এক সাহসের নাম জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের মনে একটাই ভয় কখন যে কী ফাঁস হয়ে যায়! উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে রীতিমতো। সে কম্পন এখনো থামেনি।

পৃথিবীর তাবৎ দুর্নীতিবাজ ও অন্যায়কারীদের পায়ের নিচের মাটি তুড়ি মেরে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন যে মানুষটি, তার নাম জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। উইকিলিকসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

সাধারণ মানুষের কাছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নামটি সাহায্যকারী, সত্য প্রকাশকারী, আধুনিক যুগের সুপার হিরো এই ধরনের ইমেজ থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বের বড় বড় নেতা ও দেশের কাছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একটি ভীতিকর নাম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রভাবশালী নেতাদের সিংহাসন কাঁপানোর নাম অ্যাসাঞ্জ।

আফগানিস্তানে আফগান যুদ্ধের সূচি, আফগানিস্তানে যুদ্ধের পূর্বে প্রচার না হওয়া ৭৬৯০০টি নথির একটি সংকলন, ইরাক যুদ্ধের ৪,০০,০০০ নথি, জাতীয় নিরাপত্তা, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি, মার্কিন হেলিকপ্টার হামলা, সেনা গোয়েন্দার গোপন তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল, হ্যাকিংসহ এমন কিছু বাদ পড়েনি যা উইকিলিকস ফাঁস করেনি।

শুধু এগুলোই নয়। ২০০৬ সালে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এক এক করে বেশ কিছু দেশের গোপন নথি ও অন্যান্য হাজার হাজার গোপন নথিপত্র ফাঁস করেছে এই অ্যক্টিভিস্ট সংস্থাটি। ফাঁস করা এসব গুরুত্বপূর্ণ নথি, ইমেইল, তথ্য বিশ্বের বড় বড় নেতা ও দেশের আসল রূপ ও তাদের অপরাধের প্রমাণস্বরূপ। ঘটনার নির্মম সত্য প্রকাশ হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে যা তারা কখনই জানতে পারত না। তাইতো পৃথিবীর সকল প্রভাবশালী দেশগুলো আজ উইকিলিকসের নাম শুনলেই ভয় পায়।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত দমন দেখে বোঝাই  যাচ্ছে তারা কতটা ভয় পাচ্ছে এই উইকিলিকস ও তার প্রতিষ্ঠাতাকে। উইকিলিকসের ফাঁস করা গোপন নথিপত্রগুলোর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হলো এখানে।

২০১০ সালে উইকিলিকস একটি ভিডিও প্রকাশ করে যেখানে দেখা গেছে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় কীভাবে বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ভিডিওতে একটি কণ্ঠ শোনা গেছে যেখানে বলা হচ্ছিল যে ‘সবাইকে জ্বালিয়ে দাও’। এরপরই বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া হয়। এমনকি আহতদের উদ্ধারে একটি গাড়ি এগিয়ে এসেছিল। সেই গাড়িকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়েছিল। ওই হামলায় রয়টার্সের একজন আলোকচিত্রী ও তার সহকারী মারা গিয়েছিলেন।

২০১০ সালের ২২ অক্টোবর প্রায় ৪,০০,০০০ নথি প্রকাশ করে যেখানে ইরাক যুদ্ধের একটি পরিপূর্ণ খসড়া ছিল। তথ্য ফাঁসের পর দেখা গেছে ৬৬ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক হত্যা করা হয়েছে। এমনকি ইরাকি সেনাদের দ্বারা বন্দিদের নির্যাতনের তথ্য এবং মার্কিন কূটনীতিকদের আদান প্রদান করা আড়াই লাখ বার্তা ফাঁস করা হয়েছিল উইকিলিকসের মাধ্যমে।

