এম. এ. আর. শায়েল
সিনিয়র সাব এডিটর

আজ থেকে প্রায় ২২ দিন আগে অর্থাৎ গত ২৬ জুন একজন স্ত্রীর সামনে তার প্রাণের স্বামীকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে  সন্ত্রাসীরা। সেই হত্যার একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয় ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তখন চারিদিকে নিন্দার পাশাপাশি প্রশংসার বন্যা বইতে শুরু করে।

নিন্দা করা হয় প্রকাশ্যে হত্যার। আর প্রশংসা করা হয় আততায়ীর হাতে প্রাণ হারানো স্বামীর প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর সাহসিকতার। ওই ভিডিও নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটিভ আমার মনে হয় তাদের কারোরই এই ভিডিওটি নজর এড়ায়নি।

আর তাইতো ঘাতকের শাস্তির দাবির পাশাপাশি নিহতের স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতির বন্যা বইতে শুরু করে। কেউ কেউতো অতি আবেগে স্বামীহারা ওই নারীর জন্য মূল্যবান চোখের জলও খরচ করে ফেলেন।

তবে আমার মতো বিপরীত মাত্রার কিছু লোক এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে নিরাপদ দুরত্বে থেকে ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান এবং পাশাপাশি ঘাতকদের শাস্তি দাবি করেন। সেই সব লোকজন শুরু থেকেই বলে আসছিলেন, আধিপত্য বিস্তার কিংবা মাদক ব্যবসা নয়, ব্যক্তিগত কারণে, অর্থাৎ ত্রিভুজ প্রেমের কারণে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

কিছু অকাজের বুদ্ধিজীবিরা এ বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনার পেছনে অন্য কারণ খুঁজতে থাকেন। কেউ কেউ বলেন এর সাথে প্রভাবশালী গ্যাং জড়িত। প্রশ্ন হলো প্রকাশ্যে দিবালোকে যে ঘটনা ঘটেছে তার পেছনে আবার কারণ কি? আগে আসামি ধরা হোক, তারপর কারণ বেরিয়ে আসবে। কিন্ত তা না, তারা আসামি ধরতে পুলিশ কেনো এতো দেরি করছে, এই বলে প্রশাসনের সমালোচনা শুরু করে দেন।

এ ঘটনায় নিহত যুবকের বাবা মামলা করেন। সারাদেশে আসামিদের বিরুদ্ধে জারি করা হয় রেড এলার্ট। সারাদেশ যখন এই এক আলোচনায় ব্যস্ত ঠিক এর ৫ দিন পর ঘটনার মূলহোতা প্রধান আসামি পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তখন নামধারী বুদ্ধিজীবীরা পুলিশের সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে উঠে। তারা বলে, কেনো মুলহোতাকে গ্রেফতার করা হলো না। আবার পুলিশ যখন ঘটনার দুই নম্বর হোতাকে ধরলো তখন ওই মহলটি আওয়াজ তুললো পুলিশ কেনো অন্য আসামিদের ধরছে না। সুশীল সমাজের এ আওয়াজ পৌঁছে যায় সরকারের ওপর মহল অবধি।

সেখান থেকে বলা হয়, কোনো ঘটনা ঘটার পর ইচ্ছে করলেই আসামিদের ধরে ফেলা যায় না। টেকনিক্যাল কিছু সমস্যা থাকে। পুলিশকে সময় দিতে হবে। যাইহোক পুলিশ বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সময় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ফলশ্রুতিতে মামলার প্রধান স্বাক্ষি নিহত যুবকের স্ত্রীকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্রেফতার করে আদালতে রিমাণ্ড আবেদন করে। আদালত তার ৫ দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করেন।

পাঠক, বলছিলাম বরগুনার আলোচিত রিফাত হত্যার কথা। যত দিন যাচ্ছে সাধারণ মানুষ রিফাত-মিন্নি-নয়ন বন্ডের ঘটনা নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। মামলাটি পুলিশ তদন্ত করছে। আসামিরা রিমাণ্ডে আছে, হাজতে আছে।

এদিকে রিফাত শরীফ হত্যা, মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে নিহত হওয়া, নয়ন বন্ডের মা মিন্নিকে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তখ্য দেয়া, মিন্নির শ্বশুরকে মিন্নি দায়ী করে সংবাদ সম্মেলনসহ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখা এবং মিন্নির পাল্টা সংবাদ সম্মেলন, সর্বোপুরি মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এনে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে গ্রেফতার দেখানো সব কিছু মিলিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

মিন্নি গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য প্রশ্ন এসেছে।

অনেকেই জেনে আবার কেউবা না জেনে প্রশাসনের সমালোচনায় মেতে উঠেছেন। একপক্ষ বিষয়টিকে নাটক আখ্যা দিচ্ছেন আরেকপক্ষকে মিন্নি গ্রেফতার হওয়ায় সন্তোষ্টি প্রকাশ করে প্রশাসনকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। আবার আরেকটি পক্ষ বিষয়টির মধ্যে প্রভাবশালীদের হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করছেন।

প্রশ্নগুলোর মধ্যে রয়েছে, মিন্নিকে কি ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে? তার শ্বশুর কি কোনো চাপের শিকার? শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে এবং নিশ্চিত তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ না করে মিন্নিকে প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার কি সমর্থনযোগ্য?

