‘আবার শীত এলে আমি মরেও যেতে পারি
ছড়িয়ে ঝরাপাতার উপহাস…’

নিজের কবিতায় লিখেছিলেন শীতে মৃত্যুর কথা। অথচ শীত আসার আগেই ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে যেতে হয়েছিল প্রতিভাবান কবি আপন মাহমুদকে। আজ তার ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়েই আপন মাহমুদ নিজের প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন সাহিত্য জগতে। কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন গদ্য, ছোটগল্প, ছড়া ও গান। ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সকালের দাঁড়ি কমা’। ৩৬ বছরের জীবনে মাত্র একটি বই দিয়েই প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন আপন।

১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের মান্দারীবাজার এলাকার কড়ইতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রতিভাবান এই কবি। অধুনালুপ্ত আজকের কাগজ পত্রিকায় আপন মাহমুদ সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি পরে যায়যায়দিন এবং সর্বশেষ কালেরকণ্ঠ পত্রিকায় জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

আপন মাহমুদের কয়েকটি কবিতা-

বেদনা জীবনানন্দের মতো

নিজের সঙ্গে খুব হাসাহাসি করে ফেলেছি আমি, কেঁদেছিও- এখন লাস্যময়ীদের অহেতুক হাসির
বাষ্প আমার চোখে লাগে না- জানি, নিজেকে কি করে একটি খোঁড়া পিঁপড়ার কাছে বসিয়ে
রাখতে হয়- লাইজুদের মুখ মনে রেখে কি করে ভুলে যেতে হয় বেনারসির ‘লাল’।
নিজের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করতে গিয়ে দেখি, মৃতনদীদের বেদনাপ্রবাহ নিয়ে আমার বর্গাচাষি
পিতা কতটা নীল! সেই থেকে জল অথবা পানি খরচের ভয়ে আমি আর কাঁদি না- সেই থেকেই
নিজের কাঁধে হাত রেখে বলে আসছি, ‘বেদনার চে’ বড় হও, বেদনা জীবনানন্দের মতো’।
নিজের সঙ্গে খুব হাসাহাসি করে ফেলেছি আমি, এখন অভিমানের দেওয়াল ভেঙে নিজের ভেতর
নিজেই ঢুকতে পারি না।

 

লালপাড় শাদাশাড়ি বলে কিছু নেই

লালপাড় শাদাশাড়ি বলে কিছু নেই
সবই রঙের হুমকি-ধমকি, সবই রাত্রির চে’ বড়।
পৃথিবীর তলপেটে ছুরি মেরে কী তুমি বোঝাও কৃষ্ণচূড়া!
কী তোমার গল্প পলাশ; দ্যাখো, বেলিফুলের মালা মাত্র দু’টাকা।
লালপাড় শাদাশাড়িতে কী এমন যায় আসে
যখন পৃথিবীর সব গান ফিরে আসে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে!
আলতা পায়ে কি তুমি বোঝাও নৈর্ব্যক্তিক বালিকা
আমি তো চলে গেছি সেই কবে, রেললাইন ধরে
তোমার হাসির মতো অযথাই হেঁটে হেঁটে…
লাল নীল শাদা দ্যাখো- রাত্রির মতো সুবিশাল শ্লেটে
সব কিছু কুয়াশা পর্যন্ত…

 

বিলবোর্ড

তোমাকেই ডাকতে চেয়েছিলাম পেছন থেকে, জানাতে চেয়েছিলাম
ফুল, পাখি আর প্রজাপতি রাত। অথচ কোলাহল এসে কেমন
আড়াল করে দিল সব, লোকাল বাস এসে বাজাল হর্ন!
তোমাকেই খুঁজতে গিয়েছিলাম বিকেল-বিকেল মাঠে। অথচ
সন্ধ্যা, সন্ধ্যারা সব ঘরে নিয়ে গেল! রাত্রি হাসল হা হা…
তোমাকেই জানাতে চেয়েছিলাম কেন ঘুম হয়নি সুদীর্ঘকাল। বলতে
চেয়েছিলাম মেঘ, বৃষ্টি ও নারী নূপুর হতে কুড়িয়ে পাওয়া গান। অথচ
শীতকাল এসে কবিতার দিকে তাকিয়ে বলল ‘কুয়াশাই জয়ী’!
তোমাকেই ডাকতে চেয়েছিলাম পেছন থেকে, অথচ
বিলবোর্ড এসে দাঁড়াল!

আজকের পত্রিকা/সিফাত