২০১১ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৭৭৯টি গোপন সম্পর্কিত, গুয়াতানামো শিবিরে আটক বন্দিদের ফাইল প্রকাশ করে। এই ফাইল তখন বেশ হইচই এনে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। উইকিলিকস মার্কিন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিংয়ের বরাতে অনেক তথ্য ফাঁস করেছিল। এসব তথ্যে দেখা গেছে মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। এ রকম বহু হত্যার ঘটনা গোপন রাখা হয়েছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ারে হামলার দিন একে অপরের খবর নিতে মানুষজন যেসব পেজার বার্তা প্রদান করেছিলেন তার মধ্যে থেকে প্রায় ছয় লাখ বার্তা প্রকাশ করেছিলো উইকিলিকস। ঐ হামলার প্রতি সরকারি নানা দপ্তরের প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বার্তাটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত। ওই বার্তায় লেখা ছিল, ‘প্রেসিডেন্টের গমনপথ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ওয়াশিংটনে ফিরছেন না। তবে কোথায় যাবেন তা তিনি নিশ্চিত নন।’

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণা বিষয়ক প্রধান জন পোডেস্টারের ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কয়েক হাজার ইমেইল ফাঁস করা হয়েছিল। ফাঁস করা তথ্যে দেখা গিয়েছিল যে নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের মধ্যে যে বিতর্ক টেলিভিশনে প্রচার করা হয় তাতে সিএনএনের সাংবাদিক হিলারি ক্লিনটনকে একটি প্রশ্ন সম্পর্কে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। এই বিতর্কে প্রার্থীরা কেমন জবাব দেন তা ভোটের ওপর প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়। রাজনীতি, যুদ্ধ ছাড়াও সিনেমা জগতের অপরাধের তথ্যও উইকিলিকস প্রকাশ করেছিল।

২০১৫ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচারস এর প্রায় দুই লাখ ইমেইল ও ২০০০০ নথি ফাঁস করা হয়েছিল। ফাঁস করা ইমেইলে জানা যায় অ্যাঞ্জেলিনা জোলিসহ বিখ্যাত তারকাদের সম্পর্কে কোম্পানিটির প্রোডিউসার কী রকম কটূক্তিমূলক কথাবার্তা বলেছেন। এমনকি একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে রাজি না হওয়ায় হলিউড তারকা লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিওকে কীভাবে গালি দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি আমেরিকান চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য অভিনেত্রী জেনিফার লরেন্স ও এমি অ্যাডামসকে পুরুষ অভিনেতাদের তুলনায় কত কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে তাও প্রকাশ পায়।

২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সিরিয়ার রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ২ মিলিয়নেরও বেশি ইমেল ফাঁস করা হয়েছিল। উইকিলিকস জাতিসংঘের ৭০টি ‘কঠোরভাবে গোপনীয়’ তদন্ত প্রতিবেদন ফাঁস করেছিল। এসব প্রতিবেদনে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বহু মিলিয়ন ডলার জালিয়াতির অভিযোগ ও সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে পেরুতে জেনারেলদের উদ্বাস্তু মেয়েদের যৌন নির্যাতনের শিকার শত শত ইউরোপীয় শান্তিরক্ষীর অভিযোগের বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়েছে। দ্য গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স ফাইলস এর টেক্সাস সদর দফতরের ২০০৪ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি ইমেইল ফাঁস করেছিল উইকিলিকস। ফাঁস করা ইমেইলে দেখা গিয়েছিল যে কোম্পানিগুলো ব্যবসায়ের আড়ালে কীভাবে গোপন তথ্য আদান প্রদান ও পাচার করছিল।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে উইকিলিকস জার্মানির বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বিএনডি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) এর নজরদারি কার্যক্রমের জার্মান সংসদের তদন্ত সম্পর্কিত ৯০ গিগাবাইট তথ্য ফাঁস করেছিল। ২০১২ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গোপন তথ্য ফাঁস করেছিল উইকিলিকস। কেনিয়া নির্বাচন ও নির্বাচনের সময় কীভাবে নেতারা মানুষ হত্যার পরিকল্পনা করে তা ফাঁস করেছিল উইকিলিকস। এ ছাড়াও এমন আরও অনেক গোপন তথ্য ও অন্যায়ের প্রমাণ ফাঁস করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই আজ বিশ্বের বড় বড় ও প্রভাবশালী নেতা ও দেশের কাছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ একটি আতঙ্কের নাম।

১১ এপ্রিল লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করা হয়। গত সাত বছর ধরে ইকুয়েডরে রাজনৈতিক পুনর্বাসনে ছিলেন অ্যাসাঞ্জ।

আজকের পত্রিকা/বিএফকে/গোরা/জেবি