চলচ্চিত্র নির্মাতা আবু সাইয়ীদ। গ্রাফিক্স : আজকের পত্রিকা

আমি চলচ্চিত্র পরিচালক, নিজের ছবির সব চিত্রনাট্যই আমি রচনা করেছি এবং সাথে কিছু ছবির কাহিনীও। কখনো কখনো চিত্রগ্রহণের কাজ করি, আবহ সঙ্গীত করি, সম্পাদনা ও শব্দগ্রহণের কাজও করি, এত কিছুতে যুক্ত হওয়া কারও কারও সঙ্গত মনে না হলেও, মেনে নেন। কিন্তু একেবারেই ভিন্ন বিষয়ে পদচারণা, মেনন প্রকৌশলের বিভিন্ন বিভাগ, স্থাপত্য, রাজনৈতিক ভাবনা, শিক্ষা, চিন্তন প্রক্রিয়া ইত্যাদি- এটা মেনে নিতে চান না শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাদের এক কথা, তোমার যা কাজ, চলচ্চিত্র নির্মাণ করা এবং তুমি তাই নিয়েই থাকো। এত ছোটাছুটি কেন? কেউ কেউ টিপ্পনীও কাটেন। আবার কেউ কেউ শুনিয়েও দেন সেই বিখ্যাত প্রবাদ বাক্য- Jack of all trades, master of none.

আমি কি কখনো মাস্টার হতে চেয়েছিলাম? মনে হয় না। আমি যা চেয়েছিলাম তা হল হাঁটতে। অনেকদিন আগে থেকেই এই হাঁটা শুরু করেছিলাম, এবং এখনো হাঁটছি। আমি একজন পরিব্রাজক। চলার পথের ভিন্ন ভিন্ন সরাইখানার খোঁজ পাই। তবে আমি নিশ্চিত, এই হাঁটায় আমি পথ হারাইনি। আমি একই পথে হাঁটছি এবং অনেক পুরাতন একটি পথে। তাই অনেকেই মনে করেন আমি বিকশিত হতে পারিনি, পুরাতনই রয়ে গেলাম। আমার যে হাঁটার পথ তা অনেক আগেই নাকি বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু আমি তা মানতে পারি না। আমি হাঁটা থামাই না বরং পদক্ষেপকে আরো দৃঢ় করার চেষ্টা করি। প্রকৃতি আমাকে হাঁটার সুযোগ করে দিয়েছে, বিজ্ঞান আমার হাঁটার পথকে সহজ করে দিয়েছে, শিল্প আমাকে পথের ঘ্রাণ নেবার অনুভূতি দিয়েছে।
চিরায়ত প্রাকৃতিক কার্যক্রমে এক অদ্ভুত বিষয় কাজ করে, তা হচ্ছে ক্রিয়া-বিপরীতক্রিয়া, অবিনশ্বরতা এবং রূপান্তর প্রক্রিয়া; প্রাণীর পথ চলা এবং চিন্তন প্রক্রিয়াও এর বাইরে নয়। সীমাবদ্ধতা এবং অসীমাবদ্ধতার মধ্যে কি ঘটনই না ঘটে থাকে। আমি আমার মত করে এক চিন্তন প্রক্রিয়ায় হেঁটে থাকি, এর নাম দিয়েছি দিয়েছি “উত্তর-মুক্ত চিন্তন প্রক্রিয়া” এবং আর আমার পথ চলার নাম দিয়েছি “প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের ঐকতানে এক মানবযাত্রা”। আমার কাজ যা আছে তা নিয়ে নয়, আমার কাজ যা আছে তার সাপেক্ষ্যে যা হতে পারতো এবং যা হওয়া উচিৎ তা নিয়ে। চলচ্চিত্রই বলুন, গদ্য-পদ্যই বলুন আর হাতুরি-বাটালি, বিজ্ঞানই বলুন, সবই আমার চলার বাহন।

আর হাঁটতে চাইলে তো একই ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকে যায় না। যেতে হয় এ ঘর থেকে ও ঘরে। আর প্রতিটি রাস্তা পার হতে ক্ষয় করতে হয় কয়েক জোড়া স্যান্ডেল। যে স্যান্ডেলটি এখন ফেসবুকের ওয়ালের ভাসছে এই স্যান্ডেলটি ক্ষয় হয়েছে চলন্ত রাস্তার মডেল তৈরি করতে গিয়ে। ধোলাই খালের কত লোহালক্কড় যে পাড়ি দিয়েছে এই স্যান্ডেল তার কোন হিসেব নেই। এই স্যান্ডেলের মসৃণতা উঠে গিয়ে যে ভাজ পড়েছে তা অভিজ্ঞতার ভাজ।

