logo

শুক্রবার ০৮, এপ্রিল ২০১৬ . ২৫ চৈত্র ১৪২২ . ২৯ জমাদিউল সানি ১৪৩৭

রাবেয়া
০৮ এপ্রিল, ২০১৬
শাহনাজ নাসরীন
রিকশাওয়ালাকে বিহারী পল্লীর দিকে যেতে বলে আকাশ-পাতাল ভাবে অরা। হাতে তেমন সময় নেই। অথচ অনেক কেনাকাটা গোছগাছ বাকি। শুধু তো  তার নয় বাচ্চা দুটিরও শীতের কাপড়চোপড় নিতে হবে বেশি করে। বঙ্গবাজারে যেতে হবে কয়েকদিন। একদিন গিয়েছিল, তো শুধু ওর নিজের আর বাচ্চাদের জন্য কয়েকটি জিন্সের প্যান্ট কিনেছে। শীতের কাপড় কেনা হয়নি এখনও। বঙ্গবাজার থেকে একদিনে কেনাকাটা করা মুশকিল। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী সিজনাল ব্যবসা করে। এই গরমে খুঁজে পেতে দামাদামি করে কাপড় কিনতে যে সময় লাগে সে সময়টুকু ঐ বদ্ধ মার্কেটে টানা কাটাতে হলে মাথা ঠিক থাকে না।

ওর বর যখন জার্মানিতে স্কলারশিপটা পেল তখন ওর খুব আগ্রহ ছিল দেশের বাইরে যাওয়ার। কিন্তু মামুন তখন কিছুতেই রাজি হয়নি ওকে নিয়ে যেতে। ওখানে ক’টা বছর থেকে টাকা-পয়সা রোজগার করে দেশে এসে গুছিয়ে বসবেÑ এটাই ছিল ওর ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু ওখানে যাওয়ার চার মাসের মাথায় সিদ্ধান্ত পাল্টেছে। কেন এখন অরাকে নেয়ার জন্য এত তাড়া তা ভেঙে বলছে না। তবে মামুন এতটাই বৈষয়িক যে অরা নিশ্চিত, নিয়ে যাওয়াটা আরো বেশি লাভজনক। অন্তত সমান সমান লাভ, লস নেই কোনো। তাই এত মরীয়া সে।

তবে এখন অরার একেবারে যেতে ইচ্ছে করছে না। এর মধ্যেই স্বাধীন জীবনের স্বাদ পেয়েছে খানিকটা। যদিও পাহারা দেয়ার কাজটি এখন তার বাবা করছেন আর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আনাগোনাও যথেষ্ট। তবু মামুনের জন্য সার্বক্ষণিক অ্যাটেনশন থাকার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর অরার কবিতা লেখা নিয়ে মামুনের একটা তাচ্ছিল্য আছে, এখন ওটার মুখোমুখি হতে হয় না তাকে। তাছাড়া ও এখন ফটোগ্রাফীর একটা কোর্সে ভতি হয়েছে। প্রায়ই গ্রুপ হয়ে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন গ্রামে চলে যায়। মামুন থাকলে সহজ হতো না এই সিদ্ধান্তগুলো নেয়া। হাজারো অজুহাত তুলত সে।

অরা মন খারাপ করে ভাবে, তবুও এখন যেতেই হবে কয়েক বছরের জন্য। যেহেতু মামুন চেয়েছে।

২.

আচ্ছা, রাবেয়াকে দেখেছেন? রিকশায় বসে বসেই জিজ্ঞেস করে, রাবেয়ার ঘরের সামনে বসা এক মহিলাকে।

না, এখন হ্যার দেখা পাওয়া বহুত কঠিন আছে।

কেন? কোথায় গেছে?

মহিলা ফোঁড় দিতে দিতে রহস্যময়ভাবে বলে, হেইডা কি আর ঠিকঠাক জানা আছে... যায় আয় থাহে থাহে না

ওকে সেলাই দিয়েছিলাম কিছু, আমার আরো আগেই আসার কথা ছিল আসতে পারিনি, ও কারো কাছে সেলাইগুলো দিয়ে গেল কিনা বলতে পারবেন?

কই না, দিলে তো ধরেন আমাগোরেই দেয়। ওরে তো সেলাই করতে দেহি না অহন। সে আবার রহস্য করে বলে অর সেলাই করণের দরকারই কী, অহন কপাল খুলিছে...

রাবেয়াকে দিয়ে অরা আগেও কিছু সেলাই করিয়েছে। ওর সঙ্গে কথাটথাও হয় বেশ, কিন্তু এখন দেখলো মেয়েটির সম্পর্কে তেমন কিছুই ও জানে না। প্রথমেই তার যে কথাটি মনে হয় তা হলো কাপড়গুলো নিয়ে মেয়েটি চলে যায়নি তো! ও বিহারি না, পুরোপুরিভাবে ক্যাম্পের বাসিন্দাও না এটা জানে, কিন্তু এখান থেকে চলে গেলে কীভাবে কোথায় খুঁজবে ওকে ভেবে নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে ওর। আগে এ কথাগুলো মনে হয়নি কেন ভেবে আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকে।

মহিলাকে আর প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে না। এমন মেকি ভাবভঙ্গি! কথা বলার প্রবল ইচ্ছার ওপর অনিচ্ছার একটা প্রলেপ দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে রেখেছে। ও ইতস্তত করতে থাকে। এখানে অপেক্ষা করাও সম্ভব না, আবার ফিরে গেলে কবে আসতে পারবে বা এলেও রাবেয়াকে পাওয়া যাবে কিনা তাও বুঝতে পারছে না।

অরার আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছার আগেই অবশ্য রাবেয়াকে দেখা যায় রাস্তার শেষ মাথায়। কাছে এলে ও তাড়া দেয়, অনেকক্ষণ বসে আছি তোমার জন্য। সেলাইগুলো কারো কাছে দিয়ে গেলেই তো পারতে। টাকা-পয়সা তো আগেই দেয়া ছিল।

রাবেয়া চুপ করে থাকে। নড়াচড়া নেই, কাপড়গুলো নিয়ে আসার তাড়া নেই। অরা একটু অসহিষ্ণু হয়ে আবারো তাড়া দেয়, একটু রেগেও যায়... কী হলো তোমার, কথা বলছো না যে? আগামী মাসের ১৮ তারিখে আমি বিদেশে চলে যাব।

রাবেয়া তাকায় না ওর দিকে। মনোযোগ দিয়ে নখ কাটে দাঁতে আর থেমে থেমে বলে কাপড়গুলোর কাজ শেষ করতে পারি নাই আপা। আরেকটু সময় দেন হইয়া যাইব।

অরা হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর একই উষ্মা নিয়ে বলে, আমার তো আরো আগেই কাপড় নিতে আসার কথা ছিল, তাই না? সময়ও যথেষ্টই দিয়েছি। কেন হয়নি? তারপর গুনতে থাকে, এখন তো আর পঁচিশ দিনও নেই হাতে। এখন কী করে শেষ করবে?

রাবেয়া তবু চুপ করে থাকে। অরার ক্রমাগত প্রশ্নের কোনো উত্তরই সে করে না। ওর গোঁয়ার্তুমি অরাকে আরো অসহিষ্ণু করে, অসুন্দর করে। ও এবার তীব্র শ্লেষের সনাতন পথটি বেছে নেয়। ওহ, সবাই বলছিল তোমার কপাল খুলেছে, এখন নাকি আর কাজ করার দরকার নেই, তাই দেখছি!

রাবেয়া চমকে তাকায় অরার দিকে, তারপর ছুটে ভেতরে গিয়ে কাপড়গুলো নিয়ে আসে। অরা কড়াভাবে বলে আর এডভান্সের টাকাগুলো?

খরচ হইয়া গেছে, আস্তে আস্তে দিয়া দিমু।

তোমার কাছ থেকে টাকা নিতে আমি এখানে ঘোরাঘুরি করব?

ও কোমরের গিট খুলে কিছু দোমড়ানো-মোচড়ানো দশ টাকার নোট বের করে। বলে, এগুলোই আছে। বাকিটা আমি বাড়ি গিয়া দিয়া আসমু।

ওর স্পর্ধা দেখে অরার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। দেখে আশপাশে এরই মধ্যে তামাশা দেখার লোক জমে গিয়েছে। ও মেজাজ খারাপ করে বের হয়ে আসে।

৩.

রিকশা চলতে শুরু করলে অরার চোখ গড়িয়ে জল ঝরতে থাকে। কী পছন্দই করতো সে মেয়েটাকে! অল্প পরিচয়েই খুব টেনেছিল। সিনসিয়ারিটি ওকে দুর্বল করে, মেয়েটার এই গুণটা ছিল। কাজগুলো করত যতœ করে। সুন্দর চেহারাটায় সব সময় বিষণœতা লেগে থাকত। একটা বাচ্চা আছে বলেছিল। গ্রামে দাদীর কাছে থাকে। টাকা নয়, আজ ওর সিনসিয়ারিটির অভাবটাই অরাকে আঘাত করেছে বেশি। ওর ভেতর তোলপাড় করে একটা প্রশ্নই উঠে আসে, রাবেয়া এমন করলো কেন?

বাড়ি ফিরেও রাবেয়া বার বার ঘুরেফিরে আসে ওর মাথায়। সে অপরাধ করেছে তার কাছে। এছাড়া ওর প্রতিবেশীও বিচ্ছিরি ইঙ্গিত করে কথা বলল। কিন্তু মেয়েটির মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই। উল্টো অরার শ্লেষের প্রতিবাদ করল! বস্তিবাসী  হিসেবে মেয়েটি বেশ ব্যতিক্রম ছিল। কোমল, পরিমিত মিষ্টি একটা মেয়ে।

এবার সে সুস্থিরভাবে ভাবতে চেষ্টা করে, কী  হতে পারে। আজো ওর চেহারায় ইনোসেন্স দেখেছি আমি, নিজেকে বলে সে, কী হলো ওর জানা দরকার, কিন্তু কখন জানবো, কাল টাঙ্গাইল যাবো ছবি তুলতে।

৩.

দেখতে দেখতে সত্যিই চলে এলো উড়ানের দিন। পরদিন সকালে ফ্লাইট। ভোর রাতেই এয়ারপোর্ট চলে যেতে হবে। তাই আজ আর বাড়িতে রান্না হয়নি। বাড়ি তালা দিয়ে মালপত্র নিয়ে তার মা’র বাড়ি চলে যাবে। সকালে ওখান থেকেই রওনা হবে। তার ভাই সজীবের বিকেল নাগাদ চলে আসার কথা গাড়ি নিয়ে অথচ সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। অরা বিরক্ত হয়, কেন এত কেলাস সবাই, এত দেরি করছে কেন, বাচ্চাগুলোর খিদে পেয়ে যাবে! কলিং বেল বাজে ঠিক এ সময়টিতে। সজীব এসেছে নিশ্চিত ধরে নিয়ে, কিছুই জিজ্ঞেস না করে, কী-হোলে চোখ না ফেলে দরজা খুলে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে। রাবেয়া! একই সঙ্গে অনেকগুলো প্রশ্ন ঢেউ তোলে। ও এখন কেন এলো, কোত্থেকে এলো... কিন্তু কোনো প্রশ্ন না করে চেয়েই থাকে চুপচাপ।

রাবেয়াও বিব্রত ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে, ভালো আছেন আপা? আলভী কই?

