জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জরা। ছবি : সংগৃহীত

রাজা উলঙ্গ। তবু কারো সাধ্য নেই সে সত্য উচ্চারণের। ইতিহাসের এমন পর্বেই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জরা আসেন। জনগণের পক্ষের বিকল্প গণমাধ্যম দাঁড় করিয়ে ক্ষমতাবানদের সব কুকীর্তি ফাঁস করে দিয়ে বলতে পারেন, রাজা তুই নেংটা।

প্রায় দশ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের কোটি কোটি গোপন নথি ফাঁস করে সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে উইকিলিকস ও তার প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। সে অপরাধে ৪৭ বছর বয়সী এই অস্ট্রেলিয়ানকে বৃহস্পতিবার লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাস থেকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। যুক্তরাজ্যে বসবাসের অনুমতি প্রত্যাহারের পর ২০১২ সাল থেকেই অ্যাসাঞ্জ ওই দূতাবাসের একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। তবে যুক্তরাজ্যে তার বসবাসের অনুমতি বাতিল করা হয় তথ্য ফাঁসের অভিযোগে নয়, সুইডেনে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগে। যদিও পরে ওই অভিযোগ থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। অ্যাসাঞ্জ নিজেও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন।

ভিন্ন ধারার গণমাধ্যম উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অতি গোপনীয় তথ্য ফাঁস করে এক পক্ষের কাছে যেমন ‘বীরে’ পরিণত হয়েছিলেন, তেমনই অন্য পক্ষের কাছে হয়েছিলেন শত্রু। তার প্রধান প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র অ্যাসাঞ্জকে নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হিসেবে মনে করে। তাই তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে মার্কিন রাষ্ট্রযন্ত্র। সেই এক তরফা বিচার কেন মানবেন অ্যাসাঞ্জ? তা থেকে নিজেকে রক্ষার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি।

অ্যাসাঞ্জ যেসব নথি ফাঁস করেছেন, তার বেশির ভাগে যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু, নির্যাতন, গোপন সামরিক অভিযানের মতো বিষয়গুলো প্রকাশ পায়। শুধু ইরাক ও আফগান যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পাঁচ লাখ নথি প্রকাশ করা হয়। সরকারগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা তৈরি এবং যুদ্ধবিরোধী প্রচারণার অংশ হিসেবে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তবে নাখোশ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা। গোয়েন্দা পদ্ধতি ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাঠামোগুলোর অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য প্রকাশের কারণে অ্যাসাঞ্জ জনজীবন হুমকির মুখে ফেলেছেন বলে দাবি করে তারা।

১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী অ্যাসাঞ্জের শৈশব খুব স্থিতিশীল ছিল না। মেলবোর্নে স্থায়ী হওয়ার আগে তিনি ৩৭টি স্কুল পরিবর্তন করেন। কিশোর বয়স থেকে তিনি কম্পিউটার হ্যাকিংয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরপর তিনি প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও তার মতাদর্শের মানুষদের নিয়ে ২০০৬ সালে গড়ে তোলেন উইকিলিকস।

এ বছরের ৪ এপ্রিল উইকিলিকসের টুইটে বলা হয়, ইকুয়েডর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দুইটি সূত্র থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে অ্যাসাঞ্জকে দূতাবাস থেকে তাড়ানো হতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করে বৃহস্পতিবার তাকে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেয় ইকুয়েডর। গ্রেফতারের পর অ্যাসাঞ্জকে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতের শুনানিতে দেরিতে উপস্থিত হয় অ্যাসাঞ্জের আইনজীবীর দল। ওই সময়ে অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতারের সময়ে ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে সাথে করে নিয়ে আসা গোর ভাইডালের লেখা একটি বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলেন। পরে শুনানিতে হাজির হয়ে অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী ড্যান ওয়াকার আদালতে বলেন, জামিনের শর্ত ভঙ্গ করার পেছনে অ্যাসাঞ্জের যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। কারণ তিনি মনে করেন ব্রিটিশ আদালতে তিনি কখনোই ন্যায়বিচার পাননি। তার আশঙ্কা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। দুই পক্ষের শুনানি শেষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাইকেল স্নো তার বিরুদ্ধে জামিনের শর্ত ভঙ্গের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। আর অ্যাসাঞ্জের দণ্ড ঘোষণার জন্য মামলাটি রাজ আদালতে পাঠিয়ে দেন।

অ্যাসাঞ্জকে আটকের পর থেকেই বিশ্বে মুক্তিকামী মানুষ পথে নামে। শুরু হয়েছে ‘হ্যাসট্যাগ ফ্রি অ্যাসাঞ্জ’ আন্দোলন। রাষ্ট্রকে আরো গণতান্ত্রিক আর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি তোলা কোনো অন্যায় হতে পারে না। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মুক্তি চাওয়া এ সময়ের সকল সত্যনিষ্ঠ মানুষের কর্তব্য হওয়া উচিত।

আজকের পত্রিকা/এমএইচএস/আ.স্ব/জেবি