আমাকে আক্রমণ করতে গিয়ে কোন একজন লিখেছেন, “আপনার অতি উর্বর মস্তিস্ক আপনাকে স্থাপত্য বিদ্যা প্রসব করসে কিন্তু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিদ্যা না হইলে তো বিল্ডিং দারাইবে না। বলেন তো লাইভ লোড ক্যাল্কুলেশন কেম্নে করে?” লাইভ লোড এবং ডেড লোড না বুঝলে অধিক সুবিধা দেবার পরেও চলন্ত রাস্তার স্ট্রাকচারাল খরচ মেট্রো রেলের চাইতে কম হবে- এমন দাবি কিভাবে করবো? প্রচলিত পাইলিং-এর প্রচলিত ধারণার সাথে কিভাবে হরেজেন্টাল লোডকে অধিক কার্যকরি করা যায় তাও ভাবিছি, বিবিধ বাস্তবতার কারণে। চলন্ত রাস্তা এমন এক প্রকল্প যেখানে মেক্যানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল এবং ইলেক্ট্রনিকস, সিভিল, ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্থাপত্য জড়িত। এর প্রতিটি বিষয়ের ধারনা নিয়েই আমাকে মাঠে নামতে হয়েছে। হঠাৎ করে কিছু হয় না, কিছু করতে হলে স্যান্ডেল ক্ষয় করতে হয়, যা আমিও করেছি। প্রত্যেকই জানতে চায়, জানার পথে হাঁটিতে হয়। হয়তো আমার হাঁটার পথটি একটু ভিন্ন। আমি যতটা পড়ি, তার চেয়ে বেশি ভাবি। আমার কাছে পড়া গুরুত্বপূর্ণ, তারও অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাবা। তাই আমি ভাবনার জগতে ব্লাকহোলের ভেতরটা যেভাবে অনুভব করতে পারি, ঠিক ততটাই অনুভব করতে পারি নিউক্লিয়াসের ভেতরের প্রোটন-নিউট্রন। যদিও আমার অধিক আগ্রহের বিষয় চিরায়ত বলবিদ্যা এবং প্রাকৃতিক কিছু চিরায়ত গতি-প্রকৃতি।- কারণ এখান থেকেই আমাদের অনেক সংকটের পথ খুঁজতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে আমাকে তুলে ধরতে হচ্ছে এবং অনেক একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে হচ্ছে যা আমার জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর। আমি বাংলাদেশের অনেক খারাপ ছাত্রের মত একজন খারাপ ছাত্র, এতটাই খারাপ যে তৃতীয় শ্রেণিতে নিজের মাতৃভাষায় ১০০ এর মধ্যে ১৩ পেয়েছিলাম।

অনেকেই মন্তব্য করেছেন সব মন্তব্য এখনো সে অর্থে পড়া হয়নি। কিছু চোখ বুলিয়েছি। এসব মন্তব্য পড়া যায় না। আমাকে বিস্মিত করেছে স্থাপত্যের ছাত্র এবং কিছু স্থপতির আক্রমণের ভাষা। এ ভাষায় মন্তব্য করার আগে তারা একবারও ভাবলেন না যে আমারও এক কর্মজীবন আছে এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সেই কর্ম জীবন মোটেও অবহেলার নয়। বেশ কিছুদিন আগে একটি টক শোতে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক এবং একজন চলচ্চিত্রের শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক রেগে গিয়ে বললেন, আরে ভাই আপনি পড়ান সিনেমা। মানে আপনি রাজনীতির কি বুঝবেন। আমাদের বন্ধুদের এক আড্ডায় একজন চলচ্চিত্র পরিচালক একজন কবিকে বলে ফেললেন, আরে লেখেন তো ভাই ছড়া। একবার এক প্রকৌশলীকে উদ্দেশ্য করে এক কবিকে বলতে শুনেছি, ভাই এটা রাজমিস্ত্রি-কাঠমিস্ত্রির মাথায় ঠুকবে না। নিজের পেশাকে অন্য পেশার চাইতে উচ্চতর ভাবার মত নির্বুদ্ধিতা আর কিছুই হতে পারে না। আজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সবাই শঙ্কিত, আমিও শঙ্কিত। বিগত দুই দিনের ঘটনা আমার শঙ্কাকে আর বাড়িয়ে দিয়েছে। সাথে সাথে আমার দায়ও বাড়িয়ে দিল।

গত দুদিনে আমাকে বেশ কয়েকজন ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছেন। এরমধ্যে অধিকাংশ স্থাপত্যের ছাত্র এবং স্থপতি। প্রকৌশলীও আছেন। কেন তারা আমার ফ্রেন্ড হতে চাচ্ছেন তা আমার জানা নেই। তবে অবশ্যই আমি তাদের রিকুয়েস্ট গ্রহণ করবো। সব কিছুই নোটেড। এবং এর সবই হয়তো স্থান পাবে আমার “প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের ঐকতানে এক মানবযাত্রা’’র কোন পাতায়।

লেখক : আবু সাইয়ীদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা