আজ কবি অনিকেত শামীমের জন্মদিন। ১২ ফেব্রুয়ারি জামালপুরের দেওয়ানপাড়ায় তার জন্ম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তার প্রকাশিত বই, তপোবনে তোপধ্বনি [উত্তরণ, ১৯৯১] দূরাগত পাহাড়ের গান [লোক, ২০০৮] অনিকেত শামীমের কবিতা [বাংলালিপি, ২০১৭] সম্পাদনা গ্রন্থ, আবার একটা ঝড় উঠুক [বিপ্লবের কবিতা সংকলন, ১৯৮৮] মায়াবী টানে ডাকে মতিহার [১৯৯২] সম্পাদিত সাহিত্যপত্র, উত্তরণ, খৈ, লোক। জন্মদিন উপলক্ষে আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য প্রকাশ হলো অনিকেত শামীমকে নিয়ে জিললুর রহমানের এই লেখাটি।

লোক ও লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন আয়োজনের জন্যে খ্যাত কবি অনিকেত শামীমের জীবন অতিক্রমণকালে তার লক্ষণরেখা কবিতাটি পুনর্পাঠ আমাকে দু’ছত্র লেখার প্রেরণা জুগিয়েছে। আমরা তো জানি, রামভক্ত লক্ষণ যখন সীতারই অনুরোধে রামের সন্ধানে জঙ্গলে যেতে বাধ্য হন, তখন সীতাকে একটি রেখা টেনে বৃত্তবন্দী করে সুরক্ষা দেবার প্রয়াস পেয়েছিলেন। আর এদিকে রাম তখন সোনার হরিণের পেছনে ছুটেছেন। অন্যদিকে রাবণ ভিক্ষুকের বেশে সীতাকে প্রতারিত করেন এবং সীতা ভিক্ষা দিতে গিয়ে সেই লক্ষণ রেখার বাইরে পা রাখেন। ফলে সীতাকে সেই মন্ত্রসিদ্ধ রেখা আর সুরক্ষা দিতে পারেনি। সীতাকে হরণ করে নিয়ে যায় রাবণ। আর এই কারণেই রামায়ণের যুদ্ধ এবং লঙ্কা জয়ের কাহিনী সৃজিত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই সীতা হরণ ভবিষ্যতে সীতার গায়ে কলংক লেপনের প্রয়াস পায় এবং সীতা ধরণীবক্ষে নিজেকে প্রোথিত করে ইহধাম ত্যাগ করেন।

কিন্তু সেই রামরাজ্য যেমন নেই, রামের জঙ্গল যাপনের দিনও তো আজ আর নেই। আজ যখন নাগরিক কবি ‘লক্ষণরেখা’ লেখেন, তখন তিনি কোন পৃথিবীর কোন রাবণের ছবি আঁকেন? আমাদের সমাজ কি যুদ্ধ থেকে রেহাই পেয়েছে? রেহাই কি মিলেছে যুগে যুগে জন্ম নেয়া আরো আরো ভয়াবহ রাবণগণের হাত থেকে? আর আমরা তো জানি, সাম্রাজ্যবাদী রাবণ দশানন নয়, সহস্রানন তারা।

তাই, এই মানব জীবনের ধারা এক মহাকালিক বৃত্তে আবদ্ধ নয় কি? আমাদের ব্যক্তিজীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রিক বামহারাষ্ট্রিক জীবন – সব, সবই বৃত্তাবদ্ধ। যেন লক্ষণরেখা টেনে দিয়েছে কেউ; আমরা তার বাইরে পা রাখলেই সমূহ বিপদ আমাদের ঘিরে ধরে। আর এমনতরো থমকে থাকা বৃত্তাবদ্ধ জীবন থেকে আমাদের পা বাইরে রাখতেই হবে, সে যতো বিপদইআসুক না কেন। রাবণের চাতুরী থেকে, কেবল মন্ত্রসিদ্ধ বৃত্তের ভেতরে থেকে নিজেকে সুরক্ষিত করলে পৃথিবীতে অনাচার অজাচার থামবে না। পা আমাদের বাড়াতেই হবে অনিশ্চয়তার পথে।
যুক্তিবাদিতার পথে, মানবমনের মুক্তির পথে। হেগেলী দর্শন তো আমাদের সেই ঐতিহাসিক সত্যের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। যেমন হেগেল মনে করতেন, সক্রেটিসের প্রশ্ন উত্থাপন যেমন ঐতিহাসিকভাবে জরুরি ছিলো, তেমনি তাঁর হেমলক বিষপানের সাজা গ্রিক সমাজপতিদের জন্যেও সঠিক সিদ্ধান্ত। আর আমরা তো আজও সেই পাশ্চাত্য তাত্ত্বিকদের ফুটনোট লিখে লিখে প্রমাণ করতে চাই যে, এছাড়া আর কোনো কাজ আমাদের নেই। “ভয়ের ট্যাবু আমাদের পায়ে শিকল পরায়”।

আমরা ঠিক এমন ভূ-বিশ্ব-রাজনীতির মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছি, যখন আমাদের সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাশরণার্থী শুধু জীবন হাতে নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। আর বাংলাদেশ তাদের বাধা দেওয়ার মতো অমানবিক হতে পারছে না।অথচ, বাংলাদেশে যেখানে বাঙালিরাই জমি সঙ্কটে পর্যুদস্ত, সেখানে চলে আসছে লক্ষ লক্ষ লোক, যারা ফিরে যাবে এমননিশ্চয়তা নেই। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি যে, বিশ্বের কোনো রাম বা রাবণ এ বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করছেন না। যেন, এসবই নিয়তি নির্ধারিত। যারা আমাদের চারপাশে আঁকেন লক্ষণ রেখার দাগ, তারাই প্রশ্রয় দিচ্ছেন যেন মিয়ানমার সরকারের বিকৃতমন মানসিকতার কর্মকাণ্ডকে। “এইখানে এসে থমকে দাঁড়ায় তৃতীয় বিশ্ব”।

আমরা সঠিকভাবেই বর্তমান বিশ্বে যেমন দেখছি রাবণের হাজার উপস্থিতি। তেমনি তার যথার্থ রূপায়ন যেন চিত্রিত হতে দেখি অনিকেত শামীমের ‘লক্ষণরেখা’ কবিতায়। কবি যখন উচ্চারণ করেন –

​​​​উজান টানে সময়ের নৌকা
​​​​টালমাটাল
​​​​কিছুতেই অতিক্রম করতে পারি না পরস্পরকে –
অতিক্রম জরুরী
তখন আমরা সারা বিশ্বে যে টালমাটাল অবস্থা, সিরিয়া-মিয়ানমার-আফগানিস্থান-ইরাক – এমন আরো অনেক অনেক স্থানে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, মানুষ মানুষকে নিগৃহীত করছে রাষ্ট্র-পর্যায়ে। আবার নারীর অমর্যাদা, দুর্বলের প্রতি অত্যাচার, সামাজিক দমন-পীড়ন আমাদের পুঁজিবাদী বিশ্বের জন্যে এক নৈমিত্তিক অভ্যাসের মতো। তেমনি পরিবারের মধ্যেও বেড়ে যাচ্ছেদ্বন্দ্ব-সংঘাত – দেয়াল বা বিভাজন রেখা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। পুঁজিবাদী বিশ্বের এই বিভাজন রেখার সীমা আমাদের ডিঙ্গোতে হবে। কিন্তু আমাদের আগেই বুঝিয়ে দেয়া হয়, এই সীমা অতিক্রমণ করো না, করলেই বিপদ। যেমন এই নিয়ন্ত্রিতজীবনের স্বাচ্ছন্দ্যে নিমগ্ন থাকতে চাই – এতে বুঁদ হয়ে থাকতে ভালোবাসি। প্রতিবাদে এসব হারাবার ভয়, তাই – মেনে চলা, মেনেচলাঃ-

​​​​ভয়ের ট্যাবু আমাদের পায়ে শিকল পরায়

​​আর আমরা অতিনিয়ন্ত্রণ বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠি

এই সীমা অতিক্রম জরুরী জেনেও তাই, থেকে যাই আয়েশের রেখার বৃত্তায়নের ছায়ায়। আমরা আমাদের স্বকীয় অস্তিত্বেরউচ্চারণ ভুলে যাই। ভুলে যাই প্রাকৃত জীবনের অনুবাদ অযোগ্য জীবনের সৌন্দর্য ও বৈচিত্র।

​​​​পুঁজির প্রবল স্রোতে ভেসে যায় স্বকীয়তা

​​​​ঘামের সোঁদাগন্ধ, ভাটিয়ালী সুর

​​​​রাঙা বউয়ের বিনম্র চাহনি কি অনুবাদ যোগ্য?

আমাদের নিজ ঐতিহ্য লোক-সংস্কৃতি আচার-প্রথাকে উদঘাটনের মাধ্যমেই আমাদের মুক্তি মিলবে। যেমন আমরা দেখতে পাইনগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর উত্তর উপনিবেশবাদী চিন্তা-দর্শনে। তাই চলুন আপন ঐতিহ্যের উন্মেষ ঘটিয়ে উত্তর আধুনিকতার পথে অর্জিত হোক যৌথ-স্বরের উচ্চারণ।

আমাদের ইতিহাসে-ঐতিহ্যে আছে জীবনের সহজিয়া দর্শন, আমাদের সাহিত্যে আছে চর্যাপদের সাবলীলতা। আমাদের ছায়া দেয় চার্বাক দর্শন, বৌদ্ধ দর্শন, বাউল-বৈষ্ণব চিন্তা, আমাদের এই বাতাসে এসে মিশেছে সুফি-মরমী-ফকিরি ভাবধারা, আমাদের এই ভূমিতে সাধারণ গাড়িয়ালের ভাওয়াইয়া গানে কতো ভূয়োদর্শন, কতো মর্মস্পর্শী চিন্তা ছড়িয়ে রয়েছে মাঝিদের ভাটিয়ালী গানে।অথচ আমাদের বারবার ফিরতে হয় দর্শন ও রাজনীতির ধ্যানধারণার জন্যে পশ্চিমের দ্বারস্থ হতে। আমাদের সে শিক্ষা নিতেবাধা নেই, তবে দাস্য মনোবৃত্তি ত্যাগ করে অনুসন্ধিৎসা ও পর্যবেক্ষণের একাগ্রতা নিয়ে আমরা আত্মস্থ করতে পারি পশ্চিমের ধারণা। তবে আমাদের ইতিহাস থেকেই আমাদের ভবিষ্যতের পথ খুঁজতে হবে, এতো হেগেলও বলেছেন। আর যদি মনের দাস্য রূপ প্রকাশ করে পশ্চিমা বিশ্বের ভাবমগ্ন হয়ে বায়সের ময়ূরপুচ্ছ ধারণবৎ জীবন যাপনের প্রয়াস পাই, তবে তারা তো দাঁতকেলিয়ে হাসবেই। সে কারণেই হয়তো উচ্চারণ হয়ঃ-

​​​​দাঁত কেলিয়ে হাসে প্রথম বিশ্ব
দেখো, দেখো – একেকটা তত্ত্ববোমায়

কেমন হুড়মুড়িয়ে আছড়ে পরে ক্রমশ
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পঙ্গপাল
হাঃ হাঃ তালিয়া বাজাও
লাগ ভেলকি লাগ …

আর আমরা পদে পদে টের পাই তারা কীভাবে আমাদের পায়ে বেড়ি দিচ্ছে, কীভাবে লক্ষণরেখা এঁকে দিচ্ছে আমাদের অগ্রযাত্রারপথে। আমাদের উপরে চাপিয়ে দেয় অতিনিয়ন্ত্রণবাদ।

তাই, যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন “ আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে, আমার মুক্তি ধুলার ধুলায় ঘাসে ঘাসে”, তেমনি অনিকেত শামীমও সেই একই ধারায় শতবর্ষ পরে সেই অনিবার্য স্বরে উচ্চারণ করেন তৃতীয় বিশ্বের মুক্তি ‘প্রাকৃতপাঠশালা’য়ঃ

​​​​ওরা আমাদের চারপাশে আঁকে লক্ষণরেখা

​​