এম. এ. আর. শায়েল
সিনিয়র সাব এডিটর

আম, কঁঠাল, আনারস, খইসহ বিভিন্ন ফল। ছবি : এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া

‘নাইওর’ এর উপযুক্ত সময় বৈশাখ জৈষ্ঠ্যের মধুমাস। অনেক সময় আম কাঁঠালের সময়টা আষাঢ়ে গিয়েও ঠেকে। একটা সময় ছিলো নৌকাই ছিল যাতায়াতের মাধ্যম। সে সময় বিবাহিত মেয়েরা নৌকায় করে ‘নাইওর’ যেতো। এখনও মধুমাসে বেশকিছু অঞ্চলের মেয়েরা ‘নাইওর’ যায়।

তবে সেদিনের মধুমাসের ‘নাইওর’ এর সেই মধুময়তা এখন অনেকটাই ম্লান। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রামীণ পথঘাট এখন অনেকটা উন্নত হয়েছে। বিদ্যুতায়িত হয়েছে বেশিরভাগ গ্রাম। বিজলী বাতির রোশনাইয়ে গ্রামে এখন ভরা চাঁদের আলোর জ্যোৎস্না স্নিগ্ধ রূপটি আর চোখে পড়ে না।

সেদিনের ‘নাইওর’ এর এই দৃশ্যপটের সঙ্গে বর্তমানের ‘নাইওর’ এর অনেকটা পার্থক্য। এখন গ্রামে গ্রামে পাকা সড়ক হয়েছে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে শহরের মতোই হয়েছে গ্রামগুলো। বর্তমানে ‘নাইওর’ এর সময়ও অনেকটা কমে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন হয়েছে কখনও দিনে গিয়ে দিনেই বাপের বাড়ি থেকে ফিরে আসা যায়। একবিংশ শতকে সকলেই এখন যান্ত্রিক।

আর এ ‘নাইওর’ কে নিয়ে সিলেট অঞ্চলে মধুমাসে বিশেষ একটা রীতি রয়েছে। অনেককাল ধরেই এ রীতি চলে আসছে। মধুমাস এলেই কনে পক্ষের বাড়ি থেকে বরপক্ষের বাড়িতে আম কাঁঠালের নিমন্ত্রণ করা হয় এবং মেয়েকে ‘নাইওর’ নেয়া হয়।

মেয়ের বাড়ি আম কাঁঠাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি : এমদাদুর রহমান চৌধুরী জিয়া

এ সময় ‘জামাই’কে আম কাঁঠালের নিমন্ত্রণ না দিলে জামাই অখুশি হন। আর জামাইয়ের এই অবস্থা দেখে মেয়ে আঁচলে চোখ মোছেন। কিছুদিন পর মেয়ের বাড়ির লোক মারফত আম-কাঁঠালের নিমন্ত্রণ নিয়ে এলে জামাই পরিবারে মুহূর্তেই বয়ে যায় খুশির বন্যা।

আর তাইতো আম-কাঁঠালের মৌসুম এলেই এ নিয়ে শুরু হয় তোড়জোড়। শুরু হয় মেয়ের জামাইর বাড়ি আম-কাঁঠালসহ মধু মাসের মৌসুমি ফল পৌঁছানোর ব্যস্ততা ।

সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত আছে, বিবাহিত মেয়ের অভিভাবকরা প্রতি বছর মৌসুম এলেই কনের পক্ষ থেকে মেয়ের শশুর বাড়িতে আম, কাঁঠাল লিচু, আনারস, কলা, লটকনি, খই, চিড়া, মিষ্টি, জিলাপি আরো অনেক কিছু পসরা পাঠাতেই হবে। তবে কবে থেকে এ প্রথা চালু হয়েছে তা জানা যায়নি।

লোকমুখে শোনা যায়, বহু বছর আগে এক শৌখিন পিতা তার মেয়ের বাড়িতে বেশ ঘটা করে আম-কাঁঠাল নিয়ে যান। সেই থেকে এ প্রথার শুরু। বর্তমানে এটি অনেকটা বাধ্যবাধকতা হয়ে গেছে। স্বচ্ছল পরিবারের জন্য এটি শৌখিন ফ্যাশন হলেও নিম্নবিত্ত কিংবা দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিলেটের মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ এলাকায় বলা হয় জৈষ্ঠ্যহাড়ি; হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও বাহুবল এলাকায় বলা হয় আম-কাঁঠালী ও খৈ-কাঁঠালী।