মিন্নিকে আটকের জন্য কয়েক দিন ধরেই বরগুনায় একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। একটা কথিত ‘জনমত’ সৃষ্টির চেষ্টা কী? যারা করেছে তাদের নেপথ্যে কারা? নয়ন বন্ড ক্রসফায়ারে গেল; কিন্তু প্রভাবশালীর স্বজনরা গ্রেপ্তার হলেও ক্রসফায়ারের বাইরে থেকে গেল। তাদের স্বজনরা বাইরে এখন পুরোমাত্রায় সক্রিয়। তা হলে বিষয়টি নিয়ে কারা খেলছে? মিন্নি তার স্বামী রিফাত হত্যার সাক্ষী। সেই একমাত্র তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছে। সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হতে পুলিশের এত সময় লাগল কেন? প্রমাণ পেতে কত দিন লাগবে?

এমনকি আদালতে মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবি না থাকার বিষয়ে অনেকে সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন। অথচ মিন্নির পরিবার সূত্র জানিয়েছে, উকালত নামায় স্বাক্ষর নিতে না পারায় কোনো আইনজীবি আদালতে তাদের হয়ে লড়তে পারেননি। কিন্তু হুজুগে কিছু মানুষ মুল বিষয় না জেনেই সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন।

অনেকে বলছেন, বোঝা গেল তার প্রতিপক্ষ কতটা প্রভাবশালী যে এ্ই মেয়েটির পক্ষে কোনো আইনজীবী দাড়ানোর সাহস দেখালো না।

আবার কেউ কেউ বলছেন, যে নিজের পক্ষে আইনজীবী দিতে পারেনা তার মত একজন অসহায় নারী কি করে আবার প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যা করার মত ক্ষমতা রাখে?

কোনো কোনো পাঠক আবেগের ঠেলায় বলেই দিয়েছেন, গরীবের মেয়ে এইটাই তোমার প্রাপ্য ।

যাইহোক কে কি মন্তব্য করলো, ভাবলো আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, ভালোবাসা আর ভালোবাসা নাই। আমরা আজকে মিন্নির প্রতি যে ভালোবাসা দেখাচ্ছি সেটা ভালোবাসা না। এটাকে বলে আলগা পিরিত। অর্থাৎ মার চাইতে মাসির দরদ বেশির মতো।

কেননা, এক সময় আমরাই যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়াজ তুলেছি, মিন্নিই জড়িত, মিন্নিই জড়িত বলে। আর এখন যখন কতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় তাকে গ্রেফতার করা হলো তখন তার জন্য ভালোবাসা উপচে পড়ছে। আমাদের আলগা ভালোবাসায় বেচারা পুলিশ পড়েছে বিপাকে। আমরা যদি এমন করি তাহলে প্রশাসন কোনদিকে যাবে। প্রশাসনকে তো তাদের মতো করে বিষয়টা মনিটরিং করতে দিতে হবে।

কেননা, স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি তদারকি করছেন। কারণ এ ঘটনার সাথে সরকারের সুনাম ও ভাবমূর্তি জড়িয়ে আছে পরোক্ষভাবে। কাজেই আমাদের উচিত প্রশাসনকে তাদের মতো করে কাজ করতে দেয়া, একটা ঘটনা ঘটলে তার অন্যমানে খুঁজে বের করা আমাদের উচিত নয়।

অনুসন্ধান করলে হয়ত রিফাত হত্যার পেছনে আগে যে মরেছে, যে মারা গেছে, যারা বেঁচে আছে, তাদের পরিবারকে তথা তাদের পারিবারিক ব্যবস্থা কে দায়ী করতে হবে। এরপর সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করতে হবে।

কারণ আধুনিকতার মোড়কে চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তনের কারণে পরিবারের সাথে ওই সব ছেলেমেয়েদের সম্পর্কের স্থায়িত্বও কমে যায়। যে কারণে তারা পরিবারহীন ছন্নছাড়া হয়ে নিজেদের খেয়াল খুশিমতো চলতে থাকে। আর আমাদের সমাজে বসবাসকারী কিছু মানুষ তাদের সেই ছন্নছাড়া জীবনের সুযোগ নিয়ে তাদের লালন-পালন করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে।

আসলে আমাদের মাঝে মাঝে বুঝতে ভুল হয়, কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক।

‘আসলে আমরা যে হুজুগে বাঙালী’ এটার প্রমাণ দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য বোধ করি না। আমরা তালেও নাচি, আবার বেতালেও নাচি, মন চাইলেই নাচি, না চাইলেও নাচি। আর এই নাচানাচি করার বিষয় গুলোও আমাদের মনের মতোই ক্ষনে ক্ষনে রূপ পরিবর্তন করে।

বর্তমানে হুজুকে বাঙালীরা যেসব তালে নাচতেছে সেগুলার মধ্যে অন্যতম হলো রিফাত হত্যা। মাঝখানে কিছুদিন ছিলো পদ্মাসেতুতে কল্লা কাটার গুজব।

কিছু সুযোগ সন্ধানী লোক আর একটি চক্র রিফাত-মিন্নিকে নিয়ে ট্রল করছে। তাকেসহ প্রশাসনকে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করছে, অহেতুক এবং অযৌক্তিক লিখিত পোষ্ট দিচ্ছে।

আসলে আমরা হুজুগে চলি। তাই কানের পাশ দিয়ে অনেক কিছু ঘটলেও কিছু করার থাকে না। কারণ এখন আমরা ব্যস্ত মিন্নিকে নিয়ে। তারপরে আবার আরও কোনো এক মিন্নির ঘটনা আমাদের অন্তরকে নাড়িয়ে দিয়ে গেলে তখন তা নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করবো নাচানাচি। মাঝখানে অনেক কিছুই ঘটে গেলেও আমরা কিন্তু নজর দিবো না। এখন আমরা সবাই রিফাত হত্যার বিচার চাইছি।

(চলবে)

লেখক ও সাংবাদিক