logo

শুক্রবার ২৫, মার্চ ২০১৬ . ১১ চৈত্র ১৪২২ . ১৫ জমাদিউল সানি ১৪৩৭

চুকনগরের গণহত্যা
২৫ মার্চ, ২০১৬
সামসুজ্জামান
সুন্দরী। নামটি শুনলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়। অকপটে মনের মাঝে জেগে উঠে এক স্বর্গীয় ছবি। শিহরণে জেগে উঠে শরীরের স্নায়ুগুলো। কিন্তু এ সুন্দরীর কথা শুনলেই সামনে ভেসে উঠে এক বীভৎস্য, নির্মম অত্যাচারের রোমহর্ষক চিত্র। জমাটবাঁধা রক্তের নিচে চাপাপড়া সদ্য প্রসূত নব শিশুর আর্তচিৎকার। ক্ষুধা এবং বাঁচার আকুতির ছবি। সুন্দরী একটি ইতিহাসের নাম। এক স্বাধীনতার নাম।

বিশ্বে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের ‘চুকনগরের গণহত্যা’ এখন আর কারও অজানা  নয়। ৩/৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতে পলায়নরত প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষকে এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করেছিল পাকসেনারা। যাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। চুকনগর সংলগ্ন মালতিয়া গ্রামের এরশাদ আলী হত্যাযজ্ঞের পর তার পিতাকে খোঁজ করতে গিয়েছিল লাশের স্তূপের মধ্যে। এ দিন সকালে তার পিতা চিকন আলী গিয়েছিল চুকনগর বাজারে। পিতাকে খুঁজতে গিয়ে তিনি শুনতে পান ৩/৪ মাস বয়সী এক শিশুর কান্না। ছুটে যান সেখানে, দেখেন হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর এক মহিলার পাশে সারাগায়ে রক্তমাখা এক শিশু চিৎকার করে কাঁদছে। পাশে পড়ে থাকা মহিলার শরীরে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে গুলি লেগে। এরশাদ আলী পিতৃস্নেহে রক্তমাখা শিশুটিকে কোলে নিয়েই ছোটেন নিজ বাড়িতে। স্ত্রীর কাছে রেখে তিনি আবারও যান পিতার লাশের সন্ধানে। লাশের স্তূপের মধ্যে  খুঁজে পান পিতার লাশ। এরশাদ আলী এবং তার স্ত্রী  পরম আদর করে নাম রাখেন সুন্দরী। যেহেতু শিশুটি একজন হিন্দু মহিলার পাশে পড়েছিল, তাই বুঝতে পারেন সন্তানটি হিন্দু সন্তান। সুন্দরী এরশাদ আলীর  কাছেই মানুষ হতে থাকে। সে জানে না তার পিতা-মাতার পরিচয়। এরশাদ আলী বুঝতেও দেননি পরিচয় রহস্য। সুন্দরীর বয়স তখন পনেরো। পাশের কালিয়াকৈর গ্রামের বাটুল দাস (৪০) বিপতœীক হন। তিনি সুন্দরীকে বিয়ে করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পালক পিতা এরশাদ আলী বাটুল দাসের সাথে সুন্দরীর বিয়ে দেন এবং সেই সময়েই সুন্দরী নিজ পিতা-মাতার পরিচয় না পেলেও গৌত্র পরিচয় জানতে পারে। তার জীবনের ৪৫ বছর কেটে গেলেও এখনও সে জানে না তার পিতা-মাতার ঠিকানা। শুধু জানে সে নয় বীরাঙ্গনা, নয় মুক্তিযোদ্ধা, শুধু মুক্তি যুদ্ধের রক্তের বন্যায় ভেসে আসা সুন্দরী। জীবনে সুখের পরশ জোটেনি স্বামীর সংসারে। তাইতো দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে শুধু বলল, হয়তো ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’।

যুদ্ধকালীন সময় হত্যা, গণহত্যা সংঘটিত হয়ে থাকে যুদ্ধরত দেশে। ভিয়েতনামের মাইলায় মার্কিন সৈন্যরা এক জায়গায় হত্যা করেছিল ১৫/১৬শ মানুষ। পাঞ্জাবের জালিয়ানাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে হত্যা করা হয় প্রায় ২২০০ মানুষকে। বিশ্বের ইতিহাসে গণহত্যা হিসেবে এ দুটি ঘটনা জাজ্বল্যমান হয়ে আছে। ’৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন দেশের বৃহত্তম গণহত্যাটি সংঘটিত হয় খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার চুকনগর বাজারে। যে দৃশ্য প্রত্যক্ষদর্শীদের মানসপটে ভেসে উঠলে আজও শিহরিত হয়ে উঠে তারা। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তারা যে নৃশংসতা দেখেছে তা বর্ণানাতীত। তারা দেখেছে পাকহানাদারদের বর্বরতা। প্রকাশ্যে ধর্ষণের দৃশ্য। দেখেছে প্রাণে বাঁচার তাগিদে কালীমন্দিরের পিছনের নদীর লাগোয়া বটগাছের শিকড় ধরে কেবল নাক বের করেও সুবোল নন্দী পরিবারের নয়জনের নৃশংস হত্যা। পাক সেনারা পানির মধ্যেই এলোপাতাড়ি গুলি করে তাদের হত্যা করে। ৫৬টি আর্মি ক্যাম্পে প্রায় একহাজার পাকসেনা মাত্র চার পাঁচ ঘণ্টা অবিরাম এলোপাতাড়ি ক্রসফায়ার করে হত্যা করে প্রায় ত্রিশহাজার মানুষকে। যার মধ্যে এক-চতুর্থাংশ ছিল শিশু-কিশোর এবং বৃদ্ধা। ’৭১-এর ২০ মে বাংলা ৫ জ্যৈষ্ঠ বৃহস্পতিবার এই নৃশংস ঘটনা ঘটে চুকনগর বাজারে।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হল নমশূদ্র ও পু-ক্ষত্রিয় জাতি। বাংলাদেশের দক্ষিণে জোয়ার-ভাটা অঞ্চলে এদের একচেটিয়া বসবাস। এরা নোনাপানি দেশের মানুষ। উত্তরে যশোরের নিম্নাংশ, নড়াইল ও গোপালগঞ্জ এবং দক্ষিণে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্মৃত এই ভৌগোলিক সীমানায় এদের বসবাস। এদের পেশা কৃষি কাজ, মৎস্য আহরণ, মাদুর বোনা, নৌপথে আয়রোজগার এবং সুন্দরবন থেকে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ আহরণের মাধ্যমে জীবিকা অর্জন। খুলনা শহরের চারপাশে এবং দক্ষিণে বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে তফশিলভুক্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস। বাংলাদেশের আর কোথাও এক এলাকায় এত হিন্দু জনগোষ্ঠির বসবাস দেখা যায় না। ফলে এই এলাকাটিই পাকিস্তানি শাসক ও তাদের দোসরদের কাছে উপযুক্ত টার্গেটে পরিণত হওয়ার দরুন খুলনাতেই প্রথম রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। খুলনার মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ছিল খুবই শক্তিশালী। সবুর খাঁন ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের জাঁদরেল নেতা। খুলনা গড়ার কারিগর ছিলেন তিনি। অথচ তফশিলি সম্প্রদায়কে তিনি বশে আনতে পারছিলেন না।

যুদ্ধের শুরু থেকেই রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটির সহায়তায় খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় শুরু হয় গণহত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ। ১৪ এপ্রিল পাকসেনারা প্রথম বটিয়াঘাটার চক্রাখালী স্কুলের সামনে অবস্থান নেয় এবং গানবোট থেকে শেলনিক্ষেপ করে। এদিকে এই সময় নকশালপন্থীদের তৎপরতাও বৃদ্ধি পায়। দেশে যেখানে শাসন নেই। সর্বত্র চলছে বিশৃঙ্খলা ও ভীতি সন্ত্রাস। রণকৌশল হিসেবে তারা তখন নির্ধারণ করে শ্রেণিশত্রু খতমের পরিকল্পনা। ১৭ মে আমাদের বিখ্যাত ধনী পরিবারের পুলিন সরদার, অনন্ত সরদার, দয়াল সরদার ও বিষ্ণু সরদারকে হত্যা করে। একদিকে পাকসেনাদের গণহত্যা, স্থানীয় মানুষদের লুটপাট, অন্যদিকে নকশালদের মানুষ হত্যা। এমতাবস্থায় কালবিলম্ব না করে ১৭ মের পর থেকে তারা যাত্রাশুরু করে ভারতের উদ্দেশ্যে। সোনাদানা টাকা পয়সা এবং প্রয়োজনীয় কিছু খাদ্যসামগ্রী পাথেয় করে জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা চুকনগর এসে জড়ো হয়। এর আগেও কয়েক হাজার মানুষ এই পথ দিয়েই ভারতে ঢুকেছিল। দিন যত যাচ্ছিল মানুষের আগমন ততই বাড়ছিল। গণহত্যার দুদিন আগে থেকে অর্থাৎ ১৯-২০ মে রাত-দিন ছিল বিরামহীন জনস্রোত। বাজার এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। চুকনগর এবং মালতিয়া ও চাকুন্দিয়া গ্রামে প্রায় ৩/৪ কি.মি. এলাকা জুড়ে সমাগম হয়েছিল প্রায় ২ লাখ লোকের।