অরা একটার পর একটা প্রশ্ন করতেই থাকে রাবেয়ার উত্তরের অপেক্ষা না করেই, তুমি?... কী ব্যাপার?... এখন?... এসো ঘরে এসো।

কালকে তো আপনে চইল্যা যাইবেন, তাই আসলাম।...আগেই আসতে চাইছিলাম... আপনের সঙ্গে অপরাধ করছি।

অরার মনটা এখন এমনিতেই নরম হয়ে আছে। ওকে দেখে আর ওর কথা শুনে আরো দুর্বল লাগে। বলে, আমিও বুঝতে পেরেছিলাম তুমি রাগ করে আসছো না। আমি ওইদিন রাগারাগি করে এলাম, ভেবেছিলাম যাব একবার। কিন্তু আর সময় করতে পারিনি, বুঝলে। তো আমি যে কালকেই যাচ্ছি, কার কাছে শুনলে?

পরশু আইছিলাম আপা। আপনে ছিলেন না। তো নিচে জিগাইছিলাম। না আপা আপনে আর কী রাগ করলেন। দোষ করছি, রাগ তো করবেনই। আমি রাগ করি নাই আপা। কিছুই মনে করি নাই। আমার উপায় ছিল না। নাইলে পরের দিনই আসতাম। একটু থিত হইতে পারলে আপনের কাপড়গুলাও যেমনেই হউক রাইতদিন জাইগ্যা কইরা দিতাম। আমার কোনো উপায় ছিল না গো আপা।

রাবেয়া বসো, বসে কথা বলো। বাড়িতে খাবার কিছু নেই বলে ওর খারাপ লাগে, রাবেয়া নিশ্চয় ক্ষুধার্ত।

শোনো রাবেয়া, আমি বুঝতে পেরেছি কিছু হয়েছে তোমার। আমি তো তোমাকে কী হয়েছে জিজ্ঞেসও করলাম, কিন্তু তুমি বললে না। এখন কী বলা যায় আমাকে?

কইতে চাই আপা। কিন্তু এত কথা কইত্থেকা শুরু করি দিশা পাই না।

যদিও প্রচ- ব্যস্ততা টেনশন, তবু ওইদিনের অন্যায় আচরণটির প্রতিকার করতে অরা ওকে উৎসাহ দেয় সমস্যাটি জানাতে। সে ওইদিনই ঠিক করেছিল রাবেয়ার সাথে কথা বলবে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে চায় না ও। যে খটকাটি ভেতরে রয়ে গিয়েছিল, তা না মেটানো পর্যন্ত ও শান্তি পাবে না জানে। রাবেয়া কী একটা দ্বিধায় ভুগছে, তবুও অরা তাড়া দেয় আবার, বলো রাবেয়া, আমি আবার মা’র বাসায় চলে যাব রাতে।

রাবেয়া একটু ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তাকিয়ে থাকে আলভীর দিকে, তারপর শুরু করে। বেশ গুছিয়ে কথা বলে মেয়েটি। কিন্তু এখন এলোমেলোভাবে হাহাকার করে ওঠে, আপা আমার পোলাটার এক বছর হইল আইজ। বুকটা খালি খালি লাগে গো আপা। আলভীকে বুকে চেপে কাঁদে ও।

৪.

রাবেয়ার তখন চৌদ্দ বছর বয়স। বাবা গরিব কৃষক। অল্প জমিতে চাষ দিয়ে সারা বছরের খোরাকি টেনেটুনে হয়। কিন্তু অন্যান্য খরচ জোগাতে অন্যের জমিও বর্গা নিয়ে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করেন। অভিশাপের মতো পরপর তিনটি মেয়ে। তাই চাষে হাত লাগানোর জন্য বাইরের লোককে কামলা খাটাতে হয়। ফলে লাভ কমই থাকে হাতে। তবে সে বছর তিনি একটি এতিম ছেলে পেয়েছেন কামলা হিসেবে। লিটনের ষোলো-সতেরো বছর বয়স। দেখতে সুন্দর। বক সাদা গায়ের রং। বেশ পরিশ্রমী। সারাদিন কাজ করে আর সারারাত বাঁশি বাজায়। ছেলেটি কোত্থেকে এসেছে ভালো করে বলে না। বলে কোথাও কেউ নেই তার। আদাড়ে-বাদাড়ে বড় হয়েছে।

রাবেয়া মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজ করে, সুন্দর করে ঘর গোছায়, পাখা সেলাই করে, কাপড়ে নকশি তোলে। সবাই বলে রাবেয়াটা খুব কাজের, খালি গায়ের রংটা যদি এত ময়লা না হইত! তাদের কথার মধ্যে অনেক আফসোস, অনেক সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। রাবেয়াও ‘ইস রংটা যদি আরেকটু পরিষ্কার হইত’Ñ এই মনোকষ্ট নিয়ে বড় হতে থাকে। তাই সাড়ে চৌদ্দতে পরিষ্কার গায়ের রঙের লিটনের প্রেমে মজতে তার দেরি হয় না। মেয়ের সেই উথাল-পাথাল প্রেম মায়ের চোখে পড়তেও দেরি হয় না। এদিকে পরিশ্রমী অনাথ কামলাকে তাড়িয়ে দেয়ার সামর্থ্যও তার বাপের নেই আবার এই ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেয়াও যায় না। ফলে মেয়ের ওপর নেমে আসে শাসনের খড়গ। আর ভেতরে ভেতরে বিয়ের চেষ্টা চলতে থাকে। কিন্তু পাহারা দিয়েই বা কতক্ষণ রাখা যায়। এত বাধার পরও তারা ভেসে যেতে থাকে প্রেমের বন্যায়। আর বেশি বেশি পাহারা দিতে গিয়ে ক্ষতির ক্ষতি যা হলো তা হচ্ছে পাড়া-পড়শী তাড়াতাড়ি জেনে গেল। ফলে ভালো পাত্র পাওয়ার সম্ভাবনা গেল, অপেক্ষা করার উপায়ও থাকল না।

ষোলো বছর হওয়ার আগেই একদিন বিয়ে দিয়ে দেয়া হলো আরেক হাভাতে কৃষকের সঙ্গে। সে লোক হাতেও মারে, ভাতেও মারে। যৌতুকের জন্য মারে, ভাতের অভাবে মারে, কালো বলে মারে, সন্দেহ করে মারে। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে তার হাত চলছেই। এর মধ্যে লিটন বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করে। এতে স্বামী একেবারে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। তাই যখন পেটে বাচ্চা আসে লিটনকে জড়িয়ে সে যত কুৎসিত কথা বলা সম্ভব সবই বলতে থাকে। রাবেয়া বলে, আপা বিশ্বাস করেন হের মুখেই লিটনের আসার কথা শুনলাম, তহনও দেহি নাই। বাচ্চা হওয়ার চল্লিশ দিনের মাথায় একদিন মারতে মারতে ঘর থেকে বের করে দেয় স্বামী। রাবেয়া অজ্ঞান হয়ে বাইরেই পড়ে থাকে।

এরপর লিটন সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওখান থেকে ফিরলে সালিস বসিয়ে ওদেরকে জুতোপেটা করা হয়। তারপর সেই রাতেই পালায় দু’জনে। পালিয়ে ঢাকায় এসে মোহাম্মদপুরে আশ্রয় নেয়। লিটন কুলিগিরি করে আর রাবেয়া বিভিন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। এ রকমই এক বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে সে সেলাইয়ের কাজ করার সুযোগ পায়। তাতে অনেক বেশি সচ্ছলতা আসে। কিন্তু সেও বেশিদিন সইল না। তার স্বামী খবর পেয়ে ঢাকায় এসে হম্বিতম্বি করে। রাবেয়াকে ধরে নিয়ে যেতে চায়। না পেরে ওরা বিবাহিত না জানিয়ে বস্তির লোকদের ক্ষেপিয়ে দেয়। বস্তির লোকদের ভয়ে তখন ওরা পালিয়ে পালিয়ে থাকত।

সেই সময়টিতেই আমি গিয়েছিলাম কাপড় আনতে। কাকতালীয়ভাবে রাবেয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। রাবেয়া জানায়, তিন-চারদিন পালিয়ে থেকে ওইদিনই সে গিয়েছিল তাদের ঘরটির অবস্থা দেখতে। আমি রাগারাগি করে চলে আসার পর ওই রাতেই লিটনকে বস্তির সামনে মেরেছে কারা যেন। রাবেয়া খবর পেয়ে ছুটে যায় সেখানে। এই ফাঁকে বাড়িটায় যা ছিল সব লুট করে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দিয়েছিল বস্তির মানুষ। এরপর প্রাণ হাতে করে ওরা অন্য বস্তিতে পালিয়ে যায়। এখন সেখানেই আছে।

কিন্তু মনে শান্তি নাই আপা, বলে রাবেয়া। আবার কোন চেনা মানুষ খোঁজ পাইয়া খবর দিয়া দিবো আবার পলান লাগব। ঢাকা শহরটাও গেরামের মতোন ছোট্টই। গুছাইয়া সংসার করার কপাল হইল না।

রাবেয়া বস্তির এক লোকের কথা বলে। লোকটি কোনো কাজ করে না। চারটে বিয়ে করেছে। বউদের উপার্জন খায়। এক বউ গ্রামে থাকে চার-পাঁচটি সন্তানসহ, যাকে প্রথম সে বিয়ে করেছিল। গ্রামের বউ-ছেলেমেয়েকেও এই আয় থেকেই কিছুটা ভাগ দেয়। সেখানে বছরে দু’বার যায়। ঈদের সময় শহরের বুয়া বউরা প্রতিটি বাসা থেকে শাড়ি চুড়ি পায়, বাড়তি টাকা পায় সেখান থেকে কিছু তুলে নিয়ে সে গ্রামে যায় দায়িত্বশীল স্বামী হয়ে সন্তানসন্ততি নিয়ে ঈদ করতে। আর সারাবছর বস্তিতে একটি ছোট ঘরে এক বউ নিয়ে থাকে। বউটি সারাদিন ছুটা কাজ করে পাঁচ-ছ’টি বাসায়। আর বাকি দুটি বউ বাঁধা কাজ করে দুই বাসায়। স্বামী মাস শেষে গিয়ে বেতন তুলে নিয়ে আসে। ওরাও মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে আসে স্বামীর কাছে, থাকে বস্তির ওই একটি ঘরেই সতীনসহ। তখন দুই বউ স্বামীর দখল নেয়ার জন্য স্বামী সেবা করে প্রাণপণে আর নিজেরা তারস্বরে ঝগড়া করে। সবসময়ের সঙ্গিনী বাসাবাড়ি থেকে যে খাবারগুলো তাকে খেতে দেয়া হয় সেখান থেকে ভালোগুলো স্বামীর জন্য বেঁধে নিয়ে যায় নিজে না খেয়ে। তবু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার পরাজয় ঘটে। বরং সে মার খায়। সবচেয়ে বেশি সময় স্বামীকে পেয়েও কয়েকদিনের মেহমান সতীনের সঙ্গে ঝগড়া করার জন্য কঠিন শাস্তি পেতে হয় তাকে। শুধু এই লোকটি নয়, বস্তির ঘরে ঘরে নারীর প্রতি বৈষম্য আর অবমাননার হাজারো কাহিনী। অথচ এই লোকগুলোর শাস্তি পেতে হয় না। এরাই বরং রাবেয়া আর তার প্রেমিকের বিচারক!

রাবেয়া হু হু করে কাঁদে। আলভীকে বুকে চেপে আবার বলে, পোলাটার তরে বুক খালি খালি লাগে আপা।

অরা কী বলবে ওকে! কী সান্ত¡না দেবে! এই ব্যথার কোনো সান্ত¡না কী হয়! তার নিজের বুকটাও মুচড়ে ওঠে।

রাবেয়ার ছেলেটা মা হারিয়ে কত কষ্টে আছে কে জানে! এই ছেলে তো এতো ঘটনার কিছুই জানবে না, মায়ের এতো কষ্টের কথা, প্রতি মুহূর্তে তড়পানোর কথাও জানবে না। শুধু জানবে মায়ে ওকে ফেলে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার কথা।

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by