রে কতটা শাস্তি পাবেন দোষীরা?

দোষীরা শাস্তি পাক আর না পাক, সরকারের উচ্চ মহলের টনক নড়ুক আর না নড়ুক ‘যার হারিয়েছে সেই বুঝে হারানোর কি ব্যথা।

আসলে “যার চলে যায় সেই বুঝে হায় বিচ্ছেদে কী যন্ত্রনা” শুধুমাত্র যারা প্রিয়জন এভাবে রিফাতের মতো হারিয়েছেন, কেবল তারাই বুঝেন, কী যন্ত্রনা এ বিচ্ছেদে, কী যে ব্যাথা এ বিয়োগে ।

রিফাত ও মিন্নির ছবি

এই পৃথিবীতে কে আছে এমন, যে কি না সহ্য করতে পরে তার তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রিয় সন্তানের ক্ষত বিক্ষত লাশটা মাটিতে কিংবা হাসপাতালের ট্রলিতে পড়ে আছে-এ দৃশ্য দেখতে? কে আছে এমন সহ্য করতে পারে যার প্রিয় ভাইয়ের প্রিয় শরীর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে- এটা দেখতে।