পানির দামে জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। সংঘবদ্ধচক্র আড়ালে-আবডালে জিনিসপত্র চুরি করছে। অনেক জায়গায় জোরজবরদস্তি করে চলছে লুটপাট। শরণার্থীদের চোখেমুখে চাপা আতঙ্ক। ভারতে পৌঁছে দেয়া দালালদের সাথে চলছে শলাপরামর্শ। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে খোলা হয়েছে শরণার্থী শিবির। আশার এটুকু আলোই সবার কাছে সান্ত¡না। তাই ভারতে পৌঁছানোর আকুলতা।

চুকনগর থেকে ২৫-৩০ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে পারলেই সীমান্ত পার হওয়া যাবে। কিছুদিন আগেও সাতক্ষীরা পর্যন্ত যে বাস-ট্রাক চলাচল করতো তা পাকসেনারা নিজেদের ব্যবহারের জন্যে নিয়ে নিয়েছে। ফলে পায়েহাঁটা ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সাংগঠনিকভাবে যতটা সম্ভব শরণার্থীদের সহযোগিতা দানে হয়েছিল তৎপর। গ্রুপ তৈরি করে পাহারা দিয়ে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেবার প্রস্তুতিও নিয়েছিল ১৯ মে। কিন্তু বিধিবাম ২০ মে সৃষ্টি হল চুকনগরে একরক্তের ইতিহাস। চুকনগরে সংঘটিত গণহত্যা বাংলাদেশের বৃহত্তম গণহত্যা এমনকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বা অন্যতম গণহত্যা। যে মূল্য আমাদেরকে স্বাধীনতা অর্জন করতে দিতে হয়েছিল তা ভুলে যেতে বসেছে জাতি। ফলে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে চুকনগর গণহত্যাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্তি করা উচিত।

যুদ্ধকালীন পাকসেনাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাংলার মাটি। যেকোনো মূল্যে প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তানের সব মানুষকে হত্যা করে হলেও একমাত্র এখানকার উর্বর মাটিই ছিল তাদের শেনদৃষ্টিতে। তাইতো পাখির মতো গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করেছিল তারা ত্রিশ লাখ মানুষকে। কিন্তু তাদের সব ষড়যন্ত্র হম্বিতম্বির অকালমৃত্যু ঘটায় টাইগাররা। যদিও মাত্র ন’মাসে রক্ত ঝরেছে অনেক, তবু স্বাধীনতা তারা ছিনিয়ে এনেছে রক্তের বিনিময়ে। বিশ্বের আর কোথাও স্বাধীনতার জন্যে এত নির্যাতন, এত হত্যা, এত সম্ভ্রমহানি, এত রক্ত ঝরানোর ইতিহাস নেই। তাইতো আমরা বীর বাঙালি। তবে বাংলার মাটিতে যদি গোলাম আজম, সাঈদী, সাকা চৌধুরী, মুজাহিদী, নিজামী, কাদের মোল্যা, মীর কাসেমদের জন্ম না হতো তাহলে হয়ত আরও সহজে স্বাধীনতা উত্তরণ হতো। আজ চুকনগর গণহত্যার পরও এরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়। দেশ অর্থাৎ পাকিস্তানের জন্যে তারা ইসলামের অজুহাতে নারীদেরকে গনিমতের মাল হিসেবে নসিহত করেছিল। মেয়েদেরকে তুলে দিয়েছিল সেনা ক্যাম্পে।

ভৌগোলিক দিক থেকে চুকনগর বাজারের অবস্থান খুবই সুবিধাজনক। যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরার সংযোগস্থল হওয়ায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, দৌলতপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় দুলাখ মানুষ সড়ক এবং নৌপথে জীবন রক্ষার্থে ভারতে যাবার উদ্দেশ্যে এখানে সমবেত হয়। এখান থেকে সীমান্ত এলাকার দূরত্ব মাত্র ত্রিশ কিলোমিটার এবং চুকনগর বাজার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। কিন্তু বিধিবাম। ২০ মে বেলা বারোটার দিকে যশোর এবং সাতক্ষীরা সাব-ক্যান্টনমেন্ট থেকে দ্বিমুখী আক্রমণ চালায় সেনারা। সে সময় সড়কপথ দুর্গম হওয়ায় অধিকাংশ পরিবারই ঘ্যাংরাইল এবং ভদ্রানদী পথে সমবেত হয়েছিল এখানে। চুকনগর হাইস্কুল, ডাকবাংলো বাজারের চাঁদনী, বটতলা মন্দির, গরুহাট, ফুটবল মাঠে তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। মানুষ আর মানুষ। নদীতে বেঁধে রাখা শত শত পরিত্যক্ত নৌকা। চুকনগরে আসা দু’লক্ষাধিক লোকের অধিকাংশই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। পাকসেনারা হত্যা-লুট করেই ক্ষান্ত হয়নি। ধরে নিয়ে যায় অসংখ্য যুবতী সুন্দরী মেয়েদের। যাদের খোঁজ আজও মেলেনি। হত্যাকা-ের পর চুকনগর সংলগ্ন ঘ্যাংরাইল এবং ভদ্রানদী ছিল লাশের নদী। জোয়ারের সময় বুড়িভদ্রা এবং হরিহর নদীতে ভেসে উঠতো লাশের বহর। আবার ভাটায় নেমে যেতো।

নারকীয় হত্যাযজ্ঞে যে ব্লু প্রিন্ট বাস্তবায়ন করা হয়েছে তাতে দেখা যায় কোন মুসলমানকে হত্যা করার পরিকল্পনা তাদের ছিল না। তাদের টার্গেট ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষ মানুষ বিশেষ করে হিন্দু যুবকরা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা বরাবর ধরে গণহত্যার রোড ম্যাপ প্রমাণ করা হয়েছে। প্রথমে তারা চুকনগর বাজারে প্রবেশ করেনি যাতে স্থানীয় অধিবাসীরা পালানোর সুযোগ পায় সে কারণে। এদিন বাজারে প্রচুর বহিরাগত হিন্দু লোকের সমাগমের কারণে পাকসেনারা এই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়। যাতে বহিরাগতরা পালানোর সুযোগ না পায়। স্বল্প সময়ে তারা তাদের মিশন শেষ করে চলে যায়।

বর্বর এ হত্যাযজ্ঞের পর এলাকার ৪২ জন মানুষ পরম মমতাভরে দুদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে এসব মৃতদের গণকবর দেয়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক সেদিন বাংলাদেশের বৃহত্তম গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল চুকনগরের পবিত্র মাটিতে। এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গণহত্যা কিনা সে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে। যে গণহত্যার শিকার হয়েছিল দশ সহস্রাধিক মানুষ। স্মরণকালের সাড়াজাগানো এতবড়ো ভয়াবহ একটি ঘটনা ১৯৯০ দশকের পূর্ব পর্যন্ত দেশবাসীর কাছে ছিল অজানা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, পনেরো খ- সম্বলিত স্বাধীনতা যুদ্ধের মুদ্রিত দলিল এবং প্রকাশিত গণহত্যাবিষয়ক পুস্তকে চুকনগরে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়টি স্থান পায়নি। ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় চুকনগর গণহত্যা ’৭১ স্মৃতিরক্ষা পরিষদ’। সেই থেকে প্রতিবছর এই ব্যানারের আওতায় পালিত হচ্ছে ২০ মে চুকনগর গণহত্যা দিবস।

চুকনগর গণহত্যা বিষয়টি এখন জাতীয় পর্যায়ে বহুল আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাতাখোলা বিলে ২০০৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘চুকনগর গণহত্যা-৭১ স্মৃতিস্তম্ভ’। চুকনগরেও প্রতিবছর পালিত হয় ‘গণহত্যা দিবস’।

চুকনগর ছোট পরিসরে ছোট একটি গ্রামীণ জনপদ। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও নেই শহুরে বাতাস। একমাত্র ’৭১-এর গণহত্যাই এলাকাটির পরিচিতি এনে দিয়েছে। অথচ আজও পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে মেলেনি এর স্বীকৃতি। এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং আক্ষেপ এটাই।

স্বাধীনতা অর্জন ও মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থে বিভিন্ন আলোচনায় এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়। সেই তুলনায় গণহত্যা বিষয়টি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এবং মানুষের মন-মননে ততটা স্থান পায়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমরা না পেরেছি তাদের পাশে দাঁড়াতে, না পেরেছি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান জানাতে, না পেরেছি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির অপকৌশল থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত-অস্থিরতা এবং অশুভ শক্তির তৎপরতা। এখন সময়ের ডাক, নতুন করে যুদ্ধ করতে হবে।

সর্বশেষ খবর

শঙ্খচিল এর আরো খবর

আজকের পত্রিকা. কমের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষেধ

Developed by