এলাকা ভেদে নামের ভিন্নতা থাকলেও বিষয় ও রসদ একই। অনেক সময় অবস্থাসম্পন্ন পরিবারে একাধিক পুত্রবধূ থাকলে কার পিত্রালয় থেকে কি পরিমাণ ও কতো জাতের ফল-ফলাদি জৈষ্ঠ্যহাড়িতে এসেছে তা নিয়ে অনেকটা নীরব প্রতিযোগিতা চলে।

যাদের সামর্থ নেই তারা দু’চারটা কাঁঠাল আর কিছু আম-খৈ দিয়ে মেয়ের বাড়ির লোকজনদের সন্তোষ্ট রাখতে চান। এমনও ঘটনা ঘটে, যাদের সামর্থ নেই তারা প্রতিবেশিদের গাছের কাঁঠাল, বাগানের আনারস চেয়ে-চিন্তে নিয়ে মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে থাকেন। আনারস-কাঁঠাল বাগান মালিকরা অনেকই পারতপক্ষে তাদের ফিরিয়ে দেন না। দুই একটা হলেও দেন।

এ রীতি কেবল মৌলভীবাজার নয়, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ, বাহুবল, সিলেটের বালাগঞ্জ, বিয়ানীবাজারসহ বেশ কিছু অঞ্চলে চালু আছে।

এ জৈষ্ঠ্যহাঁড়িকে কেন্দ্র করে রীতিমতো উৎসব চলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোতে। মধুমাসের এই উৎসবে মধুর হয় আত্মীয়তার সম্পর্কও। পূর্বাঞ্চলে এখন জৈষ্ঠ্যহাড়ির ধুম পড়েছে যেনো।

বিভিন্ন এলাকার প্রবীণ লোকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বছরের এ সময়টা সিলেট ও আশপাশের এলাকায় প্রচুর আম, কাঁঠাল ও আনারস পাওয়া যায়।

অনেক পরিবারেরই নিজস্ব আম, কাঁঠাল, জাম গাছ, আনারসের বাগান রয়েছে।

মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর সাধারণত বাবা-মা, ভাইয়েরা নিজেদের বাড়ির গাছের ফল কন্যা বা বোনকে খাওয়ানোর জন্য পিত্রালয়ে এ সমটায় নাইওর (বেড়াতে) নিয়ে যান। মেয়ে পিত্রালয়ে ফল খেয়ে স্বামী গৃহে যাওয়ার সময় শ্বশুরবাড়ির লোকজনের জন্য কিছু ফল দিয়ে দেওয়া হয়।

আগে এর সাথে মেয়ে, জামাতা ও মেয়ের শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য জামাকাপড় দিয়ে দেওয়া হতো। এখনও ধনাঢ্য পরিবারে সে রেওয়াজ চালু আছে। তবে গরিব হলেও মেয়েকে বেড়াতে আনতে পারেন আর নাই পারেন, বছরের এ সময়টাতে মেয়ের বাড়িতে সাধ্যমতো জৈষ্ঠ্যহাঁড়ি পাঠিয়ে থাকেন। এভাবেই মৌসুমী ফলকে কেন্দ্র করে বাবার বাড়ি থেকে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি ফল পাঠানোর এ রেওয়াজ চলে আসছে বংশপরম্পরায়।

এদিকে এ জৈষ্ঠ্যহাড়িকে কেন্দ্র করে মেয়ের শশুরবাড়িতেও উৎসব চলে। বেয়াই’র বাড়ির ফল-ফলাদি আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে খেতে হয়। ফল-ফলাদি নিয়ে যান মেয়ের পিত্রালয়ের লোকজন। প্রতিবেশিদেরও দাওয়াত করা হয়। এসব মেহমানদের কেবল ফল খাইয়ে বিদায় দেয়া অনেকের আত্মসম্মানে ধরে। তাই ফল খাওয়ার পর আয়োজন করা হয় ভুরিভোজের।

মধুমাসের এ উৎসবকে ঘিরে এ অঞ্চলের লোকজনের আত্মীয়তার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। সুদৃঢ় হয় আত্মীয়তার ও পরিবারের বন্ধন-এমন ধারণা প্রবীণদের। তবে এসবকে কেন্দ্র করে আবার কোনো কোনো পরিবারে কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় মুত্যুও বরণ করতে হয় গৃহবধূকে। চলে নির্যাতন। তাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতনমহল।