আজ ১৭ নভেম্বর ২০১৯, প্রতি বছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় রোববার একটি বিশেষ দিন। সারা বিশ্বে ক্রমশ বাড়তে থাকা সড়ক দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারাচ্ছেন, যাঁরা আহত হচ্ছেন, তাঁদের নিদারুণ দুর্ভোগের সম্মুখীন পরিবারের সদস্যদের স্মরণ করা হয় এ দিনটিতে।

একইসঙ্গে দিনটি সেইসব স্বেচ্ছাসেবক, দমকল বাহিনী ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, যাঁরা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা দেওয়ার জরুরি কাজে নিয়োজিত থাকেন তাঁদেরকেও সম্মান জানানো।

আমরা স্মরণ করছি বিগত বছরে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, আহত ও পঙ্গু কয়েক হাজার মানুষ ও তাদের পরিবারকে।

এই তথ্য গুলো শুধুমাত্র সেই সব দুর্ঘটনা গুলোর যে গুলোর মামলা হয়েছে। বাস্তবে সড়ক দূর্ঘটনার সংখ্যা আরো বেশি বলে দাবী করছেন বিশেজ্ঞরা। দূর্ঘটনায় পরিবারের উপার্জন ক্ষম ব্যাক্তিটি নিহত, আহত অথবা পঙ্গু হয়ে পড়লে পরিবার গুলোতে যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয় তা কোনভাবেই পূরনীয় নয় আর দীর্ঘদিন ধরে পরিবার গুলোকে এর মাশুল গুনতে হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্বে প্রতি বছর ১২ লাখ প্রান ঝরে যাচ্ছে এবং দুই থেকে পাঁচ কোটি মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছে।

বেশীরভাগ হতাহতের ঘটনা মূলত নিম্ন ও মধ্য আয়ের ৮৭টি দেশে ঘটছে – প্রতি ১ লক্ষ জনসংখ্যায় যথাক্রমে ১৮.৩ এবং ২০.১ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে যথাযথ পদক্ষেপ ও সাবধানতা অবলম্বন করলে বিশ্বে প্রতি বছর ৫০ লাখ লোককে সড়ক দুর্ঘটনার অপঘাত মৃত্যু থেকে বাঁচানো যায়। বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুমহামারী এবং অপঘাতে মৃত্যুর ৮ম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বিশ্ব ব্যাংকের মতে সড়ক র্দুঘটনার কারনে বাংলাদেশের জিডিপিতে ক্ষতির পরিমান ১.৬ শতাংশ।

সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় বিষয়টিকে সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

এর লক্ষ্য ৩.৬ (সুস্বাস্থ্য): ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও অহতের সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনা।

লক্ষ্য ১১.২ (টেকসই শহর ও জনগণ): ২০৩০ সাল নাগাদ সবার জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, ব্যবহারযোগ্য এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, আহত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের স্মরণে রোড পিস নামে একটি ব্রিটিশ হিতৈষী সংস্থা ১৯৯৩ সাল থেকে নভেম্বর মাসের তৃতীয় রবিবার দিবসটি পালন করার প্রথম উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীকালে ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়।তখন থেকেইদিবসটি পালনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘ সড়ক নিরাপত্তা সমন্বয় সেলপৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার ও বেসরকারী সংস্থা সমূহকে উৎসাহিত করে আসছে।

দিবসটি পালনের গুরুত্ব:
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাগুলো আমাদের জীবনে আকস্মিক আর চরম আঘাত নিয়ে আসে। যাঁরা নিহত হন তাঁরা তো চলেই যান কিন্তু পেছনে রেখে যান চরম বিপণœ পরিবার আর স্বজনকে। আর যাঁরা আহত হন তাঁদের শুরু হয় সুস্থ হওয়ার জন্য লম্বা সংগ্রাম। যে সংগ্রামের ঝড় বয়ে যায় তাঁদের পরিবারের ওপর দিয়েও। সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্বে নিহত হন যতজন আহত হন তার চেয়ে আরও অনেক বেশি। প্রতি বছরই সে সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। যাঁরা নিহত বা আহত হচ্ছেন তাঁদের একটি বিরাট অংশ তরুণ-যুবক। যাঁদের মৃত্যুতে উপার্জনশীল সদস্য হারায় তাঁদের পরিবার। তাঁদের পরিবারের দুর্ভোগ সহজেই অনুমেয়।

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির শিকার এই বিপুল সংখ্যক মানুষ ও তাঁদের পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ানোর চেষ্টা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেওয়ার বড় উদ্যোগ সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ছোট ছোট উদ্যোগ নিয়ে যাঁরা এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন তাঁদের যেতে হবে বহুদূর। তারপরও আশাহত না হয়ে দিবসটি পালনেরমধ্য দিয়ে সরকার ও সংস্থাসমূহ নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এবং মাত্রা নির্ধারণ করে সড়কে হত্যাযজ্ঞ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন। সড়কে মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত ৫০% কমানো ”এটি জাতিসংঘ ঘোষিত সড়ক নিরাপত্তা দশকের (২০১১-২০২০) পাঁচ নম্বর স্তম্ভের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে দুর্ঘটনা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সাতটি মূল নির্দেশনা রয়েছে –

দুর্ঘটনা পরবর্তী জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী একটি জরুরি ফোন নাম্বার প্রবর্তন।
দুর্ঘটনায় আহতদের মানসম্মত চিকিৎসা সেবার জন্য হাসপাতালসমূহে আধুনিক ট্রমা কেয়ার পদ্ধতি নিশ্চিতকরণ।

শারীরিক ও মানসিক আঘাত কমিয়ে আনতে দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের জন্য বাধ্যতামূলক তৃতীয়পক্ষ বিমা ও আন্তর্জাতিকমানের বিমা ব্যাবস্থা চালু।

সঠিক তথ্যানুসন্ধান এবং দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ।
প্রতিবন্ধীদের চাকরি প্রদানে চাকরিদাতা ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উদ্বুদ্ধকরণ।

দুর্ঘটনা পরবর্তী জরুরি সেবা কার্যক্রম ত্বরান্বিত ও আধুনিকায়ন করতে চলমান গবেষণা ও উন্নয়ন।

প্রয়োজন সমন্বিত প্রয়াস ও স্থানীয় উদ্যোগ-
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পযায়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিইডি , বিআরটিএ এবং হাইওয়ে পুলিশ সহ কমিউনিটি পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া জেলা পর্যায়ে রয়েছে জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটি এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটি। সংশ্লিষ্ঠ কমিটিগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যাসমুহ চিহিৃতকরন ছাড়াও সমাধানের লক্ষ্যে বির্ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে , সড়ক নিরাপত্তা ইস্যুটি কম প্রাধান্য পাওয়ার কারনে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্টানিক পর্যায়ে গতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয়ভাবে এগিয়ে না আসলে অবস্থার উন্নয়ন সাধন এক কথায় অসম্ভব।

এছাড়া নাগরিক হিসাবে চাইলে আমরাও স্থানীয় পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহন করতে পারি।
বিদ্যালয় থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের রাস্তা পারাপারের সঠিক নিয়ম জানা প্রয়োজন ।

আমাদের সরকার আগামী ১০ বছরে সড়ক র্দুঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস এবংর্দুঘটনার সংখ্যা ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনার রূপকল্প স্থির করেছেন। যার সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন যথাযথ সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং র্দুঘটনা পরবর্তী এক ঘন্টার মধ্যে জরুরী উদ্ধার ও সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, জরুরি ও জটিল সমস্যা মোকাবেলায় সামর্থ্য তৈরি, দেশব্যাপি একটি জরুরি টেলিফোন নম্বর চালু এবং কম খরচে কৃত্রিম অঙ্গসহ আহতদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণের যোগান নিশ্চিত করা।

তাই আসুন বিশ্বব্যাপি সড়ক র্দুঘটনায় আহত, নিহত ও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যদের স্মরণ দিবস-২০১৯ তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, সড়কে মানুষ হত্যার এই মহামারী ও মানবসৃষ্ট দূর্যোগ কমাতে যার যার অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করবো। সবার জন্য নিরাপদে পথ চলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবো।

‘সড়কে নিরাপত্তা আমাদের অধিকার বাস্তবায়নে চাই অঙ্গীকার’।

-রাজীব দেব রায় রাজু